প্র জ ন্ম মু খ

‘এই মেয়ে, শোনো’

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩২
রাজধানীর ধানমন্ডি দৃক গ্যালারিতে গত ২০ নভেম্বর থেকে ২৬ নভেম্বর জমে উঠেছিল সুভাষ দত্তকে ঘিরে আলোকচিত্র প্রদর্শনী। যদিও এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবার কথা ছিল সুভাষ দত্তের। তাকে ঘিরেই ছিল সবকিছু। বাধ সাধল নিয়তি। আনন্দ করার ক্ষণটি স্মরণের আবরণে ঢাকা পড়ে গেল। ‘সুতরাং’ শীর্ষক সুভাষ দত্তের জীবন নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী। ‘সুতরাং’ ছিল সুভাষ দত্ত পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র। প্রদর্শনীটি আয়োজন করেন এই প্রজন্মের মেধাবী একজন সালমা আহমেদ। সুভাষ দত্তের জীবন নিয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে সালমা আহমেদ সুভাষ দত্তের অনেক ছবি তুলেছেন। সে কারণে তার আলোকচিত্রে খুব নিবিড়ভাবে উঠে এসেছেন সুভাষ দত্ত। মেধাবী এই আলোকচিত্রী সালমা আহমেদকে নিয়েই আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু সময়টা ছিল ২০০৭-এর কোনো এক মঙ্গলবার, আর এই মঙ্গলবারেই ঘটে একটি মঙ্গলময় প্রথম সাক্ষাত। ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা)-এ কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্ট্যাডিজ ডিপার্টমেন্টের ক্লাস চলছিল। কিন্তু ক্লাসের নির্দিষ্ট সময় শেষে অতিরিক্ত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে তা কর্তব্যরত শিক্ষিকার ধ্যানে নেই। যা হোক ক্লাস শেষে যখন শিক্ষিকা বের হচ্ছিলেন তখন দেখলেন ক্লাসের বারান্দার এপাশ-ওপাশে পায়চারী করছেন কিংবদন্তি সুভাস দত্ত, কেননা ক্লাসটি শেষ হওয়ার অপেক্ষায় তিনি, একটু পরেই তিনি ক্লাসে ঢুকবেন। বিরক্তিকর অপেক্ষার মাঝেও তার মুখে একটি স্মিত মিষ্টি হাসির রেখা তখন বর্তমান। শিক্ষিকাও মিষ্টি হেসেই তার দিকে এগিয়ে গেলেন। সুভাষ দত্ত বললেন, ‘মেয়ে তুমি পনের মিনিট তো খেয়ে দিলে, তোমার নাম কী?’ শিক্ষিকা বললেন, ‘আমার নাম সালমা।’ সুভাষ দত্ত বললেন ‘ হয়নি, ভুল’। প্রথম পরিচয়ে এমন অবস্থায় পড়ে শিক্ষিকা তখন একটু অবাক হয়েই বললেন, ‘দাদু আমি বুঝিনি।’ দত্ত বললেন, ‘তোমার নামে ভুল না উচ্চরণে ভুল, তুমি দেখতে তো অনেক কোমল প্রকৃতির মেয়ে তাহলে তুমি ‘আমার’টা এত শক্ত করে বলছ কেন একটু নরম করে বল ‘আমার’।’ শেষপর্যন্ত ক্লাসে দরজায় দাঁড়ানো অবস্থায়ই দশবার ‘আমার’ উচ্চারণ শেষে শিক্ষিকার কণ্ঠে উঠে এল নিজস্বতায়ভরা একেবারের আপন শব্দ ‘আমার’। এবার দত্ত বললেন, ‘উচ্চারণটি শিখিয়ে দিলাম, ভবিষ্যতে ভুল করবে না আর’, বলেই ক্লাসে ঢুকে যাচ্ছিলেন শিক্ষিকাও বের হয়ে চলে যাচ্ছিলেন তখনই আবার ডাকলেন, ‘এই মেয়ে, শোনো।’ শিক্ষিকা তার খোলা চুল দুলিয়ে পেছনের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, ‘একটু হাসোতো।’ শিক্ষিকা আবারও একটু হকচকিয়ে গেল কেননা হাসো বললেই তো আর হাসি আসে না! তারপর সত্যি সত্যিই হেসে উঠলেন শিক্ষিকা, তারপর দত্ত বললেন, ‘তুমি কী জানো চৌষট্টি সালে আমি কবরীকে আবিষ্কার করে একটি মিষ্টি হাসি বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিলাম। তোমার মাঝে সেই কোয়ালিটি আছে, তুমি আমার দ্বিতীয় আবিষ্কার হতে পারো।’ মূলত সেই থেকে শুরু, উপরের ঘটনার শিক্ষিকার চরিত্রে ছিলেন, সালমা আহমেদ। মঙ্গলবারের সেই মঙ্গলময় বার্তা ‘দ্বিতীয় আবিষ্কার’-ই পালটে দেয় তার ধ্যান, তার স্বপ্ন। মনের মাঝে ভীত গড়েন, ‘আমি তার নায়িকা হতে না পারি কিন্তু তাকে নিয়েই কিছু করব।’ তারপরই সালমা আহমেদ সুভাষ দত্তের বর্ণময় জীবন গবেষণার নেশায় শুরু করেন ফটোগ্রাফি এবং তথ্য সংগ্রহ। এর আগে ২০০৫-এ বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত এবং সাহিত্যিক বেগম পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম-এর বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা শেষ করেন সালমা আহমেদ। তবে এর আগে থেকেই তিনি উপস্থাপনার মাধ্যমে স্যাটেলাইট চ্যানেল বাংলাভিশনের সাথে একেবারে শুরুর দিক থেকেই সম্পৃক্ত ছিলেন। এর পাশাপাশি শিক্ষকতা করেন ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা)-এ। এ ছাড়া এনসিসি ব্যাংকে পার্ট-টাইম হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাবা-মা আর একমাত্র মেয়ে রূপকথাকে নিয়েই তার পারিবারিক আবহ হলেও সুভাষ দত্তের পরিবারেও তিনি সাবলীল একজন সদস্য হিসেবেই বিচরণ করেছেন। সুভাষ দত্ত বরাবরই ‘এই মেয়ে শোনো’ বলেই তাকে সম্বোধন করতেন। সুভাষ দত্ত তাকে ঘিরেই বেগম রোকেয়ার জীবনী নিয়ে তার পরবর্তী সৃষ্টিকর্মে রোকেয়া চরিত্রটি ভেবেছিলেন এবং এর মাঝেই তিনি করতে চেয়েছিলেন তার দ্বিতীয় আবিষ্কার। সালমা আহমেদ প্রতিদিনের সুভাষ দত্ত যেমন ছিলেন তেমনই ধরে রেখেছেন তার ক্যামেরার স্মৃতি জগতে। মূলত চরম শ্রদ্ধাবোধ এবং ভালো লাগা থেকেই তার মাঝে এই সুভাষ দত্তকে জানার নেশা চাপে। প্রায় তিন বছরে নিজের হাতে তোলা হাজার হাজার দুর্লভ মুহূর্তের ছবি থেকে দুইশত ছবি নিয়ে তিনি গত ২০ নভেম্বর শুরু করেন ধানমন্ডির ‘দৃক’ গ্যালারিতে তার একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিক, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের ব্যব্যস্থাপনা পরিচালক পীযূষ বন্দোপাধ্যায়। আরও উপস্থিত ছিলেন সালমা আহমেদের বাবা ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্সের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক তাহের ও সুভাষ দত্তের পরিবারের সদস্যবৃন্দ। সুভাষ দত্তের জীবন নিয়ে ‘সুতরাং’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ২৬ নভেম্বর শেষ হয়। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে এই প্রদর্শনী। মূলত এই প্রদর্শনীটি উদ্বোধনে সুভাষ দত্ত স্বয়ং উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু গত ১৬ নভেম্বর সুভাষ দত্ত নিজেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে সুভাষ দত্তের ছবি সম্বলিত একটি বইও প্রকাশ করা হয়। সুভাষ দত্তের কর্ম জীবন নিয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে একটি সম্পূর্ণ সংকলন প্রকাশ করার আশা প্রকাশ করেন ‘সুতরাং’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজক সালমা আহমেদ। এ ছাড়াও এ প্রদর্শনীতে সুভাষ দত্তের চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, দুর্লভ অ্যালবাম, প্রত্যেকটি চলচ্চিত্রের সিডি, চলচ্চিত্রের অডিও গানের সিডি প্রদর্শনীতে পাওয়া গেছে। প্রদর্শনীতে সুভাষ দত্তের একক প্রায় নব্বইটি ছবিসহ ১২১টি ফ্রেমে প্রায় দু’শ ছবি স্থান পেয়েছে। একজন সুভাষ দত্ত সবসময়ই নতুন কিছুকে গ্রহণ করতেন সানন্দে। বয়সে তিনি প্রবীণ হলেও মনেপ্রাণে তিনি ছিলেন তরুণ। তাই এই আধুনিক যুগে এসেও তিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তার সৃষ্টিকর্মকে সবার মাঝে তুলে ধরেছেন। আধুনিক মননশীল এই মানুষটিকে নিয়ে সালমা আহমেদের এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী সত্যিই এক অন্যরকম ভালোলাগার জন্ম দিয়েছে সবার মাঝে।