প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতে জামায়াত যে হরতাল পালন করেছে তাতে সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, বিরোধী দলীয় নেত্রী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান না। নৈতিকভাবে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি চেয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত জোট বেঁধে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানোর জন্য মাঠে নেমেছে। তবে মানুষ হত্যা, গাড়ি পুড়িয়ে, পুলিশের ওপর হামলা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করা যাবে না। এ বিচারের জন্য দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে রায় দিয়েছে। মানুষ এ বিচারের পক্ষে। তাই যতোই চেষ্টা করা হোক বিচার হবেই।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গণভবনে ১৪ দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠকে ১৪ দলের শরিক নেতৃবৃন্দ বলেন, গণতন্ত্রকে নিরাপদে নিতে হলে সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদী ও যুদ্ধাপরাধীদের বাংলাদেশ থেকে চিরতরে নির্মূল করতে হবে। বিরোধী দলীয় নেত্রীকে জামায়াত ছাড়তে হবে, নইলে রাজনীতি থেকে বিদায় দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার রায়ের দিন বিএনপি হরতাল দিয়েছিল। কিন্তু খুনীদের তারা রক্ষা করতে পারেনি। তেমনি নৈরাজ্য সৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধীদেরও কেউ রক্ষা করতে পারবে না। শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়। কিন্তু পঁচাত্তরের পর জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেন। সাজাপ্রাপ্ত এবং বন্দি যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেন। তাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের নাগরিকত্ব দেন। এমপি-মন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বানান। আর তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের এমপি এবং পরে মন্ত্রী বানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছি। আর এ বিচার অত্যন্ত আন্তর্জাতিক মানের হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে আপিলের সুযোগ না থাকলেও আমাদের তা রাখা হয়েছে। বিচারের কাজ সঠিকভাবেই হচ্ছে।
তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম ও যুব সমাজসহ সমগ্র জনগণের দাবি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। আগে তো মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জাতি জানতে পারেনি। উল্টো ইতিহাস শেখানো হয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসলে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস হয়তো জানতেই পারতো না। বিদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শেখানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী চক্র একাত্তরের মতো আচরণ করছে। একাত্তরে তারা যা করেছিল এখন তাই করার চেষ্টা করছে। তবে সাধারণ জনগণ তাদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। তিনি বলেন, জামায়াত ’৭১ এ মানুষ হত্যা করেছে। তাদের শেষ আঘাত ছিল দেশের বুদ্ধিজীবীদের ওপর। আর এই জামায়াতের পক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছে। এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের বিভিন্ন সফলতা তুলে ধরে বলেন, এসব জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। তিনি ১৪ দলের নেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহবান জানান।
বৈঠকে শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করেন। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, গণআজাদী লীগের হাজী আবদুস সামাদ, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক নুরুর রহমান সেলিম, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ডা. অসিত বরণ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির জাকির হোসেন ও ন্যাপের এডভোকেট এনামুল হক।
রাশেদ খান মেনন বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নস্যাত্ করতে বিএনপি-জামায়াত মাঠে নেমেছে। তারা মরন কামড় দিচ্ছে। এজন্য সকল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ১৪ দল যেমন ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তেমনি এখনো ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।
দিলীপ বড়ুয়া বলেন, দেশে দু’টি রাজনৈতিক ধারা চলমান। একটি হলো অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। অন্যটি হলো মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক ধারা। আর এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন ১৮ দলের শরিক জামায়াত। তবে এই অপশক্তিকে হটাতে ১৪ দলসহ প্রগতিশীল সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই হবে। দেশে তৃতীয় শক্তি আসার কোন সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি।
হাসানুল হক ইনু বলেন, বাংলাদেশ একটা বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে। তাই আমাদের এখনই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গণতন্ত্রকে নিরাপদে নিতে হলে সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদী ও যুদ্ধাপরাধীদের চিরতরে নির্মুলের প্রয়োজন। এরা অতীতে সামরিক শক্তির আশ্রয়ে টিকে ছিল, আর এখন খালেদা জিয়ার প্রশ্রয়ে রয়েছে। সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদী ও যুদ্ধাপরাধী হলো খালেদা জিয়ার লাঠি। তাই লাঠি নির্মুল করতে হলে লাঠির মালিককেও নির্মুল করতে হবে। এজন্য খালেদা জিয়াকে বলতে হবে, জামায়াত ছাড়ুন, নইলে রাজনীতি থেকে বিদায় নিন।
এনামুল হক বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি দেশে নৈরাজ্য চালাচ্ছে। তাই আমাদের আদর্শিক দিকটা ঠিক রেখে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের সফলতা অনেক। তবে কিছু ব্যর্থতা জনগণকে ক্ষুব্ধ করছে।
নুরুর রহমান সেলিম বলেন, সরকারের প্রশাসনের মধ্যে বিএনপি-জামায়াতের যে প্রেতাত্মারা রয়েছে তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এরা চক্রান্ত করে বর্তমান সরকারের সফলতা নস্যাত্ করতে চায়। রামু ও বিডিআর বিদ্রোহে তাদের হাত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
হাজী আবদুস সামাদ বলেন, পাড়ায় পাড়ায় যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে হবে।
কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ডা. অসিত বরণ বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে একাত্তরের মতো গণজাগরণ সৃষ্টি করতে হবে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে বিজয় দিবস উদযাপনে গঠিত জাতীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ১৪ দলের প্রতিটি দল থেকে একজন নেতাকে বিজয় মঞ্চে বক্তব্য রাখার আহ্বান জানান। এ সময় সকল দল এ আহ্বানে সম্মতি জ্ঞাপন করে। বৈঠকে কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ডা. অসিত বরণ ধানের দাম বাড়ানোর তাগিদ দেন। এছাড়া ১৪ দলের শরিক নেতারা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
