স্মরণ

নূরুল ইসলামের মর্মান্তিক মৃত্যুর দায় আমরা এড়াবো কী করে?

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:১২
নিজগৃহে রহস্যজনক এক অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছিলেন জননেতা নূরুল ইসলাম। তিনি একা নন, রক্ষা পায় নি তাঁর একমাত্র যুবক পুত্র ইসলাম তমোহরও। তমোহরের মৃত্যু হয়েছিল তাত্ক্ষণিকভাবে। কিন্তু মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়েও নূরুল ইসলাম বেঁচেছিলেন। কথাও বলেছেন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সেদিন যে-কথাটি তিনি বলে গেছেন তাতে বিন্দুমাত্র অস্পষ্টতা ছিল না। কণ্ঠনালী পুড়ে গিয়েছিল। কথা বলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। তারপরেও খুবই স্পষ্টভাবে তিনি বলেছেন, ‘এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা চক্রান্ত। গভীর এক চক্রান্ত। ...পুচিকে (তমোহর) ওরা মেরে ফেলেছে। আমাকেও মেরে ফেলতে চেয়েছে...’। নূরুল ইসলামের এই বক্তব্য আমরা অনেকেই শুনেছি এবং একাধিক টিভি চ্যানেলেও তা প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মর্মান্তিক এ-ঘটনাটির যারা তদন্ত করেছেন বা করছেন, অজ্ঞাত কারণে তারা নূরুল ইসলামের এ-বক্তব্যকে কখনই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি। বরং শুরু থেকেই তারা বলার চেষ্টা করেছেন যে এটি একটি সাধারণ দুর্ঘটনা মাত্র। নূরুল ইসলাম কোনো অগুরুত্বপূর্ণ বা উপেক্ষা করার মতো লোক ছিলেন না। ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও স্কপের শীর্ষপর্যায়ের নেতা ছিলেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন ডাকসুরও। আমৃত্যু সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের। ছাত্রনেতা, শ্রমিক নেতা ও জননেতা হিসেবে সারা জীবন জনগণের রাজনীতি করেছেন। পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে। স্বাধীনতার পরেও সকল সংকটে-দুর্বিপাকে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে পালন করেছেন অগ্রণী ভূমিকা। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এ দীর্ঘ ও দুর্গম পথযাত্রায় তাঁর সহযাত্রীদের অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছেন, নতিও স্বীকার করেছেন নানা প্রলোভনের কাছে। কিন্তু তিনি কখনই লক্ষ্য ও আদর্শচ্যুত হন নি। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোটের তিনি ছিলেন খুবই সক্রিয় একজন সদস্য। নিজের নির্বাচনী এলাকা লক্ষ্মীপুরের একটি আসন থেকে মহাজোটের মনোনয়নও পেয়েছিলেন। সেই মনোনয়নই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিনা— এমন আশঙ্কাও উচ্চারিত হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পর। এ-আশঙ্কাকে একেবারে অমূলকও হয়তো বলা যাবে না। নূরুল ইসলামের মৃত্যু আর মহাজোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্যে ব্যবধান মাত্র কয়েক সপ্তাহের। বেঁচে থাকলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের বিপুল বিজয় দেখে তিনি যে খুব আনন্দিত হতেন তাতে সন্দেহ নেই। তাঁর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর অবর্ণনীয় শোকের মধ্যেও নূরুল ইসলামের স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা মহাজোটের বিজয়ে অত্যন্ত আনন্দিত ও আশ্বস্ত হয়েছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন যে, মৃত্যুর পরে হলেও তিনি অন্তত ন্যায়বিচারটুকু পাবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, দীর্ঘ চারটি বছর পার হয়ে গেছে। অথচ তদন্তই এখনও শেষ হয় নি। কবে শেষ হবে বা আদৌ শেষ হবে কিনা তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ। ফলে বিচারের বাণী আজো মাথা কুটে মরছে। আর সেই কালরাত্রির রহস্যময় আগুনে শুধু যে তাঁর স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরাই দগ্ধ হচ্ছেন তাই নয়, দগ্ধ হচ্ছে আমাদের বিবেকও। নূরুল ইসলামের মতো নিবেদিতপ্রাণ মানুষেরাই যদি ন্যায়বিচার না পান, সেখানে আমজনতা ভরসা রাখবে কোথায়? লেখক : কবি ও সাংবাদিক