অনিমেষ রায়

কোক স্টুডিও বাংলার মঞ্চ কাঁপানো এক হাজং যুবকের গল্প

অনিমেষ রায়। এ সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় তরুণ শিল্পী। সম্প্রতি কোক স্টুডিও বাংলা’য় নাসেক নাসেক গান গেয়ে প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন তিনি; সারা দেশের তরুণ-যুবাদের মুখেমুখে এখন নাসেক নাসেক আর এর স্রষ্টার জয়জয়কার। সময়ের জনপ্রিয় এই শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানভীর তানিম

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২২, ২১:৩৫

২০২০ সালের করোনাকালে শুরু করেছিলেন, মাঝে দুই বছর পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যেই জয় করে নিয়েছেন সবার মন; প্রথম শিল্পী হিসেবে গান গাইলেন কোক স্টুডিও বাংলা’তে। স্বপ্নের মতো মনে হয় না? জবাবে অনিমেষ রায় বললেন, 'অবশ্যই স্বপ্ন মনে হয় (হেসে)। তবে শুধু হাজং গানের জন্য ওখানে যাইনি।'


যেভাবে শুরু 
অনিমেষের শুরুটা এত আড়ম্বরপূর্ণভাবে ঘটেনি। সাধারণ চিন্তাভাবনা থেকেই ২০২০ এ খুলেছিলেন ইউটিউব চ্যানেল। করোনাকাল তখন, চারদিকে বন্দিদশা। অনিমেষ এ সময়টাকে কাজে লাগালেন, নিয়মিত ফোক গান করে ভিডিও আপলোড করতে থাকলেন। সাধারণ মানুষের ভালোবাসাও পেলেন; প্রতিটি ভিডিওতে যুক্ত হতে থাকল হাজার হাজার শেয়ারিং আর প্রশংসাসূচক মন্তব্য। আর এ সবকিছু দৃষ্টি এড়ায়নি জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী শায়ান চৌধুরী অর্ণবের। অনিমেষকে তিনি ডাকলেন। তবে ততক্ষণ অবধি তিনি জানতেন না যে, এই যুবক হাজং গানে পটু৷ সবকিছু জানাশোনার পর হাজং গানই চূড়ান্ত হলো। অনিমেষের ভাষায়, 'ব্যাপারগুলো সব মিলে যাচ্ছিল।' এরপরই, কোক স্টুডিও বাংলার প্রথম শিল্পী হিসেবে মঞ্চ কাঁপালেন অনিমেষ।

Animesh Roy


কোক স্টুডিও’র মঞ্চে নাসেক নাসেক
'অন্যান্য সময় গান গাইতে গেলে আশপাশে কোনো খেয়াল থাকে না, একেবারে গানের ভিতরে ঢুকে যাই। কিন্তু কোক স্টুডিও’র গানের শ্যুটের সময় খুব ভয় পাচ্ছিলাম। আমি লিড ভোকালে, সাথে আছেন পান্থ কানাইদার মতো শিল্পী। কয়েকবার মাঝপথেই থেমে যাচ্ছিলাম। পরে অর্ণবদা সহ অন্যান্যরা এসে সাহস দিলেন। গান তৈরি হয়ে গেল!' —বলছিলেন অনিমেষ।


ছিল শঙ্কা
ছোটবেলা থেকেই বাঙালি পরিবেশের সান্নিধ্যে থেকেছেন অনিমেষ। এদেশের সংস্কৃতিকে অপরিচিত মনে হয়নি কখনো। মনে হয়নি ভিন্ন কিছু করছেন। তবে নাসেক নাসেক গাওয়ার পর একটু দুশ্চিন্তাই হচ্ছিল তার। সম্পূর্ণ আলাদা সংস্কৃতির একটা গান সাধারণ মানুষ কীভাবে নেবে! এটা কি গতানুগতিক ধারার গানের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারবে! সেই আশঙ্কা দূর হয়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহে শুধু ইউটিউব থেকেই ৬৯ লক্ষের বেশি মানুষ গানটি শুনেছেন।


পরিবার থেকে শুরু
ছোটবেলা থেকেই গান-বাজনা খুব কাছ থেকে দেখে আসছেন অনিমেষ। পারিবারিকভাবে হাজং গানের সাথে যুক্ত তার পরিবার। দাদু গান লিখতেন, চাচা গান লিখতেন, মা গান করেন। হাজং সমাজের যেকোনো উৎসব-অনুষ্ঠানে ডাক পড়ে তাদের। তাদের দেখাদেখি অনিমেষও লিখতে, গাইতে লাগলেন। 'ক্লাস সিক্স-সেভেনে থাকতে প্রথম গান গাওয়া শুরু করি। বলতে পারেন, ঠিকমতো কথা বলার আগেই গান গেয়েছি। আ বলতে পারার আগেই হারমোনিয়াম ধরেছি', বলছিলেন অনিমেষ। এভাবে একটা পারিবারিক সঙ্গীত আবহের মধ্যে থেকে নিজের ভীত গড়েছেন তিনি। যেখানে ওস্তাদ বা সংগীত গুরু হিসেবে পেয়েছেন নিজ রক্তেরই আত্মীয় স্বজনদের। তারা তাকে শিখিয়েছেন, উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে পাশে থেকেছেন।


বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পূর্ণতা
পরিবার থেকে হাতেখড়ি হলেও সংগীতের ব্যাকরণ, তাল-লয় সবকিছুই অজানা ছিল অনিমেষের। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তত্ত্বীয় এসব বিষয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। আর এক্ষেত্রে নিজ বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সিনিয়র ভাই, বন্ধু-বান্ধবদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করতে ভুললেন না তিনি।


ইউটিউব-ফেসবুকের অবদান 
এতদূর আসার পিছনে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব-ফেসবুকের যথেষ্ট অবদান রয়েছে বলে মনে করেন অনিমেষ। তার মতে, এখন উঠে আসা সহজ। যেমন, বাড়িতে বসে গান করে আমি শিল্পী হিসেবে ঢাকায় গেছি। আমাকে নির্দিষ্ট ভেন্যুতে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়নি, এখানে ওখানে দৌঁড়াতে হয়নি। বাড়িতে বসে পরীক্ষা দিয়ে সিলেক্টেড হয়ে একবারে মূল মঞ্চে গেছি; আমাদের পূর্বসূরিরা কিন্তু এসব সুবিধা পায়নি। সাথে তিনি যোগ করেন, তবে প্রতিযোগিতা এখনো আছে এবং দিন-দিন তা বাড়ছে। ভালো কাজের পাশাপাশি পরিশ্রম করে যেতে হবে। তবেই মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ থাকবে।


গান নিয়ে থাকতে চাই 
ভবিষ্যতে আর কী করতে চান, এমন প্রশ্নের জবাবে অনিমেষ বললেন, 'গানটা নিয়ে আছি, থাকতে চাই।' শুধু ফোক নিয়ে? 'ফোকটাকে ভালোবাসি, এটাকে বেশি প্রায়োরিটি দেই। এছাড়া সব ধরনের গানই করতে চাই, যতদিন গলায় কুলায়। পাশাপাশি পাহাড়ি-আদিবাসী গানগুলোকে সামনে আনতে চাচ্ছি।'
তিনি বললেন, 'এখন যে অবস্থায় আছি একটা দায়িত্ব এসে পড়েছে। সেই দায়িত্বটা ভালোভাবে পালন করতে চাই। এজন্য একটু সময় দরকার, গোছানো দরকার নিজেকে।'

 

ইত্তেফাক/এসটিএম