আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে বিরোধী দল অনঢ় অবস্থান নিলেও অনির্বাচিত কোনো সরকার ব্যবস্থায় না ফেরার সিদ্ধান্তেই এখনো পর্যন্ত শক্ত অবস্থান মহাজোট সরকারের। গত প্রায় এক বছরে সংসদের ভেতরে, বাইরে ও বিদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্য-মন্তব্য পর্যালোচনা করলে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হচ্ছে— কোনো অবস্থাতেই তিনি বা তার সরকার অনির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা মেনে নেবেন না। বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে বলে ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন তিনি। প্রয়োজনে সরকার ও বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা যেতে পারে, কিন্তু অনির্বাচিত সরকার কিছুতেই নয় বলে দুই-তিনবার উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে নির্বাচনকালীন সরকারেরও প্রধান থাকবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী-ই, এই অবস্থান থেকে এক চুলও সরেননি শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক বক্তব্যসমূহে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট করেছেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি বা বিরোধী দল আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে বলে মনে করছে সরকার। বর্তমান নবম জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দিয়েই আগামী দশম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলেও মৌখিক অঙ্গীকার করেছেন শেখ হাসিনা। মহাজোট শরীক জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদসহ কেউ কেউ আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনার কথা বললেও তিনি তা নাকচ করে দিয়েছেন। কোনো অজুহাতেই দেশে জরুরি অবস্থা জারির ইচ্ছা বর্তমানে সরকারের নেই বলেও দেশবাসীকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া তিনি আগামী দশম নির্বাচনের একটি খসড়া সময়সীমাও উল্লেখ করেছেন অন্তত দু’বার। তিনি বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়াও শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্যে একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার কাজ বর্তমান সরকারের মেয়াদেই শেষ করার কথা বলেছেন বহুবার। এসব বক্তব্য দিতে গিয়ে কখনও কখনও তিনি জামায়াতকে বিএনপির জোট থেকে বের করার কথাও ইঙ্গিত দিয়েছেন। একইসঙ্গে বর্তমান সরকার বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া এবং তার দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর দুর্নীতি-অনিয়মের বিচার করবে বলেও অসংখ্যবার দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পথ বন্ধ করা হয়েছে, এ কথার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, গণতন্ত্র নিয়ে চক্রান্ত চলছে। দেশবাসীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বারবার বলেছেন, ১/১১ এর মতো ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার ১/১১ কিংবা তত্ত্বাবধায়কের নামে অনির্বাচিত সরকার এলে বিরোধী দলও রক্ষা পাবে না বলেও সাবধানতা উচ্চারণ করেছেন শেখ হাসিনা।
বিরোধী দল বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের যে দাবি জানাচ্ছে সে বিষয়ে গত ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক বিষয়ে হাইকোর্টের রায় ছিল। সংসদের মাধ্যমে আমরা সেই রায় কার্যকর করেছি। কাজেই তারা (বিরোধী দল) হাইকোর্টের রায় না মানলে কিছু বলার নেই। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি এও বলেছেন, বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। যখন সময় আসবে তখন আমি রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করে বলবো- আমরা এই সময়ে নির্বাচন করতে চাই। তখন রাষ্ট্রপতি যে নির্দেশ দেবেন সে অনুযায়ীই নির্বাচন হবে। নির্বাচনের সময় ছোট মন্ত্রিসভা থাকবে জানিয়ে তিনি বলেছেন, নির্বাচনের সময় কত সদস্যের কেবিনেট থাকবে সেটিই ঠিক করবেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতিই সময়মতো সংসদ ভেঙ্গে দেবেন। এটি রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। রাষ্ট্রপতির নির্দেশ মোতাবেক একটি তারিখ নির্ধারণ করে নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন। প্রধানমন্ত্রী সেদিন এও বলেছেন, সংসদীয় গণতন্ত্র ও ওয়েস্ট মিনিস্টার গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী সাধারণত সরকার প্রধান এই সময়ে নির্বাচন করতে হবে বলে রাষ্ট্রপতিকে প্রস্তাব দেন। তখন রাষ্ট্রপতি নির্দেশ দেন এবং সে অনুযায়ীই নির্বাচন হয়।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করার কথা বললেও এ নিয়ে সাংবিধানিক অস্পষ্টতা রয়েছে। সংবিধানের ১২৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, নির্বাচনের সময় সংসদ বহাল থাকবে, মেয়াদ শেষ হবার কারণে সংসদ ভেঙ্গে গেলে নির্বাচন হবে এর পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। আর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অন্য কোনো কারণে (কিংবা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙ্গে দিলে) তখন নির্বাচন হবে সংসদ ভাঙ্গার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। কাজেই সংসদ ভাঙতে হলে আবার সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন আছে কীনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
প্রধানমন্ত্রী অন্তত দু’বার ‘নির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন’ সরকারের কথা বলেছেন। ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস হওয়ার দিনে তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে সরকারি দল থেকে পাঁচজন এবং বিরোধী দল থেকে পাঁচজন এমপি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা যেতে পারে। এছাড়া চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষদিকে বিবিসি বাংলা রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। সে সরকারে বিএনপিও থাকতে পারে। বিরোধী দল এ নিয়ে সংসদে প্রস্তাব দিলে আলোচনা হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব দিলেও ২০১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের হলরুমে সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই পরবর্তী নির্বাচন হবে। নিউইয়র্কে এই সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে এবং ঐ নির্বাচনে বিএনপিসহ সব দলই অংশ নেবে। চলতি বছরেও একবার গণভবনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন যথাসময়েই হবে, এবং বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে খালেদা জিয়াও অংশ নেবেন, এবং অংশ তাঁকে নিতে হবে।
বিরোধী জোটের তত্ত্বাবধায়ক দাবির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কখনো কখনো কৌশলী মনোভাব দেখিয়েছেন। যেমন ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় যে কেউ যে কোনো দাবি জানাতে কিংবা কথা বলতেই পারে। দাবি করার স্বাধীনতা যেকোনো মানুষেরই রয়েছে।
আবার বর্তমানে সবেচেয়ে বেশি তর্কিত এবং রাজনৈতিক প্রধান সংকট এই ইস্যুতে শেখ হাসিনা আলোচনার কথাও বলেছেন। গত ২৭ জুন সংসদে বাজেট আলোচনায় তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ আলোচনার নীতিতে বিশ্বাসী। যখনই কোনো বিষয় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় তখন সেটির নিষ্পত্তিতে আমরা আলাপ-আলোচনার পথ বেছে নিই। আলোচনার মাধ্যমেই আমরা বিতর্ক নিষ্পত্তির চেষ্টা করি।
গত ২৮ নভেম্বর ১৮ দলের সমাবেশে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘ফিসফাস শোনা যায়, সরকার জরুরি অবস্থা দিতে পারে।’ খালেদা জিয়া প্রকাশ্যে একথা বলার আগেও গত প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন মহলেও এ নিয়ে কানাঘুষা ছিল। তবে এই আশঙ্কার কথা নাকচ করে দিয়ে ২৯ নভেম্বর সংসদে শেখ হাসিনা বলেছেন, জরুরি অবস্থা জারির প্রশ্নই ওঠে না। দেশে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে জরুরি অবস্থা জারি করতে হবে। দেশ চলছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, সেটিই অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে দেশে আরেকটি ১/১১ ঘটানোর চক্রান্ত করা হচ্ছে বলে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগ করে গত ১৪ মার্চ ঢাকায় ১৪ দলের জনসমাবেশে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ এখন থেকে গণতান্ত্রিক পথেই চলবে। বিরোধী দলীয় নেতা যতোই চেষ্টা করুন পেছনের দরজা দিয়ে তিনি আর ক্ষমতায় যেতে পারবেন না। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক এলেই যে নির্বাচন হবে এর গ্যারান্টি কোথায়? আবার যদি ১/১১’র মতো সরকার আসে তাহলে সংবিধান কার্যকর থাকবে না, ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীনের মত সরকার চলতেই থাকবে, এর ফলে জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার হারাবে।
বর্তমান সরকারের অধীনেই যে আগামী নির্বাচন অবাধ হওয়া সম্ভব, এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান সরকারের সময়ে উপ-নির্বাচন, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ প্রায় ছয় হাজারের মতো নির্বাচন হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচন অবাধ হয়েছে। সরকার ক্ষমতার দাপট দেখায়নি। এমনকি বিরোধী দলও একটি অভিযোগ করতে পারেনি। কাজেই আগামী নির্বাচনও এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু হবে। সেই পরিবেশও ফিরে এসেছে।
মহাজোট সরকারের চার বছরে প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া ও তাঁর দুই পুত্রের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে তাদের বিচার করার কথা বলেছেন। গত বছরের ৩০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, মানিলন্ডারিং করে তাঁর (খালেদা জিয়ার) ছেলেরা বিদেশে অনেক টাকা রেখেছে। এর আগে ২০১১ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মানিলন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িতরা একইসূত্রে গাঁথা। বাংলার মাটিতে তাদের ঠাঁই হবে না। এরপর একই বছরের ১৮ আগস্ট ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের এক সভায় তিনি বলেছেন, জনগণের অর্থসম্পদ লুট করে বিদেশে পাচারকারী ও এতিমদের অর্থ আত্মসাত্কারীদের বিচার এদেশে হবেই।
