যে স্বপ্ন আমরা দেখতে পারি

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২২, ০৯:৪৭

আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাস অনেক পুরোনো। আমাদের একসময় পাল, সেন, গুপ্তবংশীয় বিভিন্ন বংশের মানুষ শাসন করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছর ধরে পিছিয়ে পড়ে থাকা অসহায় বাঙালি জাতিকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। মানুষ চেষ্টা করলে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়ে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।

১৯৭১ সালে নতুন একটা দেশ সৃষ্টি হয়েছে। ৯ মাসে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা জাতিগতভাবে একটু অধৈর্য জাতি। চাই এক দিনেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক অঙ্গুলির ঋণ অনেক। খ্িরষ্টপূর্ব ৫০০ শতাব্দীতে চীনে সান জু নামে একজন সমরবিদ ও দার্শনিক ছিলেন। তিনি তার ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ নামক বইয়ে লিখেছেন, ‘যদি আমরা আমাদের শত্রুকে চিনি, যদি আমরা আমাদের নিজেদের চিনি, তাহলে আমরা হাজার যুদ্ধ করে জয়ী হব এবং আমাদের একটি প্রাণও দিতে হবে না। কিন্তু আমরা যদি শত্রুকে না চিনে শুধু শুধু নিজেদের চেনার ওপর ভর করে যুদ্ধ করি, তাহলে একটি যুদ্ধে জয়ী হব, অথবা হারতেও পারি— ফিফটি ফিফটি চান্স। আর যদি নিজেকেও চিনলাম না, শত্রুকেও চিনলাম না, যুদ্ধে চলে গেলাম, তাহলে নির্ঘাত মৃতু্য, নির্ঘাত পরাজয়।’ বঙ্গবন্ধু জানতেন বাঙালির সত্যিকার শত্রু কে। কৌশলগত দিক দিয়ে তিনি এত এগিয়ে ছিলেন যে মাত্র ৯ মাসের এক সংগ্রামী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশ আমাদের তিনি উপহার হিসেবে দিয়েছেন। যদি তাকে নিয়ে আলোচনাই করতে হয়, তার প্রতিটা কাজকে বিশ্লেষণ করুন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের বক্তৃতা ছিল বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মতো, যে ঢেউয়ে আগুন জ্বলে। বঙ্গবন্ধু অনেক আগে থেকেই জানতেন পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব পাকিস্তান একসঙ্গে থাকার কোনো কারণ নেই। আমাদের সম্পর্কে ছেদ ধরবেই। কারণ বাংলাদেশ থেকে ১০০০ মাইল দূরে পশ্চিম পাকিস্তান অবস্থিত। তার সঙ্গে আমার সংস্কৃতি, ভাষা, আচার, রীতিনীতি কোনো কিছুতে মিল নেই, শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়া। তিনি যখন ৭ই মার্চের বক্তৃতায় বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ওনাকে আইনগতভাবে দেশদ্রোহী বলা গেল না। অথচ উনি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেন যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। বঙ্গবন্ধু এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি সমস্ত জীবন মুক্তি, স্বাধীনতা লালন করেছেন ।

আপনি-আমি বাঙালি। বাংলাদেশের নাগরিক মুক্তভাবে আমরা মত প্রকাশ করব, প্রতিবাদ করব, বিপ্লব সংগঠিত করব, আন্দোলন করব এবং সেই দাবি, প্রতিবাদ, বিপ্লব, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের দারিদ্রে্যর বিমোচন ঘটাব। দারিদ্রে্যর বিমোচন ঘটাতে গিয়ে যে সমাজ আমরা সৃষ্টি করব, সেই সমাজে ধর্মীয় অনুশাসন থাকবে সত্যি, কিন্তু কোনো ভীতি বা কোনো চাপের মুখে থেকে ধর্মীয় চর্চা করব না। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আমরা সৃষ্টি করব। আর প্রথম ঐ তিনটি শর্ত পূরণ করার মধ্য দিয়ে আমরা এমন এক সমাজ সৃষ্টি করব, যে সমাজে কোনো ভয় থাকবে না, লাল চক্ষুর ভয় থাকবে না, যে সমাজে কুসংস্কারের ভয় থাকবে না। মার্টিন লুথার কিং, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের সাম্যবাদ, সমাধিকারের জন্য সমস্ত জীবন আন্দোলন করেছেন। তিনি বলতেন, ‘আমার একটা স্বপ্ন আছে, এই দেশ এই জাতির মানুষকে গায়ের রং, সে কৃষ্ণাঙ্গ না শ্বেতাঙ্গ তা দিয়ে বিচার করা যাবে না; বরং তার চারিত্রিক গুণাবলি, তার চারিত্রিক শক্তি, তার জ্ঞান, শিক্ষা দিয়ে বিচার করা হবে।’ বাংলাদেশে এটা সত্যি যে, কৃষ্ণাঙ্গ আর শ্বেতাঙ্গে কোনো ভেদাভেদ নেই; কিন্তু আমাদের এই দেশে কৃষ্ণাঙ্গ আর শ্বেতাঙ্গ থেকেও অনেক বড় অন্যায়, ব্যবধান রয়ে গেছে। আমরা সংগ্রাম করি সেই ব্যবধানকে ঘুচিয়ে দেওয়ার। সেই ব্যবধানটা কী? ব্যবধানটা হচ্ছে, আপনি যদি কোনো বিশাল শিল্পগোষ্ঠীর মালিক হন আর আপনার বাড়ির পাশের একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ হয়, তার জমিটা গ্রাস করে নেওয়া যাবে, দখল করে নেওয়া যাবে। এই মনোভাব থেকে সরে আসতে হবে। বাংলাদেশ হওয়ার কথা সাম্যের দেশ। পুঁজিবাদ থাকবে, মুক্ত অর্থনীতির চর্চা থাকবে, মানুষ স্বপ্ন দেখবে, ধনী হবে; কিন্তু সর্বনিম্নে একটা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, যেখানে কেউ কাউকে গ্রাস করতে পারবে না।

সবাই মিলে আমরা এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি, যে বাংলাদেশে সামাজিক কোনো অনাচার থাকবে না; সমৃদ্ধি ও ঐশ্বর্যে ভরপুর হবে বাংলাদেশ, যেখানে সত্যিকার অর্থে বাঙালি স্বপ্ন দেখতে পারে, সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে পারে, এমনি একটা দেশ যাতে আমরা পাই। সেই আত্মবিশ্বাস আমাদের আছে।

লেখক: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন