পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের দালিলিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলার এজাহার প্রস্তুত করা হয়েছে। খসড়া এজাহারে তিন বিদেশিসহ নয়জনকে আসামি করা হচ্ছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গঠিত দুদকের অনুসন্ধান কমিটি গতকাল মঙ্গলবার মামলা দায়েরের সুপারিশসহ একটি খসড়া প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেয়। ওই খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে দুদক চেয়ারম্যানসহ দুদকের অনুসন্ধান দল গতকাল দুপুরে দুদক কার্যালয়ে বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে বৈঠক করে। বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার পর এই এজাহার প্রস্তুত করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, খসড়া এজাহারে আসামির তালিকায় রয়েছেন সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাবেক পরিচালক কাজী ফেরদৌস, ইপিসির ডিএমডি গোলাম মোস্তফা, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, কানাডিয়ান নাগরিক রমেশ শাহা, ইসমাইল এবং কেভেন ওয়ালিশ।
আজ বুধবার দুপুর তিনটায় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এ নিয়ে আবার বৈঠক করবে দুদক। বৈঠকে অভিযুক্তদের ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সম্মতি পেলেই দ্রুত থানায় এজাহার দায়ের করা হবে।
এ প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের অভিমতের সঙ্গে আমরা একমত হয়েছি। আমরাও ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পেয়েছি। দ্রুতই এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ ‘ষড়যন্ত্রে’ জড়িতদের তালিকায় কত জনের নাম রয়েছে—জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘দশজনের কম’।
দুদকের অনুসন্ধান কমিটির এই প্রতিবেদনের ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্ডস্টেইন গতকাল দুদকের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনুসন্ধানে কিছু অগ্রগতি দেখছি। বিশ্বব্যাংকের প্যানেল দুদকের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। বুধবার কমিশনের সঙ্গে আবার বৈঠকে বসবে বিশ্বব্যাংকের প্যানেল। এরপর একটি সমাধানে পৌঁছানো যাবে।’
এদিকে দুদকের আইন উপদেষ্টা এডভোকেট আনিসুল হক জানিয়েছেন, দেশের আইন অনুযায়ী দুর্নীতির ষড়যন্ত্রও ফৌজদারি অপরাধ। প্রতিবেদনে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। তাছাড়া অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের জন্য মামলার সুপারিশ করা হয়েছে। আজ দুপরের মধ্যেই এ প্রতিবেদনের মূল্যায়ন শেষ করা হবে।
দুদকের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন ও সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াসহ রমেশের ডায়েরিতে ঘুষের তালিকায় থাকা ৫ জনের মধ্যে চারজন এবং ওই তালিকায় নাম না থাকা কিন্তু ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত অপর ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, এজাহারে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ থাকলেও দালিলিক প্রমাণের উল্লেখ করা হয়নি। এজাহার প্রস্তুতের সময় বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ আমলে নেয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তৈরিকৃত এজাহারে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের কোন ধারায় মামলা দায়ের সম্ভব তার উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর সর্বপ্রথম কানাডীয় পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তকালে কানাডায় এসএনসি-লাভালিনের অফিস থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজকর্ম সংক্রান্ত একটি গোপন ডায়েরি জব্দ করে। ওই ডায়েরিতে ঘুষের টাকা দাবি সংক্রান্ত একটি তালিকা পাওয়া যায়। ওই তালিকায় প্রথমেই লেখা হয়, ‘দাবি অনুযায়ী তাদের কিছু দিতে হবে’। পরে সিরিয়াল অনুযায়ী কয়েকজনের নাম লেখা হয়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক রমেশ সাহার ডায়েরিতে দুর্নীতির তালিকায় প্রথমে সংক্ষিপ্তভাবে লেখা হয় তিন ব্যক্তির নাম। তারা হচ্ছেন তত্কালীন যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ও পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাবেক পরিচালক রফিকুল ইসলাম। এরপর সম্পূর্ণভাবে লেখা হয় সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী ও হুইপ নূরে আলম চৌধুরী লিটনের ভাই নিক্সন চৌধুরীর নাম। প্রথমে কানাডীয় পুলিশ তদন্তের কিছু তথ্য-উপাত্তসহ নামের তালিকাটি বিশ্বব্যাংকে পাঠায়। বিশ্বব্যাংক এরই মধ্যে ওই তালিকা দুদকে পাঠিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল এর আগে ঢাকা সফর করে যাওয়ার সময় দুদক কর্মকর্তাদের বেশ কিছু পরামর্শ দেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ইন্টিগ্রিটি এডভাইজার ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান ও সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনসহ আরো কয়েকজনকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজনীয়তা দেখান। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী দুদক সেসব ব্যক্তিদের পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করে। ওই জিজ্ঞাসাবাদে এসএনসি লাভালিনের বাংলাদেশের সাব-এজেন্ট গোলাম মোস্তফার সঙ্গে রমেশের যোগাযোগ থাকতে পারে বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান মশিউর রহমান। এরপর গোলাম মোস্তফাকে দুদকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য পাওয়া যায়। এরই ধারাবাহিকতায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াসহ পাঁচজনকে। মোশাররফ হোসেন জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর উপর দায়ভার ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানা যায়। এরপর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় আবুল হোসেন ও আবুল হাসানকে।
