পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বর্তমান সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বলেছেন, বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে’ মর্মে অঙ্গীকার করলেও বিগত চার বছরে তা বাস্তবায়নের কোন অগ্রগতি হয়নি। সরকারের দীর্ঘ চার বছর সময়ে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি কেবল একের পর এক প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৫তম বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্র সরেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, আইইডি’র নির্বাহী পরিচালক নোমান আহমেদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা প্রমুখ।
জ্যোতিরিন্দ্র লারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-পূর্ব অবস্থার মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বক্ষেত্রে এখনো সেনা কর্তৃত্ব ও প্রশাসনের সামপ্রদায়িক শোষণ-নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে। জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব বিলুপ্তির ষড়যন্ত্রমূলক ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম এখনো পূর্বের মতো অব্যাহত রয়েছে। অপারেশন উত্তরণের ছত্রছায়ায় ও সাধারণ প্রশাসনের সহায়তায় তথাকথিত পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনসহ উগ্র সামপ্রদায়িক জাতি-বিদ্বেষী গোষ্ঠী জুম্মদের জমি জবরদখল করার লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ সামপ্রদায়িক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সেনানিবাস সমপ্রসারণ, ইকো-পার্ক ও পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, বিভিন্ন কোম্পানি কর্তৃক অবৈধ দখলসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অস্থানীয় প্রভাবশালীদের নিকট ভূমি ইজারা প্রদান, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা ইত্যাদির নামে জুমভূমিসহ জুম্মদের রেকর্ডীয় ও ভোগদখলীয় জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে জুম্মদের উচ্ছেদের প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে। জুম্মদের ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, নিরীহ গ্রামবাসীদের উপর হামলা ও হত্যা, জুম্ম নারীদের অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা ইত্যাদি সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে জুম্মদের জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। অতি সমপ্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের ভূমি জবরদখল ও তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে সামপ্রদায়িক হামলা, ভূমি জবরদখল ও উচ্ছেদ, নারীর উপর ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণসহ নৃশংস সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ১১ বছরের সুজাতা চাকমা ও নওগাঁর ৭ বছরের কন্যাশিশু সাগরী ওঁরাওকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ শাসন প্রতিষ্ঠা, গণমুখী ও পরিবেশমুখী সুষম উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানার্থে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা পূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান সন্তু লারমা।
এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আগামীকাল রবিবার সকাল ১০টায় ঢাকার রমনা ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটে, বিকাল ৩টায় চট্টগ্রামের ডিসি হিল পার্কে এবং সকাল ১০টায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন সদরে গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
