রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধ ইতিমধ্যে তৃতীয় সপ্তাহে গড়াইয়াছে; ইহা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হইতে ইউরোপের সব চাইতে বড় সংঘাত ও সংকট। শীঘ্রই এই যুদ্ধ-সংঘাত থামিয়া যাইবে এমন কোনো সম্ভাবনা আপাতত পরিলক্ষিত হইতেছে না; বরং বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করিতেছেন যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হইবে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করিবে। যুদ্ধ কেবল সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সমস্যা নহে, উহা সারা বিশ্বের জন্যই পরোক্ষ সমস্যা হইয়া উঠে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া সমগ্র বিশ্ব যে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার পথে ধাবিত হইতেছে তাহা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করিয়া, যেই বিষয়গুলিতে বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলিবে—তাহার মধ্যে অন্যতম হইল খাদ্য ও জ্বালানি সংকট। নগরে আগুন লাগিলে তাহার উৎতাপ হইতে দেবালয়ও যেমন রক্ষা পায় না, তেমনি রুশ-ইউক্রেন এই যুদ্ধের অভিঘাত আমাদের উপরও পড়িবে নিশ্চিতভাবে।
বিশ্বের যেই সকল দেশের সহিত বাংলাদেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য বা আমদানি-রপ্তানি অধিক হয়, টাকার অঙ্কে সেই তালিকার শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রাশিয়া কিংবা ইউক্রেন না থাকিলেও দুইটি দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের বাণিজ্য রহিয়াছে। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যেই দেশে গম, সূর্যমুখী তেল আর ভুট্টার মূল্য বৃদ্ধি পাইতে শুরু করিয়াছে। তুলা, সরিষা ও মসুর ডাল রাশিয়া ও ইউক্রেন হইতে আমদানি করা হয়। রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের মোট গমের ২৫ শতাংশ রপ্তানি করিয়া থাকে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করিতেছেন, যুদ্ধের ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদনের উপর প্রভাব পড়িতে পারে, এমনকি বিশ্বে গমের মূল্য দ্বিগুণ হইয়া যাইতে পারে। বিশ্বের অন্যতম এক বৃহৎ সার কোম্পানির প্রধান বলিয়াছেন, রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ সারের মূল্য লাগামছাড়া করিয়া দিতে পারে। সারের মূল্য বৃদ্ধি পাইলে তাহার বিরূপ প্রভাব পড়িবে কৃষি উৎপাদনের উপর। এমনিতেই গ্যাসের মূল্য আকাশছোঁয়া হইবার কারণে রাশিয়ার আগ্রাসনের পূর্ব হইতেই সারের মূল্য অধিক ছিল। তাহা এখন কোথায় গিয়া ঠেকিবে বুঝা যাইতেছে না। মনে রাখিতে হইবে, সারের জন্য বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা খাদ্য পাইয়া থাকে। কারণ, সারের কারণেই উৎপাদন দ্বিগুণ তিন গুণ হইয়া থাকে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান ডেভিড বিসলি জানাইয়াছেন, যুদ্ধের কারণে খাদ্যের মূল্য এতটাই বৃদ্ধি পাইতে পারে যে, তাহা বিশ্বের দরিদ্র মানুষদের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করিবে। অন্যদিকে ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাইয়া রেকর্ড ছুঁইয়াছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন ও জাহাজ ভাড়াও বৃদ্ধি পাইতেছে। পণ্য পরিবহনে খরচ অধিক হইলে স্বভাবতই সেগুলির মূল্য বৃদ্ধি পাইবে, এমনকি কৃষি উৎপাদনেও খরচ বাড়িয়া যাইবে। এই সকল সংকট তো রহিয়াছেই, ইহার সঙ্গে যুক্ত হইয়াছে—যেই সকল দেশ ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের নিন্দা জানাইয়া জাতিসংঘে মত প্রদান করিয়াছে অথবা ভোটদান হইতে বিরত ছিল এবং যাহারা রাশিয়ার নিকট হইতে সামরিক সরঞ্জাম কিনিয়া থাকে, তাহারা বিবদমান দুই পক্ষ হইতে নানাভাবে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়িতে পারে। আবার এই সকল অনেক দেশের সঙ্গেই আমাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি রহিয়াছে। সুতরাং তাহারা নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হইলে উহা যে আমাদের দেশের অর্থনীতির উপরও সরাসরি প্রভাব ফেলিবে, তাহা সহজেই অনুমেয়।
বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির অভিঘাতে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরো দীর্ঘায়িত হইবার আশঙ্কার বিষয়টি এবং প্রতিবেশী যেই সকল দেশের সঙ্গে আমাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানির সম্পর্ক রহিয়াছে তাহাদের উপর কোনোরূপ নিষেধাজ্ঞা আসিলে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করিতে হইবে। এই অবস্থায় আমাদের নীতিনির্ধারকদের, বিশেষ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাহাতে আসন্ন বিপর্যয় আমরা বুদ্ধিমত্তার সহিত সামলাইতে পারি।
