বেশ কয়েকমাস আগে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক সুনিতা উইলিয়ামস, রাশিয়ার ইউরি ম্যালেনচেঙ্কো ও জাপানের আকি হোশিদে চার মাসের একটি মিশনে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন। টানা চার মাস কক্ষপথে থাকার পর নাসার তিন নভোচারী পৃথিবীর মাটিতে পা রেখেছেন। মার্কিন নাগরিক সুনিতাকে নিয়ে লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম
দীর্ঘ প্রস্তুতির পর দিন-রাতের দূরত্ব পেরিয়ে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যাত্রা শুরু করবে সয়ুজ টিএমএ-০৫এম নামের মহাকাশযান। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন এ নভোচারী, সুনিতা যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে টুইটারে লেখেন, ‘পৃথিবী গ্রহকে আপাতত বিদায়!’ সয়ুজ টিএমএ-০৫এম নামের রকেটটি স্বছন্দে যাত্রা শুরু করেছে বলে জানায় নাসা কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ার রসকভ মহাকাশ গবেষণা প্রকল্পের প্রধান ভ্লাদিমির পপোভকিন বলেন, তিনি যাত্রা শুরুর পর নভোচারীদের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলেছেন। মহাকাশ অভিযানের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলেও সুনিতা ও আকিহিতো এই প্রথম রাশিয়ার সয়ুজের আরোহী হলেন। এ তিন নভোচারী ৪ মাস ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে (আইএসএস) গবেষণার জন্য অবস্থান করবেন বলে ঠিক করা হয়েছিল। অসীম সাহসকে সঙ্গী করে দ্বিতীয় বারের মতো মহকাশের পথে রওয়ানা হয়েছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নভোচারী সুনিতা।
এই মহাকাশ অভিযানে নাসার নভোচারী সুনিতার সঙ্গে ছিলেন রাশিয়ার মহাকাশচারী ইউরি ম্যালেনচেঙ্কো ও জাপানের আকিহিতো হোসিদে। তাদের পরিবার ও কলিগরা মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখাস্তানে রাশিয়ার একটি লিজ নেওয়া পর্যবেক্ষণ প্লাটফর্ম থেকে ভ্রমণের উদ্বোধন প্রত্যক্ষ করেন। বিভিন্ন উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার মধ্য দিয়ে যখন দেখছিলেন স্বজনেরা তখন টেলিকাস্ট করা ফুটেজে নব আবিষ্কারের পথে খোশ মেজাজে দেখা গেছে সুনিতা ও তার কলিগদেরকে। স্থানীয় সময় ভোর ৮টা ৪০ মিনিটে যাত্রা শুরু করে মহাকাশ যানটি। মহাকাশে পৌঁছে তারা দ্রুত যান চলাচলের বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার কাজ শুরু করেন। তাদের আরও দুই কলিগের স্থায়ী মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছার দু’দিন আগেই মহাকাশের উদ্দেশে রওয়ানা করলেন এই তিন নভোচারী। দু’দিনের এই মহাকাশ অভিযানে নভোযানটির প্রয়োজনীয় রসদ এতে প্রতিস্থাপন করা সোলার নিজ থেকেই সংগ্রহ করে।
বলা যায় মহাকাশে যাত্রা সুনিতার দ্বিতীয় সাফল্য। কারণ প্রথমটি হলো মহাকাশ স্টেশনের দায়িত্ব পাওয়া। সেটা সুনিতা উইলিয়ামসের মুকুটে নতুন পালকের সংযোজন। এরসঙ্গেই জায়গা করে নিলেন ইতিহাসের পাতায়। বিশ্বের ইতিহাসে দ্বিতীয় মহিলা হিসেবে এরকম একটি দায়িত্বে নিযুক্ত হলেন তিনি। অভিজ্ঞ রুশ মহাকাশচারী ইয়ুরি মালেনচেঙ্কো এবং জাপানের আকিহিকো হোশিডে উইলিয়ামসের নেতৃত্বে এক্সপিদিশন-৩২-এর দায়িত্বে থাকবেন অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। রাশিয়ার মহাকাশযান সোয়ায রবিবার এই স্পেস স্টেশন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কমান্ডর জেনাডি পাদালকার কাছ থেকে স্পেস স্টেশনের দায়িত্ব হাতে নেন নাসার সুনিতা উইলিয়ামস।
ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেওয়া এই মানবী হচ্ছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন নৌ-আধিকারিক এবং নাসার একজন মহাকাশচারী। তাকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে, (অভিযান) এক্সপিডিশন ১৪-এ একজন সদস্য হিসেবে কার্যভার প্রদান করা হয়েছিল এবং তারপর তিনি এক্সপিডিশন ১৫-এ যোগদান করেন। তিনি মহিলা মহাকাশচারীদের মধ্য সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ (১৯৫ দিন) মহাকাশ-উড়ানের রেকর্ডধারী। সুনিতা ম্যাসেচ্যুসেটে্স-এর নিডহ্যামের নিডহ্যাম হাই স্কুল থেকে পড়াশোনা করে ১৯৮৩ সালে স্নাতক হন। তিনি ১৯৮৭ সালে ইউ এস নেভাল অ্যাকাডেমি থেকে পদার্থবিদ্যায় বিজ্ঞানের স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৯৫ সালে ফ্লোরিডা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্টে বিজ্ঞানের মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
সম্প্রতি এই নারী মহাকাশচারী আবারও খবরের শিরোনাম হয়েছেন মহাকাশ যাত্রার মাধ্যমে। নারী হিসেবে মহাকাশে সবচেয়ে বেশি সময় হাঁটার রেকর্ড করে পৃথিবীর মাটিতে ফিরলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নভোচারী সুনিতা। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে চার মাস কাটানোর পর ১৯ নভেম্বর সুনিতাসহ তিন নভোচারীকে নিয়ে রুশ ক্যাপসুল সয়ুজ কাজাখস্তানে অবতরণ করে। এ অভিযানে সুনিতার সহযোগী ছিলেন জাপানের আকিহিকো হোশিদা এবং রাশিয়ার ইউরি মালেনচেঙ্কো। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে পৃথিবীতে ফিরতে তাদের সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লেগেছে। সুনিতার নেতৃত্বাধীন এ অভিযানের নাম ছিল এক্সপেডিশন ৩৩। মোট ১২৫ দিন মহাকাশে কাটিয়ে এলেন। একই সঙ্গে বেশ কিছু রেকর্ডও স্পর্শ করলেন। মহাকাশে কোনো নারী নভোচারীর সবচেয়ে বেশি সময় হাঁটার রেকর্ড এখন তার। তিনি মোট ৫০ ঘণ্টা ৪০ মিনিট হেঁটেছেন। দুই দফায় সবচেয়ে বেশি সময় (৩২২ দিন) মহাকাশে থেকেছেনও তিনি। এই অভিযান বিষয়ে নাসা এক বিবৃতিতে জানায়, মহাকাশ স্টেশনে বেশ কিছু গবেষণা কাজ করেছেন তারা। এর মধ্যে মহাকাশ স্টেশনের তেজস্ক্রিয়তার স্তর পরীক্ষা এবং পৃথিবীর পরিবেশের ওপর হিমবাহ গলে যাওয়া ও ঋতু পরিবর্তন প্রভাব পরীক্ষাও ছিল।
