গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ : চুয়াডাঙ্গা

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৩
ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ব্যতিরেকেই পাক হানাদার বাহিনীকে হটিয়ে ১৯৭১-এর ৭ ডিসেম্বর ভোররাতে চুয়াডাঙ্গা জেলা শত্রুমুক্ত করেছিল মুক্তিবাহিনী। ৯ মাসে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সংঘটিত শতাধিক যুদ্ধের মধ্যে কয়েকটি বিশেষ যুদ্ধের কথা বলবো আজ। একাত্তরের ৫ আগস্ট চুয়াডাঙ্গার ভারত সীমান্তঘেঁষা দামুড়হুদা উপজেলার জগন্নাথপুর-রতনপুর মাঠ এবং ৭ আগস্ট পার্শ্ববর্তী জীবননগর উপজেলার ধোপাখালী বাজারে সংঘটিত দুটি যুদ্ধে শহীদ হন তত্কালীন ৫ জন ইপিআর জোয়ানসহ মোট ১৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। জগন্নাথপুর-রতনপুর মাঠের যুদ্ধ ঃ একাত্তরের ৫ আগস্ট দুপুরে চুয়াডাঙ্গার ৮ জন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা দামুড়হুদার জগন্নাথপুর-রতনপুর মাঠের ১টি ধানক্ষেতে অবস্থান নেয়। লক্ষ্য ছিল পাকবাহিনীর ক্যাম্পে চোরাগোপ্তা হামলা চালানো। ঐ গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেয় চুয়াডাঙ্গার ৮ মুক্তিযোদ্ধা। এরা হলেন কেয়ামদ্দিন, হাসান জামান, আবুল কাশেম, রওশন, রবিউল ইসলাম রবি, আলাউল ইসলাম খোকন, আফাজ উদ্দিন ও তারেক রহমান। এদিকে রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে এলাকায় গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের গোপন খবরটি ত্বরিত জেনে যায় পাক সেনারা। তাত্ক্ষণিকভাবে পাক সৈন্যরা জগন্নাথপুর-রতনপুর মাঠে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানস্থল ঘেরাও করলে দুপক্ষের মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড যুদ্ধ। টানা পৌনে ৩ ঘণ্টার ঐ যুদ্ধে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে পাকবাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু গুলি ফুরিয়ে যাওয়ায় শহীদ হন ৮ মুক্তিযোদ্ধার সকলেই। শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের সহায়তায় পাক সৈন্যরা শহীদ ৮ মুক্তিযোদ্ধার লাশ টেনেহিঁচড়ে জগন্নাথপুর নামক স্থানে নিয়ে আসে এবং সেখানে বড় ২টি গর্ত করে শহীদ ৮ মুক্তিযোদ্ধার লাশ মাটি চাপা দেয়। পরে এলাকার নেতৃস্থানীয় লোকজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ গর্ত থেকে তুলে ইসলামী রীতিনীতি অনুযায়ী গোসল দেন এবং জানাজা শেষে জগন্নাথপুর গ্রামে দাফন করেন। পরবর্তীতে ৮ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ঐ কবরস্থানটিকে আগামী প্রজম্মের কাছে চিরস্মরণীয় করে রাখার প্রয়াসে বর্তমান চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে ঐ স্থানে নিজ উদ্যোগে একটি শহীদ স্মৃতিসৌধ ও একটি স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। ধোপাখালীর যুদ্ধ ঃ একাত্তরের ৭ আগস্ট চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী ধোপাখালী বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক হানাদার বাহিনীর প্রায় ২ ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখযুদ্ধ হয়। সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান (অবঃ) লেঃ জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে শহীদ হন ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। এরা হলেন তত্কালীন ইপিআর সদস্য হাবিলদার আব্দুল গফুর, নায়েক আব্দুল রশিদ, সিপাহী আবু বকর, সিপাহী আব্দুল আজিজ ও সিদ্দিক আলী। তত্কালীন সেনা সদস্য সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে সেদিন মুক্তিবাহিনীর একটি দল সেদিন ভোরে ধোপাখালী বাজারে পৌঁছান। লক্ষ্য পাকবাহিনীর ক্যাম্পে অতর্কিত আক্রমণ চালানো। ফজরের আজান শেষ হওয়ামাত্রই মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা পাকবাহিনীর ক্যাম্প লক্ষ্য করে চারদিক থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রায় ২ ঘণ্টাকাল উভয়পক্ষের তুমুল যুদ্ধে পাকবাহিনীর অনেক সৈন্য মারা যায়। এ অবস্থায় পাক বাহিনী যশোরের দিকে পালিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হলে এলাকার লোকজন ঘটনাস্থলে এসে শহীদ ৫ মুক্তিযোদ্ধার লাশ দাফন করে। এদিকে ঐ যুদ্ধে দলনেতা ক্যাপ্টেন মোস্তাফিজুর রহমান পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় সীমান্তরেখা পেরিয়ে ভারতীয় হাসপাতালে পৌঁছাতে সক্ষম হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যশোর সেনানিবাসের জিওসি থাকা অবস্থায় মেজর জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৯৪ সালের ২২ জানুয়ারি ধোপাখালী এসে শহীদ ৫ মুক্তিযোদ্ধার কবর জিয়ারত করেন এবং ঐ কবরস্থানটি বাঁধিয়ে দেন। চুয়াডাঙ্গা শহরে ধ্বংসযজ্ঞ ঃ চুয়াডাঙ্গা মুক্ত দিবসের ঠিক আগেরদিন একাত্তরের ৬ ডিসেম্বর বিকাল থেকেই হতোদ্যম পাকবাহিনীর সদস্যরা পায়ে হেঁটে সারিবদ্ধভাবে আলমডাঙ্গা ও মীরপুর হয়ে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দিকে চলে যেতে থাকে। এর আগে তারা শহর সংলগ্ন দৌলতদিয়াড় ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট, বর্তমানের ১০০ আসনের অব্যবহূত হাসপাতাল ভবন ও ইপিআর ক্যাম্প থেকে ছাউনি গুটিয়ে নেয়। মাগরিব নামাজের পর পরই পাক সেনাবাহিনীর ২টি ভিন্ন ভিন্ন টেকনিক্যাল টিম জেলা শহরের বিদ্যুত্ সরবরাহ কেন্দ্র ও বড়বাজারের শহীদ হাসান চত্বরের নিকটবর্তী মাথাভাঙ্গা ব্রিজে পৌঁছে কয়েকটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ও ব্রিজের পূর্বপাশের একটি আরসিসি স্প্যানে শক্তিশালী মাইন বসিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেগুলো ধ্বংস করে দেয়। একই সময়ে পাক সেনাবাহিনীর অপর একটি টেকনিক্যাল টিম হাসপাতাল ভবনে তাদের রক্ষিত গোলাবারুদ ও খাদ্য ভর্তি গুদামগুলোতে গান পাউডার সেপ্র করে আগুন লাগিয়ে দেয়। ৬ ডিসেম্বর সারারাত ধরে গোলাবারুদ বিস্ফোরণের বিকট শব্দে শহরে ভয়ার্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডারের বক্তব্য ঃ চুয়াডাঙ্গা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার নূরুল ইসলাম মালিক ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের মধ্যে মত ও আদর্শের ভিন্নতা থাকলেও এই মুহূর্তে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ সম্পন্ন করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের কাজটি এখনও অসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, একটি দেশ ও জাতির মর্যাদার প্রশ্নে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি ও যুক্তিযুক্ত। এছাড়া তিনি দুঃস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতার হার বৃদ্ধির জোর দাবি জানান।