ঢাকা শহরে কল্যাণপুর মিরপুর থানার এক ঐতিহাসিক জনপদ। ১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল কল্যাণপুরে যে গণহত্যা হয়েছিল, তা ইতিহাসের কোথাও তেমনভাবে উল্লেখ করা না হলেও কল্যাণপুরবাসী তাঁদের হূদয়ের গভীরে জিইয়ে রেখেছেন দিনটিকে। এখানে যে সব পরিবার এ হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিল, যাঁদের হত্যা করা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে সবাই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন না। অনেকেই চাকরির সুবাদে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন। তাছাড়া হত্যাযজ্ঞের দিন অনেককে ধাওয়া করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। যাঁদের মধ্যে অনেককেই সেদিন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
আগের দিন রাতে অর্থাত্ ২৭ এপ্রিল কল্যাণপুরবাসী দুটি গুলির শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। এর আগে প্রায় প্রতি রাতেই বিহারি ও বাঙালি দালালদের সহায়তায় বিভিন্ন জায়গা থেকে মুক্তিকামী বাঙালিদের ধরে এনে কল্যাণপুর ব্রিজের ওপর থেকে গুলি করে নিচে পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। তখন ব্রিজের নিচের খালটি সবসময় পানিতে ভরে থাকত। খালটি সে সময় বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযোগ ছিল। লাশগুলো খালের পানিতে ভাসতে ভাসতে একসময় বুড়িগঙ্গা নদীতে চলে যেত। ২৮ এপ্রিল ভোরবেলা থেকেই মিরপুর ও মোহাম্মদপুর থেকে আগত উর্দুভাষী যাদের বিহারি বলা হতো তারাসহ পাকহানাদারদের এদেশীয় দোসররা মানুষের রক্ত পিপাসায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। কল্যাণপুরের বাঙালিদের ঘরবাড়ি লুটপাট, অগ্নি সংযোগসহ হত্যা ও নারী নির্যাতন চালায়। এ গণহত্যাকে ‘কল্যাণপুর গণহত্যা’ বলা হলেও এর বিস্তৃতি ছিল পাইকপাড়া, পীরেরবাগ, আহম্মদনগর, শ্যামলী, টেকনিক্যাল, গাবতলী থেকে গৈদ্দার টেক পর্যন্ত। বিহারিরা একদিকে মিরপুর থেকে বাঙালি নিধন করতে করতে পাইকপাড়া-পীরেরবাগ হয়ে কল্যাণপুরে চলে আসে, অপরদিকে মোহাম্মদপুরের আসাদগেট থেকে অন্য একটি গ্রুপ হত্যাযজ্ঞ চালাতে চালাতে কল্যাণপুরে ঢুকে পড়ে। তারা রড, লাঠি, সড়কি, তলোয়ার, কুড়াল, বল্লম, চাপাতি ও বন্দুক হাতে ধেয়ে আসে। হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে লুটপাট করে, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে নারী-পুরুষ-শিশুদের জবাই করে হত্যা করে।
২৮ এপ্রিল বিহারিরা কল্যাণপুরে ঢুকে প্রথমেই খোঁজ করতে থাকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের। বিশেষ করে তারা আওয়ামী লীগ নেতা ডা. হায়দার আলীকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। সেদিন তিনি রাস্তার ম্যানহোলের মধ্যে আত্মগোপন করে নিজের জীবন রক্ষা করতে পেরেছিলেন। পরে হত্যাযজ্ঞে শহীদ আহসান উল্লাহ চৌধুরীর লাশসহ আহতদের নেওয়ার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরদিন সকালে কল্যাণপুরে আসেন। সেদিন শতাধিক পুরুষ মানুষ কল্যাণপুর জামে মসজিদের মধ্যে ঢুকে আত্মগোপন করে প্রাণে বেঁচেছিলেন।
এই কল্যাণপুর গণহত্যায় প্রথম উদ্ধারকারী হিসাবে যাঁর নাম না বললেই নয়, তিনি হলেন বিশিষ্ট দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টাঙ্গাইল থেকে ২৮ এপ্রিল বিকেলে রেডক্রসের একটি অ্যাম্বুলেন্সসহ কল্যাণপুরে এসে মারাত্মক আহতদের টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিত্সা পাওয়া অনেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও পাকহানাদারদের হাত থেকে তিনি ও তাঁর পুত্র বাঁচতে পারেননি। ১৯৭১ সালের ৭ মে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকসেনারা এ দানবীরসহ তাঁর বড় পুত্রকে বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তিনি আর ফিরে আসেননি। কল্যাণপুরবাসী ২৮ এপ্রিলের হতাহতদের উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য আজো তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
কল্যাণপুরে তখন হাতেগোনা কয়েকটি পাকা বাড়ি ছিল। কল্যাণপুরের উত্তরদিকে সে সময় কোনো রাস্তা ছিল না। ছিল শুধু ধানখেত আর জঙ্গল। সেই বিভীষিকাময় দিনে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, শত শত বাঙালির লাশ পড়েছিল যত্রতত্র। বেশিরভাগ লোককেই জবাই করে হত্যা করা হয়। বর্শা ও শাবল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এবং বড় ছোরা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে নিরস্ত্র বাঙালিকে। কারো ধড় থেকে মাথা আলাদা করা হয়েছে। কারো হাত-পা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা ফেলা হয়।

