১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হলেও ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকেই আমরা যুদ্ধ শুরু করেছিলাম। সেই রাত থেকে আমাদের প্রতিটি ক্ষণ কেটেছে লড়াই করে। তারপর আমরা ধীরে ধীরে এগিয়েছি বিজয় অর্জনের দিকে। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনে আর কখনো আসবে না।
চট্টগ্রাম শহরের কয়েক মাইল দূরে যুদ্ধরত আমরা কেউই ঢাকায় কী ঘটছে—তখন পর্যন্ত সবকিছু জেনে উঠতে পারিনি। রেডিওতে সংবাদ শুনে শুধু এতটুকু বুঝতে পারছিলাম—পাকিস্তানীরা আরও কিছু সময় চেয়েছে এবং সে সময়সীমা উত্তীর্ণ হলে ঢাকাকে মুক্ত করার জন্য তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়ে যাবে। আর এদিকে মার্কিন সপ্তম নৌ-বহর বঙ্গোপসাগরে উপস্থিত হওয়ার ফলে আমাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল চট্টগ্রামকে মুক্ত করে ফেলতে। ভাটিয়ারিতে আমরা তখন তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত। এমনকি ১৫ ডিসেম্বর ভাটিয়ারির কাছের একটি গ্রাম মুক্ত হলে সেই গ্রামেরই ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধাকে আমি ১২ ঘন্টার ছুটি দিয়েছিলাম গ্রামে গিয়ে তার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করার জন্য। ঐ কিশোর আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গর্বের সাথে বলল, না স্যার—চট্টগ্রাম শহর মুক্ত হওয়ার পরই আমি বাবা-মার সাথে দেখা করতে বাড়ি যাব, তার আগে নয়। আর ওটাতো খুব তাড়াতাড়ি হবে, তাই না, স্যার? এমনভাবেই চট্টগ্রাম শহর মুক্ত করার চিন্তা আমাদের ভীষণভাবে সবাইকে পেয়ে বসেছিল। ১৬ তারিখ বিকাল আমার একজন বিশ্বস্ত জে সি ও সুবেদার আজিজের নেতৃত্বে আমাদের একটি কোম্পানি ভাটিয়ারিতে পাকিস্তানিদের ওপর আক্রমণ চালাতে ডান দিক দিয়ে (সমুদ্র উপকূল এলাকা) এগিকে চলেছে। বাম দিকের পাহাড় দিয়ে অবরোধের জন্য পাঠানো বড় দলটি লক্ষ্যস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ভাটিয়ারিতে আমাদের এই অবস্থান থেকে চট্টগ্রাম শহর ছয় মাইল দূরে। নিয়াজি সকাল থেকেই তার সৈন্যদের যুদ্ধ-বিরতি এবং আত্মসমর্পণের যে নির্দেশ পাঠিয়ে চলেছেন, চট্টগ্রামে পাকিস্তানি সৈন্যরা সে নির্দেশ কখন পেয়েছে তা আমরা জানি না। ঢাকার রেসকোর্স মাঠে আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান হচ্ছে—তাও জানিনা আমরা।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট। ঢাকাসহ বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায়ই যুদ্ধ থেমে গেছে। সুবেদার আজিজ তার কোম্পানিটি নিয়ে খুব সতর্কতার
সাথে ছোট্ট একটা খাল অতিক্রম করছে। ৪টা ৩১ মিনিট। হয়তো ঠিক ঐ মূহূর্তেই নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করছেন ঢাকার রেসকোর্স মাঠে। তখনই ১৫০ মাইল দূরে ভাটিয়ারিতে সুবেদার আজিজের কোম্পানির মাঝখানে এসে পড়ল পাকিস্তানিদের নিক্ষিপ্ত কামানের গোলা। মারাত্মকভাবে আহত হলেন সুবেদার আজিজ এবং ১৫ বছরের সেই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। গোলাগুলি তখনও চলছে। কিছুক্ষণ পরে ভাটিয়ারির ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্রিজটির দক্ষিণ দিক থেকে একজন পাকিস্তানি মেজর একটি সাদা পতাকা উড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসেন খালের পাড় পর্যন্ত। আমিও এদিক থেকে খালের পাড় পর্যন্ত চলে এলাম। মাঝখানে ভাটিয়ারির সেই বিধ্বস্ত ব্রিজ ও খাল। পাকিস্তানের ঐ মেজর আমাকে জানালো, তারা নিয়াজির কাছ থেকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ পেয়েছেন এবং এখন আত্মসমর্পণ করতে চায়। এমন সময়ই আমার কাছে খবর এলো—সুবেদার আজিজ এবং ঐ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন ঢলে পড়েছে অনেক দূর।
আজকের দিনের সূর্যাস্তও আমাকে মনে করিয়ে দেয় এ যুদ্ধের প্রথম সূর্যাস্তকে—যা আমি চট্টগ্রাম শহরের মাঝখানে রেলওয়ে হিল থেকে ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় দেখেছিলাম। এই দুই সূর্যাস্তের মাঝে কী নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের শিকার হল বাংলার লক্ষ লক্ষ নিরাপরাধ নারী, পুরুষ, নিষ্পাপ শিশু! কত অসংখ্য মানুষ পঙ্গু হয়ে গেল। অগণিত মানুষ হল আশ্রয়হীন। শত-সহস্র পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল আপনজন থেকে। বহু মানুষের জীবনের কত সব স্বপ্ন-সাধ মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেল—সে কথা কেউ কোনোদিন জানবে না। আজকের এই সূর্যাস্তের পরে বহু সম্ভাবনার স্বপ্ন নিয়ে নতুন ভবিষ্যত্ হাতছানি দিয়ে আমাদের সবাইকে ডাকছে । অনাগত সেই ভবিষ্যতে বহু মানুষের অনেক স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন হবে। সেদিনের সন্ধ্যার সেই মুহূর্তে আনন্দ-বেদনা মেশানো এক বিচিত্র অনুভূতি আমার সমস্ত দেহমন আচ্ছন্ন করে ফেলে। শ্রান্ত দেহে, ক্লান্ত পদক্ষেপে ফিরে চলি নিজ অবস্থানে- আগামীকালের প্রভাতের নতুন সূর্যের প্রত্যাশায়।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও নবম জাতীয় সংসদের সদস্য
সংশোধনী: গতকাল এ কে খন্দকার, বীর উত্তমের ‘যেভাবে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করলো’ লেখায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক জগজিত্ সিং অরোরার পদবী ভুলবশতঃ ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান হিসাবে ছাপা হয়েছে।
