গেল শনিবার আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় চাপে রয়েছে বাংলাদেশ থেকে পোশাক নেয়া আন্তর্জাতিক ক্রেতারা। এই ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তাদের। সেই সাথে অগ্নি নিরাপত্তাসহ শ্রমিকদের সার্বিক নিরাপত্তায় নিজেদের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে এই খাতে তাদের সহায়তা আরো বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার তৈরি পোশাক উত্পাদক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ কার্যালয়ে এক বৈঠকে তারা এ কথা বলেন। বিজিএমইএ সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনের সভাপতিত্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিনিধিরা বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বিচারে কমপ্লায়েন্স (কর্ম পরিবেশ) মেনে চললেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেকে তা মানছেন না। তারা বলেন, দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু তাতে প্রাণহানি ঘটার বিষয়টি মানা যায় না। বিজিএমইএ’র নিরাপত্তা সেল এর কার্যকারিতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রেখে তারা বলেন, বিজিএমইএতে এই সেলে মাত্র তিনজন প্রশিক্ষক রয়েছেন। গত ১৬ বছরে মাত্র হাজারখানেক কারখানায় কার্যক্রম চালানো হয়েছে। এটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এটিকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।
কারখানা তৈরিতে বিল্ডিং কোড, অগ্নি নিরাপত্তা লাইসেন্সসহ সার্বিক নিরাপত্তায় সরকার ও বিজিএমইএ’র মধ্যে কার ভূমিকা কী তা জানতে চান তারা। অগ্নি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, শক্তিশালী নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশলী, আইনজীবী, রাজউক, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে এই টাস্কফোর্স গঠন করার প্রস্তাব দিয়ে তারা বলেন, কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন করার জন্য এটিই উপযুক্ত সময়। এই টাস্কফোর্স অতি দ্রুততার সাথে গঠন করে তার সুপারিশের বাস্তবায়ন করতে হবে । শ্রমিক ও মধ্যম সারির ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, সকল কারখানায় বাইরে সিঁড়ি থাকা, ভেতরে প্রয়োজনীয় সিঁড়িসহ কমপ্লায়েন্সের সব শর্ত মানতে বাধ্য করবে বিজিএমইএ । এসব ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে দ্রুততায় কাজ করার পরামর্শ দেন তারা।
আগামী সপ্তাহেই এই টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেন সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। ক্রেতা প্রতিনিধিদের পরামর্শে টাস্কফোর্স গঠন করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, টাস্কফোর্স গঠন ও এর সুপারিশ বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকবে না। কারণ এই ঘটনা আমাদের বড় ঝাঁকুনি দিয়েছে। আমরা আমাদের দায়িত্ব অস্বীকার করছি না। আপনারা দেখুন আমরা কী করছি। কোন প্রতিষ্ঠান কমপ্লায়েন্সের শর্ত না মানলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে তাদের কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে।
তাজরীনের কমপ্লায়েন্সের দুর্বলতা স্বীকার করে তিনি বলেন, কারখানায় নিচ তলায় ওয়্যার হাউজের (গুদাম) জন্য নয়। সেখানে থাকা সুতার আগুন থেকেই কার্বন মনোঅক্সাইড ও সালফারের কারণে সৃষ্ট ধোঁয়া সমস্যা সৃষ্টি করেছিল। মধ্যম সারির ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিকদের বের হতে দেয়া হয়নি। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি। তবে এই ঘটনায় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সাথে আমেরিকার খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের চুক্তি বাতিলে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্ত চলাকালীন এমন রূঢ় সিদ্ধান্ত নেয়া হলে বিপদে পড়বে প্রতিষ্ঠান। এতে বেকার হাবে হাজার হাজার শ্রমিক। তিনি ওয়ালমার্টকে এই বিষয় গভীরভাবে বিবেচনার আহ্বান জানান।
বিজিএমইএ’র পরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, অগ্নি নিরাপত্তা সেল আরো জোরদার করা হবে বলে জানান। তিনি বলেন, পোশাক শিল্প এলাকাগুলোকে জোনভিত্তিক ভাগ করে সেখান থেকে মধ্যম সারির ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা প্রহরী ও শ্রমিকদের এনে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। মালিকদেরও এতে যুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
বিজিএমইএ সহ-সভাপতি ফারুক হাসান জার্মান অ্যাম্বাসেডরের সামপ্রতিক একটি মন্তব্য উল্লেখ করে বলেন, আন্তর্জাতিক পোশাক ক্রেতাদের মাত্রাতিরিক্ত কম দামে পোশাক কেনার মানসিকতা পরিহারের আহ্বান জানান।
