গতি নেই প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পে

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৭
সরকারের আর্থিক টানাপড়েনে পিছিয়ে পড়ছে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত অগ্রাধিকার প্রকল্পের বাস্তবায়নও হতাশাজনক। পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে গতিহীন হয়ে পড়েছে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম। অর্থের অভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার পরও প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে। সময়মত এসব প্রকল্প শেষ তো হচ্ছেই না বরং কখন যে অর্থ পাওয়া যাবে তা নিয়েও সংশয় কাটছে না সংশ্লিষ্টদের। বিষয়টি নিয়ে নাখোশ হয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে হতাশা ব্যক্ত করা হয়। এতে বলা হয়, অর্থের অভাবের পাশাপাশি বিলম্বে প্রকল্প অনুমোদনও উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শুধু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকল্পই রয়েছে ৫১টি। এর মধ্যে বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়েছে মাত্র ১৪টির। ২টি প্রকল্পের কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের সমীক্ষা চলছে। ১৩টি প্রকল্প সওজ অধিদপ্তর ও একটি সড়ক বিভাগে প্রক্রিয়াধীন। ২১টি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধীন। এরমধ্যে ৪টি প্রাক-প্রকল্প মূল্যায়ন সভার (পিইসি) সুপারিশক্রমে একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। বেশ কিছু প্রকল্প দীর্ঘদিন পরিকল্পনা কমিশনের প্রক্রিয়াকরণ এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন বিলম্বিত হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে অবিলম্বে এ সকল প্রকল্প অনুমোদনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়। ১০ প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতির চিত্র গুরুত্বপূর্ণ হলেও পিছিয়ে থাকা এসব প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রকল্প নির্ধারিত সময় শেষ করা যাচ্ছে না শুধু টাকার অভাবে। অনুমোদন না দেয়া এবং কোন কোন প্রকল্পে মাঝামাঝি এসে অর্থের যোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। নিচে প্রকল্পগুলোর অবস্থা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প (দাউদকান্দি-চট্টগ্রাম অংশ) এ প্রকল্পের আওতায় ১০টি সড়ক নির্মাণ ও ৩টি সেতু নির্মাণ প্যাকেজে ১৯২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। অক্টোবর ২০১২ পর্যন্ত এ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২১ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৩১ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সমাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় নির্মাণ সামগ্রী মজুদ নেই। নির্ধারিত সময় ২০১৩ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটি শেষ করতে অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। গৌরনদী-আগৈলঝাড়া-পয়সারহাট কোটালীপাড়া-গোপালগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এ প্রকল্পে চলতি (২০১২-২০১৩) অর্থবছরে মাত্র ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর নাগাদ নির্ধরিত সময় কাজ শেষ করতে আরো ৭৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। এ প্রকল্পের কাজও সন্তোষজনক নয়। অভিযোগ রয়েছে, এ প্রকল্পের সাইটে ঠিকাদার পর্যাপ্ত নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ করেনি এবং বাস্তব অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। প্রকল্পের সড়ক নির্মাণ করার আওতায় ঠিকাদার নিয়োগের ১১ মাস পর কাজের অগ্রগতি না থাকায় চুক্তি বাতিল করা হয়। কিন্তু আগের ঠিকাদার পুনরায় অন্য নামে দরপত্রে অংশগ্রহণ করে কাজ নিয়েছে। জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ সড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প এ প্রকল্পটির অনুমোদিত মূল্য ৯৯২ কোটি টাকা। জুন ২০১২ পর্যন্ত প্রাপ্ত বরাদ্দের পরিমাণ ২১৩ কোটি টাকা যা অনুমোদিত মূল্যের মাত্র ২১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ প্রকল্পে ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ অর্থবছরে আরো অতিরিক্ত ৭৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। ইস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইম্প্রুভমেন্ট প্রকল্প এ প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ৬৯১ কোটি টাকা। জুন ২০১২ পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১০৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ১৪৯ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে কন্সালটেন্টের ডিজাইনের ত্রুটি থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ প্রকল্পে আরো ৯৪ কোটি টাকা প্রয়োজন। পটুয়াখালী-কুয়াকাটা সড়কে শহীদ শেখ কামাল সেতু, শহীদ শেখ জামাল সেতু ও শহীদ শেখ রাসেল সেতু (খেপুপাড়া, হাজীপুর ও মহীপুর এ ৩টি সেতু) জানানো হয়েছে প্রকল্পটির অনুমোদিক প্রাক্কলিত ব্যয় ১৪৩ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী সেতু ৩টির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেছেন। শহীদ শেখ কামাল সুেত (খেপুপাড়া সেতু) বাস্তবায়নে অগ্রগতি ৩৫ শতাংশ, শহীদ শেখ জামাল সেতুর (হাজীপুর সেতু) বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ৭ শতাংশ। অন্যদিকে শহীদ শেখ রাসেল সেতুর (মহীপুর সেতু) বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৬৫ শতাংশ। জুন ২০১২ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩৪ কোটি টাকা। চলতি ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ২০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন। পিরোজপুর-গোপালগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন এবং শেখ লুত্ফুর রহমান সেতু (পাটগাতী সেতু) নির্মাণ এ প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ২১০ কোটি টাকা। চলতি ২০১২ পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৬৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ২৫ কোটি টাকা। দ্রুত সেতুটি নির্মাণ করার জন্য সেতুটির বিউটিফিকেশনের কাজ ইতিপূর্বে বাদ দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের জুন মাস নাগাদ সেতুটি নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন। মিরপুর-বিমানবন্দর সড়কে ফ্লাইওভার এবং বনানী রেল ক্রসিং-এ ওভারপাস নির্মাণ প্রকল্প সেনাবাহিনী কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির ওভারপাস অংশের বাস্তব অগ্রগতি ৯০ শতাংশ। অন্যদিকে ফ্লাইওভার অংশের বাস্তব অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ। বনানী ওভারপাসটি চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করার জন্য সম্মতি দিয়েছেন। চলতি অর্থবছরে এ প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ১৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময় শেষ করার জন্য অতিরিক্ত ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন। জেলা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প (৮টি) সমগ্র দেশের জেলা সড়ক উন্নয়নের লক্ষ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৮টি জোনাল জেলা সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে। এ ৮টি প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৩১৩ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত সম্ভাব্য কাজ সমাপ্ত করতে আরো ১৬৬ কোটি টাকা প্রয়োজন। নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা সড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৫ কোটি টাকা। এ অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ৪০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের জুন মাস নাগাদ প্রকল্পটি শেষ করার জন্য অতিরিক্ত ৬২ কোটি টাকা প্রয়োজন। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন সড়ক নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত সেতুসমূহের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তকরণ প্রকল্প এ প্রকল্পের আওতায় ৪৮টি অসমাপ্ত সেতু রয়েছে যার মোট দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ৮৫২ দশমিক ৪৫ মিটার। প্রকল্পটিতে ১৭টি সেতুর সম্পূর্ণ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে এবং ৯টি সেতুর সাব-স্ট্রাকটারের কাজ সমাপ্ত হয়েছে এবং ৩২টি সেতুর কাজ চলমান রয়েছে। মোট ৩০৬ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি জুন ২০১২ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা যা মোট বরাদ্দের মাত্র ২৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৩৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে আরো অতিরিক্ত ১৫ কোটি টাকা প্রয়োজন।