প্রত্ন নিদর্শনসমৃদ্ধ প্রাচীন জেলা দিনাজপুর

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০১২, ২২:০৫
দিনাজপুরের নামকরণের ইতিহাস অজ্ঞাতই বলা যায়। যেটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তাতে ‘দনুজ’ নামে রাজার নাম থেকেই একদা এই দিনাজপুর নামের উদ্ভব। ইংরেজ ঐতিহাসিক বুকাননের মতে বর্তমান শহরের যেখানে রাজবাড়ি অবস্থিত সেই স্থান হতেই দিনাজপুরের শুরু। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজার সূচনায় আদি জেলাগুলোর অন্যতম দিনাজপুর। পলাশীর যুদ্ধের ৮ বছর পর ১৭৬৫ খ্রিঃ ইংরেজি সেনাবাহিনী কর্তৃক দিনাজপুর জেলা বিজিত হয়। ফলে নবাবী শাসনের অবসানের সঙ্গে পতন হয় বাংলার সাবেক ঘোড়াঘাট নগরী। কোম্পানি সরকার কর্তৃক উত্তরবঙ্গে বৃহত্ জেলা গঠিত হয়। দিনাজপুর মৌজাস্থ সাল ১৭৯৩। এই মৌজায় ইংরেজ আমলে দিনাজপুর শহরের সূত্রপাত। তবে ‘দনুজ’ নামক রাজার নাম থেকে দিনাজপুর নামের উত্পত্তি, এর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, পৌরাণিক কল্পকাহিনী মাত্র। দিনাজপুর জেলায় এ পর্যন্ত সর্বমোট একটি নব্যপ্রস্তর যুগের নির্মাণ আবিষ্কার হয়েছে। জেলায় এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ৪৮টি প্রাচীন প্রত্নস্থলের অবস্থান। দিনাজপুর সদরের কান্তনগর দুর্গনগরী ও খানপুরের শ্রী চন্দ্রপুর। খানসামার গোয়াডিহি, পার্বতীপুর উপজেলার হিরা বেশ্যার ভিটা, কিচক রাজার গড়, বিলাইচণ্ডি ও দেউলী। বদরগঞ্জে পাঁচপুকুরিয়ার রাজবাড়ি, ফুলবাড়ি উপজেলায় ফুলবাড়ী দুর্গনগরী, দামোদরপুর বৈগ্রাম, বাসনগড় পুকুরি ও ভাঙ্গাদীঘি। বিরামপুর উপজেলায় চরকাই বিরামপুর, মির্জাপুর, চণ্ডিপুর-গড়-পিঙলাই, চরকাই চোর চক্রবর্তী, বিবির ধাপ, শীতাকোট বিহার, নবাবগঞ্জ উপজেলায় নবাবগঞ্জ ও তর্পনঘাট, হরিনাথপুর ভাদুরিয়া, চকজুনিথ-দুরিয়া, দামোদরপুর, জিকাগড়। ঘোড়াঘাট উপজেলার বেলওয়া, পল্ল বা পল্লরাজ, বারপাইকের গড়, হাকিমপুর উপজেলায় বৈগ্রাম ও টুঙ্গি শহর। উল্লিখিত ৪৮টি প্রত্নস্থলের মধ্যে ২৬টি মাটির দুর্গ। উপমহাদেশে প্রাচীনতম জেলা দিনাজপুর ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর দিনাজপুর দেশের বৃহত্ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জেলার গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মধ্যবর্তী ত্রিকোণাকৃতি বিস্তৃত ভূভাগ বরেন্দ্র অঞ্চল নামে পরিচিত। এ জেলার পশ্চিম ও উত্তর সীমানায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও দক্ষিণ-পূর্বে গঙ্গা ও যমুনা প্রবাহিত। দিনাজপুর জেলা পাদদেশীয় সমভূমির অন্তর্গত। দিনাজপুর শহর পৌরাণিক নদীর তীরে অবস্থিত নাম পুনর্ভবা। জেলা হিমালয়ের পাদদেশে সমতল ভূমিতে ৬টি সংসদীয় আসন ও ১৩টি উপজেলা নিয়ে এবং ৯টি পৌরসভা ও ১০১টি ইউনিয়ন নিয়ে দিনাজপুর জেলার মোট আয়তন ৩ হাজার ৪৩৮ বর্গকিলোমিটার। মোট জনসংখ্যা ২১ লাখ। জেলায় ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৫৬ হাজার ৩৪৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৯ লাখ ২২ হাজার ৮৮১ জন ও মহিলা ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬৪ জন। শিক্ষার হার ৪৭ ভাগ। বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম। বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১৫০ থেকে ১৭৫ মিলিমিটার। আবাদি জমির পরিমাণ ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৫৩৮ একর। মোট আবাদি জমির মধ্যে ফসলি জমি ২ লাখ ২৭ হাজার ৯৭ একর। কৃষি জমি যথেষ্ট উর্বর। দেশে অন্যতম খাদ্য ভাণ্ডার হিসাবে স্বীকৃত। জেলায় ১৩টি উপজেলা, ৯টি পৌরসভা ও ১০১টি ইউনিয়ন। সদর উপজেলাসহ বিরল, বোচাগঞ্জ, কাহারোল, বীরগঞ্জ, খানসামা, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট, হাকিমপুর, বিরামপুর, ফুলবাড়ী নিয়ে জেলা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে যে কটি জেলায় তুমুল যুদ্ধের সূচনা হয় তন্মধ্যে দিনাজপুর অন্যতম। ঢাকায় ২৫ মার্চের কাল রাত্রিতে বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর ২৬ মার্চ দিনাজপুরের পরিস্থিতি ছিল থমথমে। ২৬ মার্চ সকাল ১১টায় শহরে কারফিউ জারি করা হয়। ওইদিন বাঙালি ক্যাপ্টেন নজরুল হক ও জেলা প্রশাসক ফয়েজ উদ্দীন আহমেদকে সার্কিট হাউজে নজরবন্দি করে রাখা হয়। ২৬ মার্চে নজরবন্দি জেলা প্রশাসক ফয়েজ উদ্দীন আহমেদকে দিয়ে অস্ত্রের মুখে একটি মিটিং ডাকতে বাধ্য করা হয়। সেখানে দিনাজপুরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে দাওয়াত করা হয়। অধ্যাপক ইউসুফ আলীসহ নেতৃবৃন্দকে সার্কিট হাউজে ডেকে আনা হয়। ২৭ মার্চ কুঠিবাড়ীতে অস্ত্রাগার পাহারায় ছিল হাবিলদার খালেক, তিনি পাঞ্জাবি। আনসার আলী ও অপর একজন সহকারী পাহারাদার ছাড়া ছিল সবাই পাঞ্জাবি। বিকাল ৩টা থেকে ৪টায় ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগকারী সিগন্যালের জিপ বিদ্যুত্গতিতে ব্যারাকে প্রবেশ করতে দেখে দুঃসংবাদ ভেবে নিয়ে বাঙালি জোয়ানদের পক্ষে স্থির থাকা আর সম্ভব ছিল না। গুলি চলে অস্ত্রখানার পাহারার দায়িত্বে থাকা হাবিলদার খালেককে লক্ষ্য করে। অবাঙালি ইপিআর সদস্য কোনকিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই কুঠিবাড়ী অস্ত্রাগারের পজেশন বাঙালি জোয়ানদের দখলে চলে যায়। এরপর ব্যারাকে অন্যান্য অবাঙালি জোয়ানদের খতম করা হয়। এরপর জেলার প্রতি উপজেলাতে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত করে বিভিন্ন রণাঙ্গনে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয় মুক্তিসেনারা। ৬ জানুয়ারির ট্রাজেডি স্বাধীনতা পতাকা উত্তোলনের কয়েকদিন পর দিনটি ছিল ৬ জানুয়ারি ১৯৭২। সন্ধ্যা সমাগত প্রায়। এমনি সময় মুক্তিযোদ্ধারা যে মহারাজা স্কুলে অস্থায়ী ক্যাম্প গড়েছিল সেখানে প্রচণ্ড মাইন বিস্ফোরণ ঘটে। গোটা শহর প্রকম্পিত হয়ে উঠে। মহারাজা স্কুলভবনে অবস্থানরত কয়েকশত মুক্তিযোদ্ধা শূন্যে উড়ে যায়। বিশাল স্কুল ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দিনটিকে মহারাজা হাইস্কুল ট্র্যাজেডি নামে আখ্যায়িত করা হয়। মাইন বিস্ফোরণে নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক সংখ্যা ও পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরদিন উদ্ধারকৃত প্রায় ২শ জন মুক্তিযোদ্ধার দেহাংশ সামরিক মর্যাদায় চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। শিক্ষা সংস্কৃতি সংবলিত দিনাজপুর জেলায় বর্তমানে ২ হাজার ৭শ বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান। একটি মেডিক্যাল কলেজ ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। একটি টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট রয়েছে। তদানীন্তন বৃটিশ ভারতের অধিভুক্ত জেলা দিনাজপুরে সাংবাদিকতা চর্চা ও সংবাদপত্র প্রকাশ, পত্র-পত্রিকার প্রকাশ জেলাটির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তারই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল পাকিস্তানি আমলে। দিনাজপুরে বর্তমান ১০টি দৈনিক, তার মধ্যে ৮টি নিয়মিত। ৫টি সাপ্তাহিক পত্রিকা রয়েছে। সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পূর্ব থেকে পরিচিত। এ জেলার শিল্প ও সংস্কৃতি ঐতিহাসিক রূপ-রেখায় স্বাতন্ত্র্যবোধের দাবি রাখে। বৃটিশ আমলে ও তার পূর্বে দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী রাজ পরিবারের প্রতিষ্ঠা দিনাজপুরের রাজবংশের প্রায় ১১ জন রাজা রাজত্ব করেছেন। তন্মধ্যে শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চায় কিংবদন্তিতূল্য হয়ে আছেন দিনাজপুর রাজ পরিবারের কৃতী পুরুষ স্যার মহারাজা গিরিজানাথ রায় বাহাদুর ও জগদীশ নাথ রায় বাহাদুর। এই দুই রাজাই দিনাজপুরে শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধিত করেন। দিনাজপুরে এক সময়ের নাট্যচর্চার প্রবাদপুরুষ হিসেবে খ্যাত শ্রী শীব প্রসাদ কর। যিনি ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মাসিক দিনাজপুর পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি ছিলেন দিনাজপুরের শিশির ভাদুরী। দিনাজপুরে অনেক সংগঠন আছে যে সংগঠনগুলো দিনাজপুরের শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছে। মহারাজা গিরিজানাথ রায় বাহাদুরের আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় দিনাজপুর ডায়মন্ড জুবিলি হল। সেখানে রাজবাড়ির প্রত্যক্ষ আয়োজনে মঞ্চায়িত হতো নাটক ও পালা গান। এছাড়া ১৯০৪ সালে ক্ষেত্রীপাড়ায় প্রথম ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটার হল স্থাপিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন খ্যাতনামা মঞ্চশিল্পী হরিচরণ সেন। ১৯০৪ সালে স্থাপিত হয় দিনাজপুর ইন্সটিটিউট। এরপর ১৯১৩ সালে কালীতলায় স্থাপিত হয় আর্য লাইব্রেরি ও পাঠাগার। ওই বছরই গোলকুঠি মৌজায় স্থাপিত হয় দিনাজপুর নাট্য সমিতি। কৃষি ও শিল্প ৮০ ভাগ মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল। বাকিরা চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত। অসংখ্য প্রাচীন হাট-বাজার বিদ্যমান। রেলবাজার হাট, গুদুরী বাজার, বাহাদুর বাজারসহ অসংখ্য হাট-বাজারে জেলার মানুষ তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির কেনা-বেচা করে থাকে। ধান প্রধান ফসল। দিনাজপুর সুপ্রসিদ্ধ কাটারি ভোগ ধানের জেলা হিসেবে পরিচিত। গম, ভুট্টা, পাট, সরিষা, পিঁয়াজ, রসুন, আলু ও মসলা জাতীয় ফসল জন্মে। দিনাজপুরের বেদানা, লিচু দেশবিখ্যাত। আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলের সমারোহ চোখে পড়ার মত। শিল্প এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। জেলার পুরাতন সেতাবগঞ্জ সুগার মিল, দিনাজপুর পুলহাট এলাকার বিসিক শিল্প নগরীতে প্রতিষ্ঠিত কয়েক হাজার চালকল ও বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির প্রতিষ্ঠান দিনাজপুর জেলাকে শিল্পসমৃদ্ধ জেলা করেছে। জেলায় উন্নতমানের অটো রাইস মিল ও উন্নতমানের ইট ভাটা বিদ্যমান। অনেক হিমাগার প্রতিষ্ঠিত। যোগাযোগ ব্যবস্থা জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা পূর্বের তুলনায় ভালো। প্রতি উপজেলায় প্রায় ৭০ ভাগ পাকা রাস্তা। যার পরিমাণ ৮৯১ কিলোমিটার। কাঁচা রাস্তা ৪ হাজার ৪২০ কিলোমিটার। আধাপাকা ২৯৫ কিলোমিটার। রেলপথ ১৪২ কিলোমিটার। ব্রিজ, কালভার্ট ও বড় কয়েকটি সেতু যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করেছে। ঢাকা থেকে মহাসড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ উন্নত। স্বাস্থ্যসেবা দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শতাব্দী প্রাচীন আধুুনিক সদর হাসপাতাল, ডায়াবেটিক হাসপাতাল, জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন, ক্যান্সার হাসপাতাল, পরমাণু চিকিত্সা কেন্দ্র, কিডনি হাসপাতাল, গাওসুল আযম বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল, যক্ষ্মা নিরাময় কেন্দ্র, মিশন হাসপাতাল, হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ, মহর্ষি ভুবন মহন কোর হোমিও দাতব্য চিকিত্সালয়, আর্বান ডিসপেনসারি, ধানজুড়ি কুষ্ঠ নিরাময় কেন্দ্র এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল বিদ্যমান। জেলার ঐতিহ্যবাহী রাজবংশ দিনাজপুরের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জেলাকে সমৃদ্ধ করেছেন দিনাজপুরের কৃতী পুরুষ। তন্মধ্যে যোগেন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তী, খান সাহেব সৈয়দ তোজাম্মেল আলী, পীর শাহ সুফি মতলুব মিয়া, প্রথম গ্র্যাজুয়েট গিরিশচন্দ্র চক্রবর্তী, রাজেস্বর সিংহ, পণ্ডিত বিষ্ণু চরণ ভট্টাচার্য, মাধবচন্দ্র সিকদার, মৌলভী মো. ইউসুফ আলী ভাগবী, মওলানা আব্দুল্লাহেল বাকী, খান বাহাদুর একিন উদ্দীন আহমেদ, মাধবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কিংবদন্তি নাট্যজন শিবপ্রসাদ, ডাক্তার সুকুমার সেনগুপ্ত, খান বাহাদুর মাহাতাব উদ্দীন আহমেদ, গোলাম রব্বানী আহমেদ, বরদা চক্রবর্তী, প্রাক্তন মন্ত্রী হাসান আলী, আলহাজ্ব হেমায়েত আলী টি.কে, জয়নব রহিম, মির্জা কাদের বক্স খান বাহাদুর, মির্জা আমিনুল হক, ডা. মফিজউদ্দীন আহমেদ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, হাজী আব্দুর রৌফ, রহিম উদ্দীন আহমেদ, অধ্যক্ষ তছির উদ্দীন আহমেদ, উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারী এটি, খ্যাতনামা কণ্ঠশিল্পী সতিশ চন্দ্র সরকার, কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ, শহীদ মেজর মাহবুব, অধ্যাপক আব্দুল বাকী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মীর মোশাররফ হোসেন, মৌলানা আয়েনউদ্দীন আহমেদ, ডা. মোতাহার উদ্দীন আহমেদ, জেহেরুদ্দীন মোক্তার, স্বভাব কবি মো. নূরুল আমিন, আলহাজ্ব মো. তৈয়মুর, অধ্যাপক আব্দুল বাকী ও আরো অনেকে। নদ-নদী অনেক নদ-নদী বিদ্যমান। পুনর্ভবা ও আত্রাইসহ অন্যান্য উপ-নদী ও শহরের উপর দিয়ে বয়ে চলা ঘাগড়া নদী এখন মৃত নদীতে পরিণত হয়েছে। ঘাগড়া নদীসহ অন্যান্য নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে যদি এখনই সংস্কার করা না হয় তাহলে হয়তো এই নদীগুলো একদিন ইতিহাসে পরিণত হবে। পর্যটন বাংলাদেশে যে ক’টি জেলা পর্যটনে সমৃদ্ধ। তার মধ্যে দিনাজপুর অন্যতম। প্রতি বছর দিনাজপুরে হাজারও পর্যটকের আগমনে থাকে মুখরিত। দিনাজপুরের ঐতিহাসিক সাগরতম দীঘি রামসাগর, দিনাজপুর রাজপরিবারের ঐতিহাসিক রাজবাটী, দিনাজপুর রাজবংশের নির্মিত ঐতিহাসিক কান্তনগর মন্দির, ঐতিহাসিক চেহেলগাজী মাজার, কাহারোল উপজেলার নয়াবাদ মসজিদ, বিরলের কড়াই বিল, ঘোড়াঘাট উপজেলার ঐতিহাসিক দুর্গ ও সুরা মসজিদ, দিনাজপুর যাদুঘর, ঐতিহাসিক তে-ভাগা আন্দোলনের নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের মাজার, নবাবগঞ্জের সীতাকোট বিহারসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্যটন নিদর্শন দিনাজপুর জেলাকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করিয়েছে। খেলাধুলা দিনাজপুরের খেলাধুলা ও ক্রীড়া চর্চা অতি প্রাচীন। এই জেলায় বিশ্বের ফুটবল যাদুকর হিসেবে পরিচিত আব্দুস সামাদের জন্ম এবং এই জেলার মাঠ কাঁপানোসহ দেশে-বিদেশে ফুটবলের যাদুকর হিসেবে স্বীকৃতি লাভকারী এই সামাদ এখন পার্বতীপুরে চিরনিদ্রায় শায়িত। দিনাজপুরের এক সময়কার নরনারায়ণশীল ফুটবল টুর্নামেন্টের অন্যতম ও প্রধান আকর্ষণ থাকতেন এই যাদুকর সামাদ। দিনাজপুরের তার ধারাবাহিকতা নিয়েই এখনও ফুটবল খেলা জেলার প্রধান খেলা হিসেবে বিদ্যমান। দিনাজপুর জেলায় একটি বৃহত্ স্টেডিয়াম বর্তমানে। কান্তজীর মন্দির দিনাজপুর জেলা সদর থেকে ২০ কিঃ মিঃ উত্তরে এবং কাহারোল উপজেলা সদর থেকে ৭ কিঃ মিঃ দক্ষিণ-পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়নে দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেপা নদীর তীরে টেরাকোটা অলংকরণের বৈচিত্র্য ইন্দো-পারস্য-ভাস্কর কেশল ও শিল্প মহিমায় বিস্ময় জাগরিত কান্তজীর মন্দির অবস্থিত। কালিয়াকান্ত জিউ অর্থাত্ শ্রী-কৃষ্ণের বিগ্রহ অদিষ্ঠানের জন্য এ মন্দির নির্মিত, এ জন্য এর নাম কান্তজীর মন্দির। কান্তজীর মন্দির যে স্থানে স্থাপিত তার নাম কান্ত নগর। কান্ত নগর সম্পর্কে পৌরাণিক বহু গল্প ও উপাখ্যান প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে মহাভারতে বর্ণিত বিরাট রাজার গো-শালা ছিল এখানে। প্রকৃত পক্ষে মন্দিরটি যেখানে তৈরি হয়েছে সেটি একটি প্রাচীন স্থান এবং প্রাচীন দেয়াল ঘেরা দুর্গ নগরীরই একটি অংশ। মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তি বেদীর শিলা-লিপি থেকে জানা যায়, দিনাজপুরের জমিদার মহারাজা প্রাণনাথ রায় (মৃত্যু ১৭২২ খৃঃ) তার শেষ জীবনে মন্দির তৈরির কাজ শুরু করেন এবং তার মৃত্যুর পর তার আদেশ অনুসারে দত্তক পুত্র মহারাজা রামনাথ রায় এই মন্দির তৈরির কাজ শেষ করেন ১৭৫২ খৃস্টাব্দে। ইট দ্বারা তৈরি এ মন্দিরের গায়ে পোড়া মাটির চিত্র ফলকের সাহায্যে রামায়ণ-মহাভারতের প্রায় সব ক’টি প্রধান কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। সেই সঙ্গে শ্রী কৃষ্ণের বিভিন্ন কাহিনী এ সম্রাট আকবরের কিছু চিত্রকর্ম রয়েছে। অতি সুন্দর ও কারুকার্যময় এই কান্তজীর মন্দির। পোড়া মাটির চিত্র ফলকের এমন সুন্দর ও ব্যাপক কাজ বাংলার আর কোন মন্দিরেরই নেই। সারা উপ-মহাদেশেও আছে কিনা সন্দেহ। ঐতিহাসিক বুকানন হ্যামিলটনের মতে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দরতম মন্দির। কান্তজী বা শ্রী কৃষ্ণের বিগ্রহ নয় মাস এ মন্দিরে অবস্থান করে এবং রাস পূর্ণিমায় (এক পক্ষকালের জন্য) তীর্থ মেলা বসে। দেশ-বিদেশ থেকে বহু পুণ্যার্থী আগমন করেন এ মেলায়। এছাড়া বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন চিত্র ফলকের অলংকরণে সু-সজ্জিত মন্দিরটি দেখার জন্য বহু দর্শনার্থী ও পর্যটক আগমন করেন এ দিনাজপুরের মাটিতে। রামসাগর রামসাগর শুধু দ্রষ্টব্য ঐতিহাসিক কীর্তিই নয়-এ প্রাকৃতিক শোভা ও সৌন্দর্যের লীলাভূমিও। দীঘির পাড়ের উচ্চ টিলার উপর অবস্থিত সুন্দর মনোরম ডাকবাংলোটি দেশি ও বিদেশি অসংখ্য কৌতূহলী পর্যটকের নিকট যেমন প্রতিনিয়ত স্বপ্নিল আকর্ষণ, তেমনি অনেক রসিক ব্যক্তির নিকেতনও বটে! এই দীঘির মুগ্ধ ও স্নিগ্ধ পরিবেশে শান্তি ও ক্লান্তি বিনোদনের জন্য সারা বছরে অগণিত ক্লান্ত মানুষ ছুটে আসেন। দিনাজপুরে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান রামসাগর। দীঘির চারপাশ ঘিরে রয়েছে লাল মাটির ছোট ছোট টিলা। এর পরেই সবুজ প্রান্তর। দিনাজপুর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে লালন গৈরিক ও স্ফীতিময় খিয়ার মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছে দিনাজপুরের মহারাজাদের অমর কীর্তি রামসাগর। চারদিকে সু-উচ্চ মাটির ঢিপি, মাঝখানে দৃষ্টিনন্দন দীঘির বিশাল জলরাশি। বিস্তৃত আয়তন এবং নীল জলরাশির জন্য এ দীঘির নামে সাগর শব্দটি জুড়ে দিয়ে নামকরণ করা হয় রামসাগর। পাড়ভূমিসহ এ দীঘির মোট আয়তন ৪,৩৭,৪৯২ বর্গমিটার। দীঘিটির জলভাগ দৈর্ঘ্যের ১ হাজার ৩১ মিটার এবং প্রস্থে ৩৬৪ মিটার। মাঝখানে দীঘির গভীরতা ৯ মিটার। সর্বোচ্চ গড়ের উচ্চতা ১৩ দশমিক ৫০ মিটার। প্রজাদের জন্য দিনাজপুরের রাজা রামনাথ রায় এ দীঘি খনন করান। তার শাসনামলের শেষভাগে ১৭৫৯ সালে এর প্রতিষ্ঠা কাজ সম্পন্ন হয়। সীতা কোট দিনাজপুর জেলা সদর থেকে ৬০ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে এবং বিরামপুর থেকে প্রায় ৪ কিঃ মিঃ উত্তর-পূর্ব দিকে নবাবগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের ফতেহ মাড়াসপুর গ্রামে সমগ্র দিনাজপুর জেলায় প্রাথমিক খনন কার্যের পর আবিষ্কৃত একটি মাত্র প্রত্নকীর্তি হচ্ছে সীতা কোট বিহার। ঘোড়াঘাট দুর্গ ঘোড়াঘাট উপজেলা সদর অর্থাত্ ওসমানপুর থেকে ৪ কিঃ মিঃ দক্ষিণে সাহেবগঞ্জ মৌজায় করতোয়া নদী। নদীর তীর ঘেঁষে জরাজীর্ণভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সময়ে রণহংকারে গর্জে উঠা বিশালতায় ও দৃঢ়তায় মধ্যযুগীয় বাংলার বৃহত্তম ও শ্রেষ্ঠ ঘোড়াঘাট দুর্গ। ঘোড়াঘাট দুর্গ কবে তৈরি হয়েছিল তা সঠিকভাবে বলার উপায় নেই। তবে এটি যে প্রাক-মুসলমান আমলের তাতে সন্দেহ নেই। খুব সম্ভব হিন্দু সেন আমলে এগার শতাব্দি এ দুর্গ তৈরি হয়েছিল। গৌড়ায় সুলতান রুকুনউদ্দিন বরবক শাহেব সেনাপতি শাহ্ ইসমাইল কর্তৃক কামাতাপুরের রাজার অধিকার থেকে ঘোড়াঘাট বিজিত হলে বাংলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক ও সামরিক গুরুত্ব বহু গুণে বেড়ে যায়। সুরা মসজিদ ঘোড়াঘাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং হিলি রেল স্টেশন থেকে প্রায় ১৯ কিঃ মিঃ পূর্বদিকে চৌরগাছা গ্রামে ঘোড়াঘাট-হিলি রাস্তার পাশে ঐতিহাসিক দর্শনার্থীদের আকর্ষণ দিনাজপুরের প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম সুরা মসজিদ অবস্থিত। আবার কেউ কেউ একে বলে সুজা মসজিদ। মসজিদের প্রধান কামরার বাইরের চার কোণে ৪টি এবং বারান্দার বাইরে দুই কোণে ২টি মোট ৬টি মিনার বা স্তম্ভ ছিল। এগুলো পাথরের তৈরি এবং পাথর কেটে মাপমত এগুলো তৈরি করা হয়েছিল। ধারণা করা হয় যে এটি হোসেন শাহের আমলের (১৪৯৬-১৫১৯)। চেহেলগাজী মাজার জেলা সদর থেকে ৫ কি. মি. উত্তরে সদর উপজেলা পরিষদের খুব কাছাকাছি চেহেলগাজী ইউনিয়নে-দিনাজপুর- তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিম পার্শ্বে প্রায় ১৬ মিটার (৫৪ ফুট) দীর্ঘ চেহেলগাজী মাজার অবস্থিত। চেহেলগাজী মাজার বলতে অনেকেই এটিকে কোন বিশিষ্ট পীরের মাজার হিসেবে ধরে থাকেন। প্রকৃত প্রস্তাবে চেহেলগাজী মাজার নিয়ে অনেক বিতর্ক বিভ্রান্তি রয়ে গেছে এবং নানা কাহিনী গড়ে উঠেছে। চেহেল পার্সী শব্দ, অর্থ চল্লিশ। কেহ মনে করেন চল্লিশগজ লম্বা পীরের মাজার সেহেতু নাম হয়েছে চেহেলগাজী। তাদের মতে কথাটি চেহেলগাজী না হয়ে হবে চেহেলগজী। আবার কেহ মনে করেন ধর্ম যুদ্ধে নিহত চল্লিশ জন শহীদকে একই কবরে সমাহিত করা হয়েছে বলে তার নাম হয়েছে চেহেলগাজী। এ ব্যাপারেও অনেকে দ্বিমত পোষণ করে থাকেন। তাদের মতে ধর্ম যুদ্ধে জয়ীদের বলা হয় গাজী এবং নিহতদের বলা হয় শহীদ। কাজেই শহীদদের কবর হলে হতো চেহেল শহীদের মাজার। রাজবাড়ী দিনাজপুর শহর থেকে ৪ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে নিরিবিলি মনোরম এক গ্রাম্য পরিবেশে হিন্দু মুসলিম ও ইংরেজ এই তিন যুগের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের বিচিত্র সমাবেশ সম্বলিত বহু শতাব্দীর ভাঙ্গা-গড়ার চিহ্ন ধারণ করে দিনাজপুর রাজ বংশের ঐতিহ্যের নিদর্শন ঐতিহাসিক রাজবাড়ী অবস্থিত। দিনাজপুরের রাজবাড়ী কোন একক রাজার তৈরি কীর্তি নয়। দিনাজপুর রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাকাল হতে শুরু করে মহারাজা জগদীশ নাথ রায় পর্যন্ত প্রায় ৪শ’ বছর ধরে ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠেছিল এই বৃহত্ রাজবাড়ীটি। সাবেক পরিখা ও প্রকার বেষ্টিত এবং বহু দালান-কোঠা সম্বলিত মূল রাজবাড়ীর আয়তন ছিল প্রায় ১৬ একর। আদিবাসী দিনাজপুর জেলায় প্রায় ১২টি আদিবাসী সমপ্রদায় আছে। যেমন সাঁওতাল, ওরাঁও, মাহুলে, কোলহে, কামার, মুন্ডা, মাল, মাল পাহাড়ী, কোড়া, ভুঞ্জার, মুসোহর, ভুইঞা ও মালো। তবে সাঁওতালরা এ জেলার সংখ্যা গরিষ্ঠ আদিবাসী। লিচু অমৃত লিচুর দেশ হিসেবে দিনাজপুর নিঃসন্দেহে ঐতিহ্যময়। দিনাজপুরের বিস্তৃত অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন উপাদানে গঠিত মাটি এখনো সজীব। সবুজের সম্ভাবনায় সমন্বয় সবুজাভ বনায়নে উর্বর উম্মুখ। যদিও বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতে মরুভূমিতে রূপান্তরিতব্য ভূমি হিসেবে দিনাজপুরকেও নির্ণয় করেছেন। তথাপি এখনো দিনাজপুরের মাটি সাধারণভাবেই অন্যান্য ফসল ও বৃক্ষাদির পাশাপাশি লিচু চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।