বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কালের সাক্ষী রাণীনগরের গোপাল গিরিধারী জিউর মন্দির

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২২, ১৪:০৪

নজরদারির অভাবে নওগাঁর রাণীনগরের প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো গোপাল গিরিধারী জিউর মন্দির ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। মন্দিরটির তিন ভাগের প্রায় দুই ভাগ ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে শেষাংশটুকু। সরকার পর্যায় থেকে এটি সংরক্ষণ ও সংস্কার করার দাবি জানিয়েছে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ এবং এলাকাবাসী। 

দেশের সংস্কৃতি ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় এই সব ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কার করা বিশেষ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন উপজেলার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও রাণীনগর মহিলা অনার্স কলেজের উপাধ্যক্ষ চন্দন কুমার মহন্ত। 

উপজেলার গহেলাপুর গোপাল গিরিধারী জিউর মন্দির কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় আড়াইশ বছর আগে সিদ্ধ পুরুষ কান্তজী বাবাজী মহারাজ বহু চেষ্টায় প্রায় ৩৭ শতক জায়গায় ইট দিয়ে নির্মাণ করেন একটি মন্দির। সেখানে শ্রী শ্রী গোপাল গিরিধারী ঠাকুর সেবা অর্থাৎ কৃষ্ণের বাল্য স্বরূপ কষ্টিপাথরের মূর্তি স্থাপন করে পূজা-অর্চনা শুরু করেন। এ এলাকা থেকে ফিরে যাওয়ার সময় মন্দিরের সেবায় মহারাজ প্রায় ১৬ বিঘা ফসলি জমিও দিয়েছিলেন যা এখনোও মন্দিরের নামে রয়েছে। এই মন্দিরে এক সময় রাণীনগর উপজেলার প্রায় ৬৪ টি গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দৈনন্দিন পূজা-অর্চনার পাশাপাশি মন্দিরকে ঘিরে একটি বিশেষ সময়ে মেলা ও উৎসবের আয়োজন করা হতো।

কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মন্দিরটি ফেটে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ১৯২২ সালের প্রবল বন্যায় মন্দিরের একাংশ ডেবে গিয়ে ভেঙ্গে যায়। তারপর থেকে স্থানীয় মানুষজন মন্দির ও ফাঁকা জায়গাটি বেপরোয়া  ব্যবহার ও অসচেতনতার কারণে মন্দিরটির আজ এই বেহাল দশা। প্রাচীন এই মন্দির কত সালে স্থাপিত হয়েছে সে তথ্য জানা যায়নি।  

মন্দির কমিটির একটানা ২৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকারী গহেলাপুর গ্রামের অমিয় কুমার শাহা জানান, দিনাজপুরের মহারাজ কর্তৃক নির্মিত এই মন্দিরটি কালের বিবর্তনে যখন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে তখন আমাদের পূর্বপুরুষরা চোর-ডাকাতের ভয়ে কৃষ্ণের বাল্য স্বরূপ কষ্টিপাথরের মূর্তিসহ আরও অন্যান্য কারুকার্য সমৃদ্ধ প্রাচীন জিনিসপত্র গ্রামের ভিতরের একটি মন্দিরে রেখে ছিল। অনেক বছর আগে সেই মন্দির থেকে সে গুলো চুরি হয়ে যায়। 

মন্দিরটির বর্তমান ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির সভাপতি বৃন্দাবন পাল বলেন, বাপ-দাদার আমলে পূজা-অর্চনা ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের দৃশ্যপটের সংমিশ্রণে সিদ্ধ পুরুষ কান্তজী বাবাজী মহারাজের নির্দেশে নির্মিত মন্দিরটি মুখরিত হয়ে থাকতো। কিন্তু অসচেতনতার কারণে কালক্রমে যখন মন্দিরটি অকেজো হয়ে পড়ে তখন পূজা-অর্চনা বন্ধ হয়ে গেলে মন্দিরের সকল জিনিসপত্র গ্রামের ভিতরের একটি মন্দিরে রাখা হয়েছিল, তাও আবার বহু বছর আগে কৃষ্ণমূর্তিসহ বিভিন্ন স্মৃতিচিহৃ গুলো চুরি হয়ে যায়। বর্তমানে মন্দিরটির শেষাংশটুকু যেমন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তেমনি কর্তৃপক্ষের স্বদিচ্ছায় এটি তৈরি হতে পারে একটি দর্শনীয় পর্যটন স্পটে।

গোপাল গিরিধারী জিউর মন্দির নিয়ে প্রচলিত একটি কাহিনী রয়েছে,  সিদ্ধ পুরুষ কান্তজী বাবাজী মহারাজ ছিলেন নিঃস্ব-সন্তান, একদিন স্বপ্নে তিনি দেখলেন তার রাজত্বের তৎকালীন রাজশাহী জেলার আত্রাই পাচুপুর স্টেটের আয়ত্তাধীন গহেলাপুর গ্রামে মন্দির নির্মাণ করে গোপাল গিরিধারী ঠাকুর স্থাপন করে (কৃষ্ণের বাল্য স্বরূপ) সেবা করলে তিনি সন্তান লাভ করবেন, তাই তিনি এই মন্দির নির্মাণ করে  গিরিধারী ঠাকুর সেবা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে তিনি সন্তান লাভ করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুশান্ত কুমার মাহাতো বলেন এই মন্দিরটি বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে লিখিত ভাবে জানাবো। তারাই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

 

ইত্তেফাক/এআই