‘ঢাকা চেম্বারকে প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসায়ী সংগঠনে পরিণত করব’

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৪
তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)-এর সাবেক সভাপতি মো. সবুর খান আগামী ২৯ ডিসেম্বর দেশের বৃহত্তম ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন এজিএম-এর মাধ্যমে। তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট এই ব্যবসায়ীর সাথে আমরা ঢাকা চেম্বারকে নিয়ে তার কর্ম পরিকল্পনার কথা জানতে চাই। মো. সবুর খান বলেন, ‘প্রথমে ধন্যবাদ দিতে চাই ঢাকা চেম্বাররের সম্মানিত সদ্যস্যদের যারা আমার উপর আস্থা রেখেছেন এবং মহান দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করতে চলেছেন। ঢাকা চেম্বার এমন একটি ব্যবসায়ীক সংগঠন, যেখানে ভেদাভেদ, রাজনীতি নেই। যেখানে পূর্বেকার নির্বাচিত সদস্যরাও বিভিন্ন কাজকর্মে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারেন।’ মো. সবুর খান বলেন, ‘একজন সেল্ফমেইড বিজনেসম্যান হিসেবে আমি মনে করি ঢাকা চেম্বারে এখন পর্যন্ত অনেক ভালো কাজ হয়েছে, কিন্তু সেগুলোকে ফোকাস করা হয়নি। আমি দায়িত্ব নিয়ে পূর্বের কাজগুলোকে মূল্যায়ন করব এবং এই শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠনটিকে আরও গতিশীল করব। ঢাকা চেম্বার একটি অতি পুরোনো ব্যবসায়িক সংগঠন যা শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠন হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। সারা বিশ্বের ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর সাথে রয়েছে এর নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক থাকা অবস্থায় সব ব্যবসায়ীরা কীভাবে লাভবান হবে তা নিয়ে আমি কাজ করব।’ মোঃ সবুর খান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৫ সালের ২৩ জানুয়ারি চাঁদপুর সদর থানার ৩নং কল্যাণপুর ইউনিয়নের রঙ্গেও গাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বাবুরহাটের ব্যবসায়ী মো. ইউনুস খান, মা মোসাম্মত্ রওশন আরা। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে সবুর খান ১৯৭৬ সালে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৮১ সালে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৩ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন তিনি। সবুর খান ১৯৮৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে বিএসসি (অনার্স) এবং ১৯৮৮ সালে এমএসসি পাশ করেন। শিক্ষার পাশাপাশি স্কাউট আন্দোলনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সবসময় নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন সবুর খান। ১৯৯০ সালে মাত্র দুটি ৮০৮৮ এক্সটি পিসি দিয়ে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৯১ সালের শেষ দিকে আরও দুইটি অ্যাপল ম্যাকিন্টোশ এবং একটি লেজার প্রিন্টার দিয়ে ড্যাফোডিল ডেস্কটপ পাবলিশিং সেন্টার চালু করেন। ১৯৯২ সালে ড্যাফোডিল ডেস্কটপ পাবলিশিং সেন্টারকে আরও বড় আকারে গড়ে তোলেন এবং এই সময় থেকেই তিনি স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত কম্পিউটার অ্যাকসেসরিজ বিক্রি শুরু করেন। ১৯৯৩ সালে সিঙ্গাপুর থেকে আমদানীকৃত যন্ত্রাংশ দিয়ে তিনি সিডিকম ক্লোন পিসি অ্যাসেম্ব্লিং করে বাজারজাত শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে তার নেতৃত্বে ড্যাফোডিল কম্পিউটার কমটেক (COMTEQ) ফেয়ারে অংশগ্রহণ করে এবং সাড়া জাগাতে সমর্থ হয়। প্রাত্যহিক জীবনে কম্পিউটারের প্রয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তির ভবিষ্যত বিস্তৃতি, দ্রুত কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতা এবং ক্রেতা সাধারনের চাহিদার কথা মাথায় রেখেই ১৯৯৫ সালে সবুর খান ধানমন্ডির রাসেল স্কয়ারে বাংলাদেশের প্রথম কম্পিউটার সুপার স্টোর গড়ে তোলেন। আইটি শিল্পের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসাবে ড্যাফোডিল ১৯৯৬ সালে এর ওয়েবসাইট www.daffodil-bd.com চালু করে। বিদেশি প্রশিক্ষণ প্রদানের প্রতিষ্ঠানগুলো যখন এ দেশের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষার দখলে নিয়ে রেখেছে, তখন মাত্র ৭জন শিক্ষার্থী এবং ১৫টি কম্পিউটার ও যুক্তরাজ্যের এনসিসি’র অনুমোদন নিয়ে কম্পিউটার বিষয়ে আন্তর্জাতিক ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে ড্যাফোডিল। এটিই পরবর্তীতে পরিণত হয় আন্তর্জাতিক মানের ‘ড্যাফোডিল ইন্সটিটিউট অব আইটি’ নামক প্রতিষ্ঠানে। কেবল ব্যবসাই নয়, দেশের প্রতি টানও সবুর খানের শুরু থেকেই। আইটি পণ্য নিয়ে ব্যবসা শুরু করার পর তিনি দেখতে পান বাজারে কেবল বিদেশি ব্র্যান্ডের পিসির প্রাধান্য। এখান থেকেই দেশিয় ব্র্যান্ডের পিসির বাজার তৈরির লক্ষ্যে তিনি বাজারজাত শুরু করেন নিজস্ব ব্র্যান্ডের ‘ড্যাফোডিল পিসি’। বাজারে আসার পর এটিও সকলের নিকট আস্থা অর্জন করে। ব্যবসায়ী বা শিক্ষানুরাগীর বাইরে সবুর খানের আরেকটি বড় পরিচয় হচ্ছে তিনি একজন দক্ষ সংগঠক। দেশের আইটি খাতে নিজেকে একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছেন। এরই স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ দেশের শীর্ষস্থানীয় আইটি সংগঠন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি’র সাধারণ নির্বাচনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ আইটি অ্যাসোসিয়েশন (BITA)-এর সভাপতি, বেসিস, জাপানের অ্যাওটস (AOTS), এফবিসিসিআই, জেসিসি এবং এরকম আরও অনেক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি ASOCIO এবং WITSAতে পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভ করে এবং বিসিএস শো আন্তর্জাতিক মেলার মর্যাদা লাভ করেছে। সাংগঠনিক চিন্তা-চেতনায় তাই সবুর খান অনেক দূরদর্শী। ঢাকা চেম্বার নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকা চেম্বারের প্রায় ১৪,৫০০ সদস্য থাকা সত্ত্বেও এগুলো সক্রিয় নয়। অনেকে সদস্যপদ নবায়ন করে না। কম্পিউটার ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন সংগঠনে আমার সহকর্মীরা অবশ্য ইতোমধ্যেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে আমার আরেক সহকর্মী অ্যাসোসিও’র চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তাই আমি মনে করি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের সাথে আমরা আরও জোড়ালোভাবে কাজ করতে পারব। আমাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইটিনির্ভর হতে হবে। আমাদের রফতানির মধ্যে উত্স গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি পুরোপুরি আইটিনির্ভর হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে। আজকে একটি মোবাইল ফোনে ২,০০০ লোকের নাম, ছবি, জীবনবৃত্তান্তসহ ডাটাবেজ সংরক্ষণ করা যায়। এই বিষয়গুলোকে আমি অ্যাড্রেস করব। এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। ঢাকা চেম্বার্সেও তাই আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলব। ঢাকা চেম্বার সবসময়ই রাজনীতি থেকে মুক্ত ছিল, আগামীতেও থাকবে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থ নিয়ে সরকারকে বুঝানোর চেষ্টা করব। আমি দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথে আমার সাথে একটি ভালো টিমও কাজ করবে। টিম ছাড়া কাজ করা কঠিন। ঢাকা চেম্বারের মেয়াদকাল অনেক কম তাই স্বল্প সময়ে অনেক কাজ করার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। আমি গর্ববোধ করি আমার পূর্বেকার সভাপতিরা আমাকে সরাসরি গাইড করবেন। ঢাকা চেম্বারে অনেকগুলো সাব-কমিটি থাকে। তারা যাতে আরও বেশি কাজ করতে পারে এবং তড়িত্ সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার জন্য তত্পর থাকব। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইটি মতামত বাড়াতে ঢাকা চেম্বার উদ্যোগ গ্রহণ করব।’