আলোকপাত

গার্মেন্টস শ্রমিকদের এমন মৃত্যু আর দেখতে চাই না

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ২১:২২
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নকামী এই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি বলতে আজ গার্মেন্টস শিল্পই প্রধান। আশির দশকের সূচনায় যাত্রা শুরু করে পোশাকশিল্প আজ যেখানে পৌঁছেছে তা বিস্ময়কর। আজ কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার উত্স এই ব্যবসা। এই শিল্প। সাধারণ মানের অল্প মূলধনের উদ্যোক্তাও দিনে দিনে বিশাল বড় পুঁজির মালিক। যিনি একটি ছোট্ট কারখানা দিয়ে শুরু করেছিলেন তিনি এখন অনেকগুলো কারখানার মালিক। বিশাল তার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি। কিন্তু কেন এই বিশাল সাফল্য? একটাই উত্তর এদেশে পানির দামে দরিদ্র মানুষের শ্রম কেনা যায়, যা পৃথিবীর আর কোনো দেশে নেই। আসলে গরিব এই লাখ লাখ শ্রমিকের নিরন্তর শ্রমে-১ঘামে এসেছে। যাদের শ্রমে গার্মেন্টস শিল্পের এতো অর্জন সেই দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণীর কথা মালিকরা কতখানি ভেবেছেন গত তিন দশকে। এই প্রশ্নটা বারবার উঠেছে প্রতিটি দুর্ঘটনার পর। গত শনিবারে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের দুর্ঘটনার পরও এই প্রশ্নটা আবার উঠলো। ১১৫ জনের মৃত্যুর খবর এ যাবত্ আমরা গণমাধ্যমে পেয়েছি। কিন্তু অনেকে এখনও হারানো স্বজনদের খুঁজে না পেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুর্ঘটনা কবলিত এলাকায়। হয়তো আর কিছুদিন পর কারখানার হাজিরা খাতা এবং নিখোঁজ মৃত শ্রমিকদের পরিসংখ্যান পাওয়া গেলে জানা সম্ভব হবে কত প্রাণ বলি হলো তাজরীন ফ্যাশন নামের ওই অভিশপ্ত প্রতিষ্ঠানের আগুনে। গত শনিবার রাতে গার্মেন্টসটির নিচের তলায় কাপড়ের গুদামে আগুন লাগার পর থেকে যে করুণ এবং নির্মমতার যে চিত্র দেশের সমস্ত গণমাধ্যমে এসেছে তাতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক গার্মেন্টস শ্রমিকদের জানমালের নিরাপত্তা কতখানি গুরুত্ব দেয়া হয়। গুরুত্ব যে সামান্যই তা বোঝা যায় উপরে ওঠার এবং নিচে নামার সমস্ত গেট বন্ধ করে দেয়ার তথ্য থেকে। এমনকি আগুন লাগার পর যখন সাইরেন বাজানো হচ্ছিল তখনও হতভাগ্য শ্রমিকদের বের হতে দেয়নি ম্যানেজার পর্যায়ের স্টাফরা। কী নিষ্ঠুর স্বার্থপর আচরণ। এমন আচরণ অধিকাংশ গার্মেন্টস কারখানাতেই দেখা যাবে। যে শ্রমিকরা এতো কঠোর পরিশ্রম করে বাধ্যতামূলক অতিরিক্ত সময় কাজ করে তাদের বিনোদন কিংবা সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দূরে থাক দুবেলা দুমুঠো খেয়ে পরে বাঁচার মতো বেতনও কি তারা পায়? পায় না। বর্তমানে যে বেতন কাঠামোয় গার্মেন্টস শ্রমিকরা কাজ করে সেই বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন বেতন আরও কত কমানো যায়-এ নিয়ে কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমই নেতারা যে কী দর কষাকষিই না করলেন প্রায় বছরকাল ধরে তা পত্র-পত্রিকার পুরানো ফাইলে এখনও পাওয়া যাবে। শ্রমিককে যত কম দিয়ে পারা যায়- এই নীতির ওপর ভর করে যে গার্মেন্টস শিল্প-কারখানা চলছে তাদের বিবেক বিবেচনা আর নীতি নৈতিকতা কতটুকু তা যে কোনো সচেতন মানুষ উপলব্ধি করতে পারবেন। যে কোনও গার্মেন্টসে গেলে দেখা যায় দুপুরের খাবার খাচ্ছে শ্রমিকরা সিঁড়ির ওপর বসে কিংবা ময়লা আবর্জনাময় পরিবেশে। তাদের খাবারের জন্য একটা কোনো রকম ব্যবস্থার কথাও কেউ ভাবেন কি? তাদের বেতন এতো কম কেন-গত মঙ্গলবার রাতে চ্যানেল ’৭১ এ এই প্রশ্ন করা হয়েছিল বিজিএমইএ’র সভাপতি সাহেবকে। তিনি বললেন সরকার যে বেতন স্কেল করে দিয়েছে তা ই তো দেই। পাল্টা প্রশ্ন করা হয়েছিল এই বাজারে এই বেতনে চলে একজন শ্রমিকের সংসার। জবাব দিলেন সেটা দেখার সুযোগ নেই। কারণ বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন দেয়া হয়। কিন্তু তারা যে কঠিন দরকষাকষি করে বেতনটা সর্বনিম্ন রেখেছেন তা বললেন না। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে যে কোনো দুর্ঘটনায় আমরা ষড়যন্ত্রের কথা শুনি। এবারও শুনছি। কিন্তু এতোগুলো প্রাণহানির পরও পরিবারগুলোর কী হবে-তা নিয়ে কিছুই কেউ বলছেন না। আহতদের চিকিত্সা অর্থাভাবে ব্যাহত হচ্ছে, কেউ দেখার নেই। ষড়যন্ত্র যে নেই, তা বলবো না কিন্তু এই শিল্প যদি রক্ষার জন্য ন্যূনতম শ্রমনীতি মানা না হয়, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান, তাদের স্বাভাবিক চাহিদার কথা যদি ভাবা না হয়-তবে বিদেশি ষড়যন্ত্র প্রয়োজন হবে না, আপনা থেকেই ধ্বংস হয়ে যাবে এই শিল্প যা আমরা কেউ চাই না। লেখক :ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক