সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন পড়ে আশান্বিত ও একই সঙ্গে বিস্মিত হয়েছি। সুখবরটি যতখানি আশা জাগিয়েছে বিপরীতে দ্বিতীয় অংশটি ততখানিই শঙ্কিত করেছে। গত ৩০ অক্টোবর এফডিসিতে জরুরি একটি বৈঠকে অংশ নেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ডিজিটাল এবং চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনকে (এফডিসি) আর্থিকভাবে সচ্ছল করার লক্ষ্যে নতুন কিছু পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বৈঠকে। পরে এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের জানান, আগামি ছয় মাসের মধ্যে দেশে ২০০ প্রেক্ষাগৃহকে ডিজিটাল করার পাশাপাশি ডিজিটাল ক্যামেরা, এডিটিং ও ডাবিং থিয়েটারের যন্ত্রপাতিসহ ফ্লোরগুলোর মানোন্নয়নের কাজ হবে। আগামি ছয় মাসের মধ্যে এসব কাজের প্রাথমিক প্রস্তুতি শেষে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এ পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশিয় চলচ্চিত্রের মানোন্নয়ন হবে।
আমরাও এ খবরে আশান্বিত হই। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সবাই নিশ্চয় এতে অনেক বেশি আশান্বিত হয়েছেন। এফডিসির ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে তারা আবার হয়তো শুরু করেছেন স্বপ্ন দেখতে। অনেকে আবার এটিকে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল বলে হাতে তালি দিচ্ছেন। সবই ঠিক ছিল যদি সংবাদের দ্বিতীয় অংশটি না থাকত। দ্বিতীয় অংশে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, এফডিসির সম্পাদনা ভবন সংলগ্ন মাঠে একটি অত্যাধুনিক শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শপিং কমপ্লেক্সটিতে চলচ্চিত্র বিষয়ক পাঠাগার, ক্যামেরা, লেন্সসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিক্রির ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া কিছু ফ্লোর সাধারণ ব্যবসায়ীদের ভাড়া দেয়া হবে। আর সেখানে থাকবে মাত্র দুটি সিনেপ্লেক্স। আর এ থেকে বার্ষিক আয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের খাতেই জমা হবে।
ঘটনার এখানেই শেষ নয়, ইতোমধ্যে নাকি এই শপিং কমপ্লেক্সের নকশা তৈরি হয়ে গেছে। আগামি ১৬ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই শপিং কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন বলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। সংবাদপত্র থেকে উদ্ধৃত করা আমার এই বয়ান পড়ে অনেকে মনে করতে পারেন এতো সব আশার কথা; এখানে শঙ্কা কিংবা বিস্মিত হওয়ার মতো আপনি কী পেলেন? আবার অনেকে মনে করতে পারেন আমাদের দেশের মানুষের এই এক সমস্যা কারো ভালো দেখতে পারে না। এই সবগুলো অভিযোগ কাধে নিয়েও আমি এই বিষয়ে বিশেষ করে এফডিসির ভিতরে শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের ব্যাপারে কিছু কথা বলার ও পাঠকদের মনোযোগ দিয়ে পড়ানোর প্রয়োজন অনুভব করছি। আমার প্রথম প্রশ্ন এফডিসিতে চলচ্চিত্রের উন্নয়নের ধোঁয়া তুলে ‘বাণিজ্যিক শপিং কমপ্লেক্স’ কেনো? দ্বিতীয় প্রশ্ন শপিং কমপ্লেক্স বলেন, আর সিনেপ্লেক্স কিংবা চলচ্চিত্র সংক্রান্ত পাঠাগার, ক্যামেরা, লেন্সসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিক্রির দোকানের কথা বলেন—সেটা এফডিসির জমি ‘দখল’ করে কেনো? এসব প্রশ্ন নিয়ে কথা বলার আগে আসুন একটু ফিরে যাই চলচ্চিত্রের অতীতে। এই বাংলায় হীরালাল সেনের হাতে শুরু হয়ে জব্বার খান, একটু বিরতি দিয়ে জহির রায়হান, আলমগীর কবির—এরপর নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। অন্যদিকে সেই ১৯৬৯ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনকে সভাপতি করে গঠিত হয়েছিল চলচ্চিত্র সংসদ। তারপর সেটা নানাভাবে, নানা পথে এগিয়ে মুহম্মদ খসরু, আলমগীর কবির, তানভীর, মোরশেদুল, তারেক হয়ে আজকের উত্সুক, উদ্যোমী তরুণদের হাতে। এই দুই ধারার মানুষগুলোর প্রত্যেকের কোনো না কোনোভাবে এক ধরনের স্বপ্নের জায়গা ছিল চলচ্চিত্রের জন্য এমন একটি স্থানের যেখানে কেবল চলচ্চিত্র নিয়েই কথা হবে, সেখানে থাকবে চলচ্চিত্রের সবকিছু। তরুণ, পৌঢ় সেখানে ছবি দেখবেন, কথা বললেন শিল্প-সাহিত্য নিয়ে; কেউ স্বপ্ন ফেরি করবেন, আর কেউ তা স্বপ্নের দামে কিনবেন। এই ছিলো তাদের স্বপ্ন, যা দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন হয়নি। অনেকে অবশ্য এ ধরনের স্বপ্নের কথা এলে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতার ‘নন্দন’-এর কথা উদাহরণ হিসেবে আনেন।
এই একই ধরনের একটি স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে লালন করে আছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরাও। একটি জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র—যেটি হবে দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মিলনকেন্দ্র। এই স্বপ্ন যখন আমাদের চলচ্চিত্রপ্রেমীরা দেখছেন তখন এফডিসির এক অংশ দখল করে তৈরি হচ্ছে ‘শপিং কমপ্লেক্স’। সংবাদ পড়ে যে কারো বুঝতে বাকি থাকবে না এটি হবে মূলত একটি বাণিজ্যিক ভবন, সঙ্গে এই ভবনটিকে জায়েজ করার জন্য হয়তো থাকবে চলচ্চিত্রের কিছু অনুষঙ্গ। কারণ প্রতিবেদনটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘... এছাড়া এর কিছু ফ্লোর সাধারণ ব্যবসায়ীদের ভাড়া দেয়া হবে। দুটি সিনেপ্লেক্সও থাকবে। আর এ থেকে আসা বার্ষিক আয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন খাতেই জমা হবে।’ লক্ষ্য করুন, এইসব কথা ভিন্ন ইঙ্গিত করে।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো, এফডিসির জায়গা দখল করে কেনো এই আয়োজন? এ প্রশ্ন নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার আগে এফডিসি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে দুটো কথা বলার প্রয়োজন মনে করছি। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তত্কালীন প্রাদেশিক আইন পরিষদের শেষ অধিবেশনের দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার বিল উত্থাপন করেন। সামান্য সংশোধনীর পর বিলটি বিনা বাধায় আইন পরিষদে পাস হয়। এখানে একটি কথা বলা জরুরি, সে সময় এফডিসি প্রতিষ্ঠার পিছনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। বিলটি পাস হওয়ার এক বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠা হয় পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বা ইপি এফডিসি। প্রথমে এর কার্যালয় ছিল সেগুনবাগিচায় মহিউদ্দিন সাহেব নামে জনৈক ব্যক্তির বাসায়। পরে ১৯৫৯ সালে তা বর্তমানে জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। প্রথম দিকে এফডিসির জন্য তেজগাঁওয়ের বর্তমান এলাকায় বরাদ্দ ছিলো ২৫ একর জমি। পরে তা কমতে কমতে ৬ দশমিক ৫৬ একরে এসেছে ঠেকেছে।
এই হলো মোটামুটি এফডিসি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। মাত্র ৬ দশমিক ৫৬ একর জায়গার উপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একমাত্র স্টুডিওটি! সেই জায়গা থেকেও কিছু অংশ নিয়ে এখন তৈরি করা হবে শপিং কমপ্লেক্স। বিস্ময়ের শেষ থাকে না এমন একটি সিদ্ধান্তে। এখন প্রশ্ন ওই মাঠটিও যদি দখল হয়ে যায় তাহলে এফডিসির আর থাকলো কী? ভারতে বেসরকারি উদ্যোগে এ বছরের এপ্রিলে চালু হওয়া একটি স্টুডিওর উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিম মোদিনীপুরের চন্দ্রকোনার আড়াবাড়ি জঙ্গলের কাছে নির্মাণাধীন এই স্টুডিওটি গড়ে উঠছে দুই হাজার ৭০০ একর জমির উপর। প্রয়াগ গ্রুপ নামে একটি প্রতিষ্ঠান এর জন্য ব্যয় করছে প্রায় এক হাজার কোটি রুপি। এটি হবে বিশ্বের অন্যতম বড় ফিল্ম সিটি। ছবি নির্মাণের অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে এখানে।
একবার ভাবুন, কোথায় ৬ দশমিক ৫৬ একর আর কোথায় দুই হাজার ৭০০ একর। অনেকের কাছে এই তুলনা অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে। এটা ঠিক, ভারতের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমাদের এ তুলনা যায় না। তারপরও আমি কেবল চিন্তার ও পরিকল্পনার তুলনা করার চেষ্টা করেছি। কোথায় আমরা চলচ্চিত্রের চলমান এই সঙ্কটে এফডিসিকে নতুন করে অত্যাধুনিকভাবে ঢেলে সাজিয়ে এর আয়তন বাড়াবো, উল্টো এর জায়গা দখল করে শপিং কমপ্লেক্স করছি। এই যদি হয় চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের মহাপরিকল্পনা, উন্নয়ন কিংবা চলচ্চিত্রপ্রেম—তাহলে বলার কিছু থাকে না। তারপরও কিছু থেকে যায়—সেটা স্বপ্ন; যে স্বপ্ন নিয়ে মৃতপ্রায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখনও ধুকধুক করে বেঁচে আছে। এফডিসির কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন জরুরি, সময়ের দাবি—কিন্তু তা কোনোভাবেই এফডিসির অঙ্গহানি করে নয়। আর উন্নয়নের নামে শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের যে পরিকল্পনা—তারতো প্রশ্নই উঠে না। চলচ্চিত্রের এই সঙ্কটের সময় যদি করতে হয়, জাতীয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র করতে হবে। আর এফডিসির ডিজিটালাইজেশনেরতো কোনো বিকল্পই নেই। এমন পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় বিষয়টি বিবেচনা করবেন। ঐতিহ্য ধ্বংস করে নয়, ঐতিহ্যকে সামনে রেখে নিশ্চয় নতুন কোনো দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবেন। যা চলচ্চিত্রের মৃত্যুকে বাঁচিয়ে তাকে সজীব করে তুলবে।
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক
