এইডস ও বাংলাদেশ

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০১২, ২১:১৫
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত রোগের নাম এইডস। বাংলাদেশে এইডস রোগী প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। বিশ্ব এইডস দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য— এইচআইভি সংক্রমণ ও এইডস-এ মৃত্যু: নয় একটিও আর, বৈষম্যহীন পৃথিবী আমাদের অঙ্গীকার। এইচআইভি একটি অতি ক্ষুদ্র বিশেষ ধরনের ভাইরাস যার কারণে মানুষ এইডসে আক্রান্ত হয়। এই ভাইরাস মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এ কারণে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি অতি সহজেই অন্য যে কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বে এইচআইভি/ এইডস আক্রান্তদের তিন ভাগের এক ভাগ হচ্ছে যুব সমাজ। তাই এইডস কী? এইডস কীভাবে ছড়ায় এবং কীভাবে এর প্রতিরোধ করা যায়? কোথায় গেলে এর প্রকৃত চিকিত্সাসেবা পাওয়া যাবে—এ বিষয়গুলো সম্পর্কে তরুণদের সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। আমাদের সমাজে যদি কারো এইচআইভি পজিটিভ ধরা পড়ে তা হলে সমাজের অনেকেই মনে করেন ঐ ব্যক্তিটি নিশ্চয়ই অসামাজিক যৌন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। সব সময় এই ধারণা পোষণ করা বা ব্যক্তিকে অপবাদ দেয়া বা দোষারোপ করা ঠিক হবে না। তাদেরকে সমাজ বিচ্ছিন্ন করে ফেলার যে প্রবণতা আছে, তার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। এইচআইভি বিভিন্নভাবে মানবদেহে সংক্রমিত হতে পারে। যেমন—১) এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত শরীরে গ্রহণের মাধ্যমে কিংবা একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক একই সিরিঞ্জ ও সূঁচ ব্যবহারের মাধ্যমে, ২) অপারেশনের সংক্রমিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার মাধ্যমে, ৩) এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে কনডম ছাড়া যৌন মিলনের মাধ্যমে, ৪) সংক্রমিত ব্যক্তির কিডনি, কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে, ৫) সংক্রমিত ব্যক্তির শেভিং রেজার, ব্লেড, টুথব্রাশ ব্যবহার করার মাধ্যমে, ৬) মায়ের এইচআইভি পজিটিভ হলে কোনো কোনো শিশু মায়ের কাছ থেকে এইচআইভি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, ৭) এইচআইভি সংক্রমিত মায়ের বুকের দুধ পান করার মাধ্যমেও শিশু সংক্রমিত হতে পারে, ৮) দন্ত চিকিত্সকের যন্ত্রপাতি, সেলুন, পার্লারে নাক, কান ফুটানোর সময় জীবাণুযুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণেও এইডস ছড়াতে পারে। এখন পর্যন্ত এইচআইভির কার্যকর প্রতিষেধক তৈরি হয়নি এবং এই রোগের তেমন কোনো চিকিত্সাও নেই। তবু কিছু কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে যে ওষুধগুলো মূলত বিভিন্ন জটিলতাকে সামান্য বিলম্বিত করে এবং এইডসকে বাড়াতে বাধা দেয়। ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই’— এক সময় মানুষের মুখে মুখে কথাটি প্রচলিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে যক্ষ্মা প্রতিরোধের কার্যকর ওষুধ বাজারে আসায় এখন বলা হয় ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই—এই কথার ভিত্তি নেই’। এইডস- এর কার্যকর প্রতিষেধক না থাকায় এতদিন এটাকে মরণব্যাধি হিসেবেই উল্লেখ করা হতো। চিকিত্সাবিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও চেষ্টায় এর থেকেও পরিত্রাণের সময় এসেছে। কারণ বাজারে আসছে এইডস ঠেকানোর ওষুধ ‘ট্রুভাদা’ (TRU VADA)। ‘ট্রুভাদা’ হলো আমেরিকার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের এফডিএ অনুমোদন করা প্রথম ওষুধ। ওষুধটি এইচআইভির সংক্রমণ থেকে কমপক্ষে ৭৩ ভাগ নিরাপদ রাখতে সক্ষম বলে গবেষণায় দেখা গেছে। ‘ট্রুভাদা’ প্রস্তুত করেছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক জিলড সায়েন্সেস। যদিও এইডস হেলথ কেয়ার ফাউন্ডেশন (এএইচএফ) বলেছে ‘ট্রুভাদা’ সেবনের ফলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে— এমন তথ্য প্রমাণ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এএইচএফ প্রেসিডেন্ট ‘ট্রুভাদা’ অনুমোদনের বিষয়টিকে ‘এফডিএ’-এর হঠকারী সিদ্ধান্ত বলেও আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো যে সব ব্যক্তি এইচএইভি পজিটিভ তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে একজন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি তার মানসিক সমস্যা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়ে থাকে। একজন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির যে সমস্ত মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে তা হলো বিষণ্নতা, অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন থাকা, অস্থিরতা, হতাশা, রাগ, মৃত্যুভীতি, নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, এইচআইভি পরীক্ষার ফলাফল মেনে না নেয়া, অন্যের ওপর দোষারোপ করা, আত্মহত্যা প্রবণতা প্রভৃতি। এইচআইভি পরীক্ষার ফলাফল যদি পজিটিভ আসে, সে ক্ষেত্রে ফলাফল রোগীকে জানানোর সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই একজন কাউন্সেলরের মাধ্যমে রিপোর্ট প্রদান করা আবশ্যক। মনোবিজ্ঞানী ও কাউন্সেলরগণ কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তির মানসিক সমস্যাগুলো কমাতে, ইতিবাচক জীবন যাপন করতে ও মনোবল দৃঢ় করার জন্য রোগীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন যেমন:আইসিডিডিআরবি, আশার আলো সোসাইটি, কনফিডেনসিয়াল এপ্রোচ ফর এইচআইভি অ্যান্ড এইডস প্রিভেনশন (ক্যাপ), পায়কট বাংলাদেশ, মুক্ত আকাশ বাংলাদেশ প্রভৃতি সংগঠন এ ধরনের সেবা দিচ্ছে। এছাড়া সেভ দ্যা চিলড্রেনের এইডস বিষয়ক কার্যক্রম প্রশংসার যোগ্য। এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিকে উপেক্ষা না করে যদি সহমর্মিতা ও সহযোগিতা করা হয় তাহলে সেও সমাজের অন্যান্য মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করার অধিকার তারও রয়েছে। ঢাকা