বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২২, ১০:০০

কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ, প্রবাসীদের বিনিয়োগ অথবা বৈদেশিক বিনিয়োগ—সবই দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বেকারত্ব দূরীকরণ, জনগণের আয়স্তর বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ প্রদান, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের শনাক্তকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিভিন্ন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সর্বমোট ৭০টি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ প্রদানের জন্য বিভিন্ন জেলা ও এলাকাভিত্তিক সম্ভাব্য বিনিয়োগের খাতগুলো শনাক্ত করা প্রয়োজন। এলাকা অথবা অঞ্চলভিত্তিক সম্ভাব্য বিনিয়োগের খাত শনাক্তকরণ হতে পারে বিনিয়োগ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বিদেশে অবস্থানরত বিনিয়োগকারীরা যদি দেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হন, তবে অনেক ক্ষেত্রে নিজ নিজ এলাকাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এজন্য এলাকা ও অঞ্চলভিত্তিক সম্ভাব্য বিনিয়োগের খাতগুলো শনাক্ত করা বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে পরিচালিত ‘সিলেট অঞ্চলে প্রবাসী বিনিয়োগ :একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা’ নামক এক গবেষণায় জড়িত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের (এফজিডি) মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের সম্ভাব্য বিনিয়োগের খাতগুলো শনাক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিনিয়োগ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে দুটি পৃথক প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছিল। এজন্য সিলেট চেম্বার অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য।

পরবর্তী সময়ে রিপোর্টটি লেখার পরে একটি পর্যালোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্হিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন। পরবর্তী সময়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গবেষণাপত্রটি প্রিন্ট আকারে প্রকাশ করে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্হিত ছিলেন বাংলাদেশের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।

গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে সিলেট অঞ্চলে আগত মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১২,৮৯৯.৫৫ এবং ১১,৩২৩ কোটি টাকা। এসব অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয় পারিবারিক ব্যয় নির্বাহে ও ভোগবিলাসে এবং এর ফলে দ্রব্যমূল্যে এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সিলেট শহরের বন্দরবাজার এলাকার মাছের উচ্চমূল্যের একটি অন্যতম কারণ হলো প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। এছাড়া জমি ক্রয়ে, বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণে, ফ্ল্যাট ক্রয়ে প্রবাসীরা অর্থ ব্যয় করে থাকেন।

সিলেট শহরের বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণে এবং বিভিন্ন শপিং মল তৈরিতে ইতিমধ্যে প্রবাসীগণ কতৃ‌র্ক পাঠানো অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্হিত বারাকা পাওয়ার লিমিটেড কোম্পানি, সিলেট শহরের রোজভিউ হোটেল, হবিগঞ্জের বাহুবলে অবস্হিত দ্য প্যালেস রিসোর্ট, সিলেটের খাদিমপাড়ায় অবস্হিত এক্সেলসিয়র হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের প্রবাসীদের বিনিয়োগ রয়েছে।

গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী সিলেট অঞ্চলে ঋণ আমানতের অনুপাত প্রায় ২৫ শতাংশ, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেকাংশে কম। সিলেট অঞ্চলে শিল্পঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ শতাংশ। রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৬ সালে চাকরির প্রয়োজনে সিলেট জেলা থেকে বিদেশে গমন করেছেন ১৮ হাজার ৫১৭ জন, সুনামগঞ্জ জেলা থেকে ৪ হাজার ৩৫১ জন, হবিগঞ্জ ১৬ হাজার ২৫১ জন এবং মৌলভীবাজার থেকে ১৪ হাজার ৪২৯ জন। রিপোর্ট অনুযায়ী সিলেট অঞ্চলের প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার অধিবাসী সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। ইংল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করছেন যথাক্রমে প্রায় ৪ লাখ ৩২ হাজার এবং ১ লাখ ২০ হাজার অধিবাসী। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ইংল্যান্ড ও সৌদি আরব থেকে সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীদের মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি ও ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা।

সিলেট অঞ্চলে রয়েছে বিনিয়োগসহায়ক পরিবেশ। এই অঞ্চলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে রয়েছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও ঐক্য। এছাড়া এখানে জনগণের মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়সংক্রান্ত বিষয়ে সহায়তা প্রদানের মানসিকতা। এই অঞ্চলে চাঁদাবাজি নেই অথবা অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক কম। এই অঞ্চলে রয়েছে জমি এবং কাঁচামালের (চনুপাথর, পাথর, বালু ইত্যাদি) পর্যাপ্ততা। গ্যাস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন—তেল, বনাঞ্চল, কয়লা ইত্যাদি পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। এছাড়া এখানে রয়েছে স্হলবন্দরের সুবিধা এবং দূষণমুক্ত পরিবেশ। সিলেট অঞ্চলে বিদু্যতের উৎপাদন ও সরবরাহ ভালো। সিলেট অঞ্চলের সম্ভাব্য বিনিয়োগের খাতসমূহ নিম্নরূপ :

আগর-আতরশিল্প :সিলেট অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক আগরগাছের বাগান থাকার কারণে আগর-আতরশিল্প ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে। কাঁচামালের সহজলভ্যতার ফলে তুলনামূলক কম খরচে আগর-আতর উৎপাদন করা বর্তমানে সিলেট অঞ্চলে সম্ভব হচ্ছে। বড়লেখা উপজেলার সুজানগরে আগর-আতর উৎপন্ন হয়ে থাকে। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মিটার আগর কাঠ প্রতি বছর উৎপাদিত হয়। সিলেট অঞ্চলের উৎপাদিত আতর সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি হয়ে থাকে। উৎপাদিত আতর রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি।

সিরামিক শিল্প :সিলেট অঞ্চলে সিরামিক শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। সিরামিক পণ্যের বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল যেমন—বিভিন্ন ধরনের কাদামাটি, সোডা, সিলিকা প্রভৃতি সিলেট অঞ্চলে পাওয়া যায় এবং চীন, ভারত ও মালেয়েশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। সিলেট অঞ্চলে বেশ কয়েকটি সিরামিক নির্মিত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সিলেট জেলার স্থাপিত খাদিম সিরামিকস লিমিটেড উল্লেখযোগ্য। সিলেট অঞ্চলে কাচনির্মিত তৈজসপত্র উৎপাদন করা সম্ভব।

রাবারশিল্প :বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ২২৬ হেক্টর জমিতে রাবার উৎপাদন করা হচ্ছে। সিলেট জেলার মালনিছড়া, লাক্কাতুরা, মণিপুর, মোমিনছড়া ইত্যাদি চা-বাগানে রাবারের চাষ হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগে মৌলভীবাজার জেলার ভাটেরা রাবারবাগানে রাবার উৎপাদন হচ্ছে। হবিগঞ্জের রশিদপুরে এবং সিলেট জেলার খান চা-বাগানে রাবার উৎপাদন হচ্ছে। বিদেশেও সিলেট অঞ্চলের রাবার উৎপাদন হচ্ছে। সিলেট অঞ্চলে সর্বমোট রাবার উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৩৬ লাখ ৭১ হাজার কেজি। সিলেট অঞ্চলে বিভিন্ন বাজারজাত পণ্য যেমন সাইকেল তৈরির টায়ার, টিউব, গামবুট ইত্যাদি তৈরির কারখানা হতে পারে।

কৃষিজাত শিল্প :বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে কৃষিজাত শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ধান ও সবজি উৎপন্ন হয়। এছাড়া তেজপাতা, লেবু, কলা, আনারস, কমলা, কাঁঠাল এই অঞ্চলে উৎপন্ন হয়ে থাকে। সিলেট অঞ্চলের লেবু বিদেশে রপ্তানি হয়। সিলেট অঞ্চলে আচার, জেলি, সস, পাটজাত পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের সুযোগ রয়েছে।

পর্যটনশিল্প :সিলেট অঞ্চলের ব্যাংকে রক্ষিত অর্থ যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী এই অঞ্চলের পর্যটন সেক্টরে বিনিয়োগ করা যায়, তবে মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবাসীদের অর্থ বিনিয়োগের একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে পর্যটনশিল্পকে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। এই অঞ্চলের পর্যটনশিল্প বিকাশে বৈদেশিক বিনিয়োগ কার্যকর হবে বলে আশা করা যায়। টু্যরিস্ট স্পটগুলোর মধ্যে জাফলং, মাধবকুণ্ড, লাউয়াছড়া, লালাখাল, শ্রীমঙ্গল, বিছনাকান্দি, রাতারগুল, ভোলাগঞ্জ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া খাদিম রেইন ফরেস্ট, হামহাম জলপ্রপাত, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, মাধবপুর লেক প্রভৃতি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় টু্যরিস্ট স্পট।

তথ্যপ্রযুক্তি খাত :সিলেট অঞ্চলে প্রবাসী বিনিয়োগের খাত হতে পারে আইটি সেক্টর। সিলেট শহরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বছরে প্রায় ৪৫০ জন শিক্ষার্থী কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট হচ্ছেন। এদের প্রায় ৮০ শতাংশ সিলেট অঞ্চলের অধিবাসী। কোম্পানীগঞ্জে একটি হাইটেক পার্ক স্থাপিত হয়েছে। শিক্ষিত জনবল কাজে লাগিয়ে সিলেট অঞ্চলে আইটি সেক্টরের উন্নয়ন সম্ভব।

স্বাস্হ্যসেবা খাত :সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীগণের মানসম্মত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠায় অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। সিলেট অঞ্চলে বড় আকারের হাসপাতালে এবং বড় আকারের স্পেশালাইজড হাসপাতাল নির্মাণে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

এভাবে দেশের অন্যান্য চেম্বারও নিজ নিজ জেলার সম্ভাবনাময় খাতগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বুকলেট প্রকাশ করতে পারে। এসব প্রকাশনা বিনিয়োগে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া যায়। বিষয়টির প্রতি আমরা সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক: অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন