পুরুষবেশে যুদ্ধ করেছি

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৮
আমি তখন পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী ও পাবনা জেলা মহিলা পরিষদের আহ্বায়ক কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদিকা। আমার আম্মা সেলিনা বানু বামপন্থি আন্দোলনের প্রথম সারির একজন নেত্রী ছিলেন। আমার নানাবাড়ি ছিল এককালে বাম-পন্থিদের শক্ত ঘাঁটি। সুতরাং এই বাড়ির সবাই আমরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলাম। মার্চের সেই দিনগুলোতে রাজনৈতিক উত্তপ্ততায় বাইরের অঙ্গন ও গৃহের প্রাঙ্গণ এক হয়ে পড়েছিল। আমাদের মানসিকতা ছিল ‘মেরে মর’। আমার মাত্র আধ ঘণ্টা লেগেছিল গুলি চালানো শিখতে। সে ছিল এক অদ্ভুত দিন। আমার দুই ভাই (কাজিন) জিন্দান ও জিঞ্জির যুদ্ধক্ষেত্রে রওনা হলো তাদের মা রাকিবা বেগমের নির্দেশে। এখানে এই মহিলার কথা না বললেই নয়, তার মুখের কথা তার সন্তানদের যুদ্ধকালে সাহস যুগিয়েছে। তিনি বলেছেন, তোমাদের কি মানুষ করেছি ঘরে থেকে অসহায়ভাবে মরার জন্য—যুদ্ধ করতে করতে মরো। কখনও পিঠে হুলি খেয়ো না। তার এক ছেলে তখন অসুস্থ ছিল। তিনি তাকে বলেছেন, গামছা শক্ত করে কোমরে বাঁধ, তাতে তোমার সুবিধা হবে। তিনি ছিলেন পাবনা মহিলা পরিষদের আহ্বায়ক কমিটির সভানেত্রী। এমন পরিস্থিতিতে আমার ঘরে থাকাটা কষ্টকর ছিল। আমার ভাই জিঞ্জর বলল, বুজি—প্রীতিলতার মতো তুমিও পারো ছেলের পোশাক পরে যুদ্ধে যেতে। কথাটা আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। আমার বড় খালাম্মা রাফিয়া বানু আমার প্যান্ট-শার্ট পরা মূর্তি দেখে বললেন, হ্যাঁ—এখন তুমি নিশ্চিন্তে যুদ্ধে যেতে পারো। ২৮ মার্চ টেলিফোন একচেঞ্জে দখলরত ৩৬ জন পাকবাহিনীর সদস্যদের সাথে যুদ্ধ হয়। সেখানে জনতার সাথে আমি একজন। এখানে ৩৬ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং আমাদের ২ জন শহীদ হন। খণ্ড খণ্ডভাবে যুদ্ধ চলে ৩০ মার্চ পাবনা শহর স্বাধীন হয়। ৩১ মার্চ সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয় সর্বদলীয়ভাবে। পাবনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে স্থাপিত হয় কনট্রোল রুম। এই কনট্রোল রুমের আওতায় বিভিন্ন কাজ সমন্বয়ের জন্য কোর কমিটি গঠন হয়। তার অন্যতম সদস্য ছিলেন আমিনুল ইসলাম বাদশা। তিনি আমাকে জানতেন। তিনিই জেলা প্রশাসককে আমার ছদ্মবেশে কাজ করার কথা জানিয়ে ছিলেন। যদিও আমি বিভিন্ন কাজে কনট্রোল রুমের আওতায় কাজ করছিলাম—কিন্তু তিনি আমাকে চিনতেন না। তখন যুদ্ধ চলছিল নগরবাড়ীঘাট, আতাইকুলা ও কাশীনাথপুরে। পাকবাহিনীর আক্রমণ শুরু হয় আকাশ পথে। এখানে তখন যুদ্ধ চলছিল। কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ছে—বিভিন্ন দল আরো পিছিয়ে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গার দিকে। পাবনার একজন ছাত্রনেতা ইকবালের দল এক গাড়িতে করে কুষ্টিয়া হতে চুয়াডাঙ্গার দিকে রওনা হলো। আমি ও আমার এক ভাই গাড়িতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় থেকে যায় কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়ার এই ক্যাম্পে আবার দেখা হয় রাজনৈতিক নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশার সাথে। তিনিসহ দুইজন ভারতীয় সাংবাদিকের সাথে তাদের জিপে করে চুয়াডাঙ্গার ক্যাম্পে হাজির হই আমরা। এখানে দেখা হলো আব্দুল কুদ্দুস মাখন ও নূরে আলম সিদ্দীকীর সাথে। এখানে এসে জানতে পারি—পাবনায় যে সাংবাদিকের সাথে সাক্ষাত্ হয়েছিল, তিনি আমার ছবিসহ সাক্ষাত্কার ছেপে দেন বিভিন্ন পত্রিকায়। তাই ছেলে হিসেবে যুদ্ধ করার যে সুযোগ ছিল—তা আর আমি পেলাম না। আমাদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় অবশেষে ৩৬ জন মহিলা ও তরুণী নিয়ে আমাদের ক্যাম্প শুরু হয়। তারপর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের শেষে দেশে ফেরার পালা—সেই ক্যাম্পের সহযোদ্ধাদের অনেকের সাথে আর দেখা হয়নি। জানি না কোথায় আছে বিভা সরকার, তুষার কন্যা, নাজমা, মাজেদা, লায়লা, তৃপ্তি, সন্ধ্যা, গীতা, শাহীন, মুক্তি, ইরা, গীতা (২), সালমা, জোবেদা, মীরা, কমলা, জিনাত, যুথিকা, মনিকা, ভক্তিসহ আরো অনেকে—যাদের নাম হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে। তবে আজও কানে ভাসে আমাদের সবার সেই শব্দ, সমবেত সঙ্গীত—আমরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি...’। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের অবস্থায় বসে ভাবি—সেই সহযোদ্ধা আল্লাহ রাখার কথা, সাথী, চুমু অনেকের কথা। ভাবি কুষ্টিয়ার পথে রাত্রে দেখা সেই ভাইদের কথা, আর সেই বৃদ্ধ পিতার কথা। যিনি আমাকে দলের সাথে ছেলের পোশাক পরা মেয়ে যোদ্ধা জেনে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, আর আমাদের ভয় নেই; আমাদের মেয়েরা যেখানে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে নেমেছে, আমাদের আর কেউই দমাতে পারবে না। সেই পিতার কথা আজও আমার কানে বাজে আর সাহস জোগায়। এমনভাবে বাংলাদেশের মানুষের আছে অশেষ প্রাণশক্তি যাকে আবাহন করতে পারলে কোন সমস্যাই আর থাকে না। প্রয়োজন শুধু সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ফিরিয়ে এনে প্রাণের আবাহন করার। লেখক:উন্নয়ন কর্মী