মিসরে জনরোষে ‘ আরব বসন্ত’ যায় যায়

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩৭
একনজরে মুহাম্মদ মুরসি জন্ম : ১৯৫১ সালে, উত্তর মিসরের শারকিয়ায়। লেখাপড়া : গ্রামের স্কুল থেকেই পড়াশোনা শুরু, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং, মাস্টার ডিগ্রি আমেরিকায়। উচ্চতর পড়াশোনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান ১৯৭৮ সালে। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ১৯৮২ সালে। পেশায় প্রবেশ : ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ নর্থব্রিজ, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা, দেশে ফেরেন ১৯৮৫ সালে। কায়রো জাগাইজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভাগীয় প্রধান। মিসরের রাজনীতিতে : নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে মিসরের পার্লামেন্টে প্রথমবার নির্বাচিত হন ২০০০ সালে। পরের পাঁচ বছর সাংসদ মুসলিম ব্রাদারহুডের সংসর্গ। মিসরের শক্তিশালী মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগ দেন ২০০৫ সালে। শুরুতে দলের একেবারে সাধারণ স্তরের সদস্য হিসেবে থাকলেও পরে উন্নতি হয়। ২০১১ সালে বিপ্লব শুরু হলে ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক মুখ ‘ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’র সর্বেসর্বা নির্বাচিত হন। নির্বাচন : দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রথম পছন্দ ছিলেন খায়রত আল-শাতের। অতীতে তার অপরাধমূলক কাজে যুক্ত থাকার রেকর্ড ছিল, তাই কিছুটা কপাল জোরেই মিসরের মসনদ পেয়ে যান মুরসি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় ৫২ শতাংশ ভোট পান তিনি। শপথ গ্রহণ : ৩০ জুন ২০১২, মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ডিক্রি জারি : ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর, বিশেষ ঘোষণা মিসরে—প্রেসিডেন্টের হাতেই সব ক্ষমতা, এমনকি বিচার বিভাগের কাছেও জবাবদিহি করতে রাষ্ট্রনায়ক বাধ্য থাকবেন না। অগ্নিগর্ভ মিসর : আদালতের ক্ষমতা খর্ব করায় মুরসির বিরুদ্ধে বর্তমানে বিক্ষোভ চলছে মিসরে। মুবারক আমলের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কায়রোর তাহরির স্কোয়ারে বিক্ষোভ। মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠা : ১৯২৮ সালে, কায়রোয়। প্রতিষ্ঠাতা :হাসান আল-বান্না। সংগঠনের মূলমন্ত্র : সর্বশক্তিমান আল্লাহ-ই লক্ষ্য, একমাত্র পালনীয় পবিত্র কোরানের উপদেশ, একমাত্র নেতা মহানবী (সা.), লক্ষ্যপূরণের পথ একমাত্র জিহাদ, ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে আত্মাহুতি দেয়ার মতো এমন পবিত্র কাজ আর কিছুই নেই। উদ্দেশ্য : ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ পশ্চিমা সভ্যতার হাত থেকে ইসলামকে রক্ষা করে আগের মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়া। মিসরের রাজনীতিতে : শুরুতে জণকল্যাণমূলক সংগঠন, পরে রাজনৈতিক দল। ১৯৪৮ সালে নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে সংগঠন নিষিদ্ধ হয়। ১৯৪৮ সালে প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ আল-নোকরাশি পাশাকে হত্যা করে সংগঠনের এক সদস্য। বর্তমান পরিস্থিতি : হোসনি মুবারক ক্ষমতায় এসেই জেলে আটক ব্রাদারহুড সদস্যদের মুক্তি দেন। সংগঠন প্রথমে মুবারকের পাশে থাকলেও পরে বিরক্ত হয় তার আচরণে। মুবারকের পতন হওয়ার পর মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থনেই মিসরের ক্ষমতা পান মুহাম্মদ মুরসি। জনরোষের মুখে এবার মিসরের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসি। তিনি নাকি আইনের ঊর্ধ্বে! তার মুখ দিয়ে যা বেরোবে তা-ই অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে দেশকে। তিনি হবেন সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী! হাজার বছর আগে এমন ঘোষণা করতেন মিসরের শাসকরা। তাদের ডাকা হত ‘ফারাও’ বলে। একবিংশ শতাব্দীতে আবার এই ঘোষণা দিলেন মিসরের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসি। এমন অবস্থায় প্রেসিডেন্টের ইচ্ছাকেই সংবিধানের আকার দেয়ার ডিক্রি জারি হয়েছে গত সপ্তাহে। এই ডিক্রি জারির মাধ্যমে আদালতের ক্ষমতাকেও খর্ব করা হয়েছে। স্বাভাকিভাবেই এ সবের বিরুদ্ধে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা দেশ। তবে কি মিসরে ‘আরব বসন্তের ফুল’ শুকিয়ে গেল এক বছরের মধ্যেই? অকালমৃত্যু ঘটল মিসরীয় বিপ্লবের? হোসনি মুবারকের সরকারের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কায়রোর ক্ষমতায় বসলেন যে মহম্মদ মুরসি, তিনি যেন মুবারকেরই নামান্তর। আবার জনাকীর্ণ তাহরির স্কোয়্যার। সমবেত লাখো মানুষের মুখে ফের সরকার-বিরোধী স্লোগান। অনামী সাধারণ মানুষ থেকে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ এলবারাদেই—পথে নেমেছেন সবাই। মিসরবাসীরা মনে করছে—প্রেসিডেন্টের এই ব্যবস্থা চলতে পারে না, বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত আর স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে অনেক ফারাক—মুরসি আর বিপ্লবী নন। ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে গিয়ে তিনি এখন একনায়ক হওয়ার চেষ্টা করছেন। এমন অভিমত নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী পরমাণুবিজ্ঞানী মুহাম্মদ এলবারদেইরও। গত এক বছরে আমূল বদলে গেছে মিসরের রাজনীতি। ‘একনায়ক’ হোসনি মুবারকের সরকারের পতন ঘটাতে যারা পরস্পরের পিঠে পিঠ রেখে লড়েছিলেন, আজ তারাই একে অপরের মাথা কাটতে পারেন। অন্তত ‘রাজনৈতিক শত্রুতা’ সেই পর্যায়ে গিয়েই পৌঁছেছে। তাই ২০১১ সালের তাহরির স্কোয়্যার আর ২০১২ সালের তাহরির স্কোয়্যারে ফারাক অনেকটাই। বর্তমান প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বদলে গেছে পরিস্থিতি। শক্তিশালী ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ সংগঠনের প্রভাবে দেশে তাদের ইচ্ছামতো আইন প্রতিষ্ঠা করার জন্য হঠাত্ সচেষ্ট হয়ে পড়েন মুরসি। তিনি হলেন মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তার স্থায়িত্ব নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই সাংবাদিকদের কাছে নিজের কাজের সাফাই গাইতে গিয়ে মুরসি বলেছেন—দেশে কোনো পাকাপোক্ত সংবিধান থাকলে তাকে এমনকি আদালতেরও ঊর্ধ্বে উঠতে হতো না। দেশে প্রাথমিক কোনো সংবিধান তৈরি হলেই মুরসি তার দখল করা ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত, এমন কথাও তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু এমন আশ্বাসবাক্যে মন ভরেনি মিসরবাসীর। পার্লামেন্ট ভবনে সংবিধানের খসড়া রচনার প্রচেষ্টা আর রাজধানী কায়রোসহ পোর্ট সৈয়দ ও আলেকজান্দ্রিয়া। এ ছাড়া অন্যা বহু জায়গাতেই প্রেসিডেন্ট-বিরোধী বিক্ষোভ চরমে উঠেছে। একনায়কত্বের বিচারে প্রেসিডেন্টকে এক কথায় প্রাচীন মিসরের শাসক ফারাওদের আসনে বসিয়ে দিয়েছেন মিসরবাসী। নতুন সংবিধান তৈরি হলেই অতিরিক্ত ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার আশ্বাস থেকে শুরু করে দেশবাসীর কাছে দেশের বর্তমান পরিস্থির কথা উল্লেখ করে নিজের কাজের সাফাই গাওয়া পর্যন্ত কোনো চেষ্টাই বাকি রাখেননি মুরসি। কিন্তু মানেনি দেশের মানুষ। মুসলিম ব্রাদারহুডের এক মুখপাত্র জানিয়েছিলেন—মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধাচরণ করে দেশবাসী আসলে ‘আগুন নিয়ে খেলছেন’। কিন্তু এক দিন পরই সুর অনেকটাই নরম তাদের। মিসরের রাজনৈতিক মহল অবশ্য প্রথমেই দুই ভাগ হয়ে গেছে। সরকারি মুখপাত্র ইয়াসের আলী দাবি করেছেন— ‘দেশের ভালো করার জন্য প্রেসিডেন্ট যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন। এ নিয়ে দেশবাসীর কিছু বলার থাকতে পারে না।’ কিন্তু সাধারণ মানুষের বলার মুখ থামানো যায়নি সরকারি ফতোয়া দিয়ে। আইনকে কুক্ষিগত ও মাহমেদকে পদচ্যুত করার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে দেশবাসী। বিক্ষোভে তারা ফেটে পড়েছে সেই তাহরির স্কোয়ার প্রাঙ্গণেই। মুবারকের সরকারের পতনে মানুষের বহু স্মরণীয় উদ্যোগের সাক্ষী এই চত্বর। বছর ঘুরতেই ফের এখান থেকে দানা বাঁধতে শুরু করেছে মিসরের বিরোধীরা। মুরসির সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে রীতিমতো হাতাহাতিও হয়ে গেছে এখানেই। এরই মধ্যে অনেকে ২০১১ সালের বিপ্লবের গন্ধ পেতে শুরু করেছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী অন্তত এক হাজার ১০০ মানুষের প্রাণ গিয়েছিল সে বার। এ বারও দেশের সংসদ ভেঙে দিয়ে যে পথে হাঁটতে শুরু করেছেন মুরসি, তাতে এরই মধ্যে ঈশাণ কোণে সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছেন সদ্য ঘরপোড়া মিসরীয়রা। দেশে আরও এক একনায়কের জন্ম, তাও মাত্র দুই বছরের মধ্যে—এমনটি কিছুতেই মানবেন না তারা। মুবারকের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন যারা, ফের তারাই রাস্তায়। হাজার প্রাণের দামে আসা ‘স্বাধীনতা’ এ বার আর খোয়াতে রাজি নন নীল নদের দেশের বাসিন্দারা। নেপথ্য ভাবনা দেশের বিভিন্ন প্রাপ্তে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে ঠিকই, তবে এখনই একা হয়ে পড়েননি মুরসি। ‘ফ্রিডম ফর জাস্টিস পার্টি’র সাবেক সদস্য মুরসির পিছনে রয়েছে শক্তিশালী মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থন। এই সংগঠন বরাবরই মিসরের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে এসেছে। তাই প্রেসিডেন্ট হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বিক্ষোভের মুখে পৃষ্ঠপোষকদের দিকেই তাকিয়েছেন মুরসি। কট্টর ইসলামি, না উদারপন্থী? এ নিয়েই এখন বিভক্ত মিসরের রাজনীতি। নিজেদের যারা ‘উদার’ বলে দাবি করেন, মিসরের এমন দলগুলো বরাবর মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরোধীতা করেছে। পার্লামেন্টের পুরনো গভর্নিং বডির বদলে যাদের নির্বাচন করে প্রশাসনের ভার তুলে দেয়ার কথা ভাবছেন মুরসি, তাদের সবাই ওই সংগঠনের সদস্য বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক মিসরীয়। ইতিহাস বলছে—৬০ বছরেরও বেশি আগে থেকে মুসলিম ব্রাদারহুড ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করেছে দেশে। এই সংগঠনের মতাদর্শ সমর্থন করে একাধিক ইসলামি গোষ্ঠী তৈরি হয় মিসরে। সালাফি গোষ্ঠী ও নূর পার্টি এমনই দুটি সংগঠন। এরাও মুরসির সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছে। গত শতকের এর দশকে সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন ‘আল-গামা আল-ইসলামিয়া’-এর সদস্যরা। তবে এবার তারা সরব হয়েছেন মুরসির বিরুদ্ধে। প্রেসিডেন্টের ‘স্বেচ্ছাচারিতা’য় গলা চড়িয়েছে মিসরের প্রক্ষাত সংবাদমাধ্যম আল-মাসরি আল-ইউমও। পরিস্থিতি যে দিকে এক বছর আগে যারা পাশাপাশি লড়ে পতন ঘটিয়েছিলেন মুবারক আমলে, আজ তারাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরস্পরের শত্রু হয়েছেন। এমন ঘটনা মিসরের জন্য দুঃখজনক বলে মনে করছেন দেশের বেশির ভাগ মানুষ। আরব লিগের সাবেক কর্তা আবু মুসা অবশ্য দেশের উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য সর্বাংশে দায়ী করেছেন বর্তমান সরকারকেই। তার দাবি, এখন দেশের যা পরিস্থিতি, তাতে প্ররোচনামূলক কিছু না করাই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু, মুরসি নিজের ঘোষণা করা ডিক্রি থেকে সরে না এসে আগে ভাগেই সংবিধান রচনার চেষ্টা করায় সবার সন্দেহ ক্রমশ বাড়ছে। এরই মধ্যে অনেকে মুবারক আমলের দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। গত সপ্তাহেই পাকিস্তানে ‘ডি-৮’-এর বৈঠকে যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু দেশের সাম্প্রতিক টালমাটাল পরিস্থিতি দেখে পাকিস্তান সফর বাতিল করেছেন তিনি। শুধু মুরসিই নন, দেশের অবস্থাও ক্রমশ মুসলিম ব্রাদারহুডের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কায়রো ছাড়াও পোর্ট সৈয়দ ও আলেকজান্দ্রিয়ার মতো বিভিন্ন শহরে আক্রান্ত হয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুডের একাধিক দফতর। দেশের সর্বত্রই বিক্ষুব্ধরা আওয়াজ তুলেছেন ইসলামি এই সংগঠনের বিরুদ্ধে। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, আগে থেকে ঘোষণা করা সত্ত্বেও মুহাম্মদ মুরসির পক্ষে কোনো শোভাযাত্রা বের করা সম্ভব হয়নি সে সব ইসলামি সংগঠনের পক্ষে।