বর্তমান সমাজের অস্থির অবস্থার প্রতিচ্ছবিতে ঘটে যাওয়া সামাজিক অপরাধগুলোর ধারাবাহিকতা লক্ষ করলে সহিংস আচরণের নির্মমতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পূর্বের চুরি, ছিনতাই বা ডাকাতির ঘটনার চেয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে কিশোর গ্যাং, গণধর্ষণ, সাইবার ক্রাইম বা নির্যাতনের পর হত্যার সংস্কৃতিতে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর সুশীলসমাজ সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে আর প্রশাসনের তাৎক্ষণিক তৎপরতার চিত্র যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে দ্রুত সংবাদের শিরোনামে পরিণত হয়। কিছুদিন এভাবে আন্দোলন চলার পর বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতায় যখন সবাই ক্লান্ত হয়ে যায় তখনই আর একটি অপরাধ সংঘটিত হয়। আবার সবাই সে দিকে ঝুঁকে যায়। একই প্রক্রিয়ায় চক্রাকারে এমন আবর্তন চলতেই থাকে। একে অপরাধের দুষ্টচক্র বললে ভুল হবে না। আমরা যারা রাষ্ট্রের অতি সাধারণ জনগণ তাদের পক্ষে সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বজায় রেখে চলা অকল্পনীয়। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, এমন অবস্থা থেকে মুক্তি কি কোনোভাবেই সম্ভব নয়? এর উত্তর এক কথায় দেওয়া আসলেই অসম্ভব।
প্রথমত, কোনো সামাজিক সমস্যার জন্ম যেমন একক কারণে হয় না, ঠিক তেমনিভাবে তার সমাধানও এককভাবে হবে না। যে কোনো সামাজিক সমস্যার চূড়ান্ত রূপ হলো—সামাজিক আইন, যা সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে আসে। বর্তমানে সামাজিক সমস্যা হিসেবে আসা সামাজিক অপরাধগুলোর জন্য আইন আছে কিন্তু আইনের দ্রুত কার্যকারিতার সংস্কৃতির চর্চা কম থাকায় অপরাধীরা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অন্যদিকে গণমাধ্যমগুলোতে হট টক বলে একটা ইসু্য আছে, যেখানে সংঘটিত অপরাধের খবর যতটা গুরুত্ব নিয়ে প্রকাশ পায়, শাস্তি কার্যকরের খবর ততটা গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয় না। এতে অপরাধীরা ধরেই নেয় যে, কিছুদিন পর সব আবার আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক আন্দোলন যতই হোক না কেন, তাতে দলমতনির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ সমভাবে হয় না। যা কিছু খারাপ তাকে খারাপ বলার মনোবল আর ঘৃণা করার মানসিকতা সবার থাকা উচিত। তৃতীয়ত, সবকিছু আইন দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়, সেজন্য আইনের চেয়ে রাষ্ট্রের থেকে বড় শক্তি হচ্ছে পরিবার তথা পারিবারিক মূল্যবোধ। পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি বাস্তব উদাহরণ দিই—কয়েক বছর আগে একবার শিশুপার্কে বাচ্চাকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম। একটি রাইডে চড়ার সময় আমার বাচ্চাটি আগে বসে পড়লে অন্য আরেকটি শিশু তাতে বসতে পারে না। তখন সে তার মাকে বিষয়টি জানালে ভদ্রমহিলা শিশুটিকে নির্দেশ দেয়—যেন সে ধাক্কা দিয়ে আমার শিশুটিকে রাইড থেকে ফেলে দিয়ে রাইডে ওঠে। কিন্তু ইতিমধ্যে রাইডটি চালু হয়ে যাওয়ায় বাচ্চাটি বাধ্য হয়ে অন্য রাইডে বসে পড়ে। ঘটনাটির আকস্মিকতায় আমি প্রথমে বাকরুদ্ধ হলেও পরে আমি বুঝতে পারি, পারিবারিক শিক্ষা আর পুথিগত বিদ্যা দুই-ই আজ মূল্যবোধকে জাদুঘরে পাঠিয়েছে।
সামাজিক অপরাধ সৃষ্টির হাজারটা কারণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে কিন্তু তাকে থামানোর পথটা আজও পরিবারের হাতে। পৃথিবীর সবচেয়ে আদি ও মৌলিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবারের গুরুত্ব কোনোদিন কমবে না। পারিবারিক মূল্যবোধ ও শিক্ষা যদি সঠিক হয়, তাহলে অপরাধ কমতে বাধ্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—সবার পারিবারিক মূল্যবোধ তো নেতিবাচক নয়, তাহলে সবার কথা কেন বলছি! এক্ষেত্রে উত্তরটা প্রথাগতভাবে দিতে চাই—তা হলো দুধের মধ্যে একফোঁটা লেবুর রসই যথেষ্ট তাকে নষ্ট করার জন্য। সমাজ তার গতিতে চলবে, রাষ্ট্র তার মতো করে আইনের প্রয়োগ করবে। কিন্তু পারিবারকে এখন ইতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধের চর্চায় এগিয়ে আসতে হবে। নিজে ঠিক না হয়ে অন্যকে কীভাবে ঠিক হতে বলি!
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা আগেও ঘটেছিল। তখনো আন্দোলন হয়েছিল। কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলার ছাত্রীকে হত্যার ঘটনা ঘটে। এমনি ঘটনাগুলো প্রতিবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—নারী মানেই তাকে অসম্মান করা যায়, অপমান করা যায়। এ ধরনের নেতিবাচক মূল্যবোধগুলো আমাদের সামনে আগাতে দেবে না কোনোদিনই। একদিকে ঘরে লক্ষ্মী-সরস্বতীর মতো বউ আনতে চাই, আবার দুর্গার মতো পতিভক্তিও কামনা করি। তাহলে দুর্গার কঠিন রূপ কেন দেখতে চায় না সমাজ? আমাদের স্ববিরোধী মনোভাব আমাদেরকে বিবেকশূন্য করে দিয়েছে। ভালোমন্দ বিচার করার ক্ষমতা যদি বিবেক হয় আর তা বিশ্বাস করাকে যদি মূল্যবোধ বলি, তাহলে অবশ্যই পরিবার হচ্ছে মূল্যবোধচর্চার সূতিকাগার। আমাদের দেশে আইমান সাদিকের মতো ভালো মনের যুবসমাজ যেহেতু আছে, সেহেতু আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে, বাংলাদেশ সম্ভাবনার দেশ। এদেশে কুত্সিত মানসিকতা নিয়ে কেউ সফল হতে পারবে না। পারিবারিক সামাজিক আন্দোলনের শক্তি জাগ্রত হোক সত্যের সন্ধানে। আর একটি অপরাধ যেন সংঘটিত না হয় সেজন্য আজ থেকেই ইতিবাচক মূল্যবোধ দিয়ে পরিবারকে গড়ে তুলি। নিজের দেশ আর সংস্কৃতিকে সন্তানকে চেনাই বইয়ের মাধ্যমে—ডিভাইস বা গ্যাজেটের মাধ্যমে নয়। আর সংঘটিত অপরাধগুলোর শিকার মানুষগুলোকে একটি কথাই বলব—ভেঙে পড়ো না কোনো কিছুতে, তোমার শক্তি তুমিই। তাকিয়ে দেখো সামনে তোমার জন্য খোলা দিগন্ত অপেক্ষা করছে। তুমি ছুটে চলো আপন শক্তিতে, বিশ্ব তোমার পেছনে ছুটবে।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, যোগাযোগ
বৈকল্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
