যে দেশ চালাচ্ছে একটি পরিবার!

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪০
ক্ষমতার চারপাশের লোকজনের জন্য ‘স্বজনপ্রীতি’ বা ‘পরিবারতন্ত্র’ বলে আপত্তিকর কিছু শব্দ চালু আছে। সেই স্বজনপ্রীতির দারুণ এক উর্বর ভূমির নাম শ্রীলঙ্কা। এখন দেশটির যেখানে তাকানো যায়, সেখানেই পরিবারতন্ত্রের চিহ্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। দেশের রাজনীতি থেকে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকও তারাই, তারা—রাজাপক্ষে পরিবার। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের ভাই ও নিকট আত্মীয়রা মিলেই চালাচ্ছেন দেশ। তাদের হাতে রয়েছে অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রক এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। বাজেটে মোট বরাদ্দের প্রায় ৭০ শতাংশ এই দুটি ক্ষেত্রেই খরচ হয়। রাজাপক্ষের বড় ছেলে সাংসদ, স্পিকার পদে আছেন রাজাপক্ষের দাদা। আর সংসদে প্রেসিডেন্টের রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন। ফলে যেকোনো বিল বা বাজেট তারা সহজেই পাস করিয়ে নিতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই বিরোধীরা এ বিষয়ে সরব। শ্রীলঙ্কার প্রধান বিরোধী দল ‘ইউনাইটেড ন্যাশানাল পার্টি’র নেতা হর্ষ ডি সিলভা বলেন, ‘কিছু মানুষ দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে কুক্ষিগত করে রেখেছেন।’ পরিবারতন্ত্রকে বাদ দিয়ে রাজনীতিকে কল্পনা করা সত্যিই কঠিন। ভারত থেকে আমেরিকা—সর্বত্রই রয়েছে সেই উদাহরণ। ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধী-নেহ্রু পরিবারের প্রভাব অনস্বীকার্য। জওহরলাল থেকে ইন্দিরা, রাজীব সোনিয়া-রাহুল গান্ধীর ট্র্যাডিশন আজও চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি পরিবারও এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য। বাংলাদেশেও এই পরিবারতন্ত্র নানা জামানায় কমবেশি দৃশ্যমান। তবে রাজনীতি থেকে অর্থনীতি—রাজাপক্ষে পরিবারের মতো এই একাধিপত্য ইতিহাসে বিরল। এমনকি হিটলার কিংবা বেনিতো মুসোলিনিরাও এতটা পারিবারিক দাপট কায়েম করতে পারেননি। দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন হওয়া সত্ত্বেও রাজাপক্ষের আত্মীয়রাই জিতে চলেছেন ধারাবাহিকভাবে—বছরের পর বছর। এ ব্যাপারে রাজাপক্ষের এক ভাই, বেসিল বলছেন, ‘এ নিয়ে এত গোলমাল করার কী আছে! আমাদের তো মানুষ ভোট দিয়ে জিতিয়ে এনেছেন। আর তা ছাড়া এমন উদাহরণ তো ভারত, আমেরিকাতেও আছে।’ তার কথায়, ‘আমরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়েছি। তাই এই পরিবারতন্ত্রকে জনগণই এনেছেন, মেনেও নিয়েছেন।’ বিরোধীদের মতে—একটি পরিবারের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় অর্থনীতিতেও তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিদেশি লগ্নি আসছে না। যদিও এই অভিযোগ মানেননি অর্থমন্ত্রী। বস্তুত, সেখানে রিয়্যাল এস্টেট ছাড়া আর কোনো শিল্পই সে ভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। সেই জমি-বাড়ি ব্যবসার সর্বত্র রাজাপক্ষে পরিবারেরই কর্তৃত্ব। কলম্বোয় একটি ৪৩ তলা টাওয়ার তৈরি হচ্ছে। সরকারি বিমা সংস্থা ও অন্য একটি প্রাইভেট সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্পে কাজ চলছে। দুটি ক্ষেত্রেই মালিক প্রেসিডেন্টের অতি বিশ্বস্ত গামিনী সেনেরথ। আর যে জমির ওপর এটি তৈরি হচ্ছে, তাও ছিল প্রতিরক্ষা দফতরের অধীনে। সেই সামরিক বাহিনীর মাথা রাজাপক্ষের আর এক ভাই। এখানেই শেষ নয়। শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা দফতরেরই শীর্ষ আধিকারিক হলেন প্রেসিডেন্টের আরেক ভাই। বিমান পরিবহণের ক্ষেত্রেও সেই একই ছবি। সরকারি বিমান সংস্থা দুটি। তার মধ্যে একটি সংস্থা চালান রাজাপক্ষের শ্যালক। বহু কোটি টাকা লোকসান সত্ত্বেও মালিকানা এখনো তার হাতেই । রাজনৈতিক মহল বলছে—রাজাপক্ষে সরকারের এও এক নতুন নজির। এমন একাধিপত্য পৃথিবীতে অন্য কোনো পরিবার দেখাতে পারেনি। বিশেষত, অর্থনীতিকেও কুক্ষিগত রাখাটা সত্যিই বিরল।