৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা মুক্ত দিবস। সাতক্ষীরাকে হানাদারমুক্ত করতে সাতক্ষীরাবাসীকে অন্তত ৫০টি যুদ্ধের মোকাবেলা করতে হয়েছিল। এসব যুদ্ধের মধ্যে ভোমরার যুদ্ধ, বৈকারী যুদ্ধ, খানজিয়া যুদ্ধ, টাউন শ্রীপুর যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য।
শুরুটা যেভাবে: ৯ম আর ৮ম সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সাতক্ষীরার ভোমরায় স্থাপিত হয় প্রথম ক্যাম্প। এখানে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল তত্কালীন ই.পি.আর-এর সহযোগিতায়। আর এখানেই ২৯ এপ্রিল পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। দীর্ঘ ১৭ ঘন্টা উভয়পক্ষের গোলাগুলি বিনিময়ে পাক বাহিনী হারিয়েছিল তাদের কয়েকজন সেনাকে। শহীদ হয়েছিল তিন মুক্তিযোদ্ধা।
পাক বাহিনীর অন্যতম সহযোগী মহকুমা হাকিম খালেদ মাহমুদকে গ্রেফতার, তার অফিসের পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে অগ্নিসংযোগ এবং বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন, ট্রেজারী থেকে অস্ত্র আর ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহসহ মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে শেষ দিনটি পর্যন্ত সাতক্ষীরার বীর সন্তানরা রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা। এই সেক্টরে যুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী, সালাম, হাবলু , কামরুল ইসলাম খান, এনামুল, গনি, রশিদ, আজিবর, খসরু, মোস্তাফিজ, হাসনে জাহিদ জজ, মুজিবর আ.স.ম. বাবুর আলিসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা।
বধ্যভূমি ও গণকবর: ভোমরা যুদ্ধের পর থেকে একে একে জেলার বিভিন্ন স্থানে চলতে থাকে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধ। এই যুদ্ধে শহীদ হন ৩৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সে সময় পাক হানাদার বাহিনী সাতক্ষীরা বালক বিদ্যালয় ভবনে অবস্থান নেয়া প্রায় তিনশ শরণার্থীকে নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যার পর স্কুলের পেছনের দিনেশ কর্মকারের বাড়ির পাশে গর্ত খুড়ে তাদেরকে মাটি চাপা দেয়। অনেককে জীবন্তও পুঁতে ফেলা হয়। শিশুদের ফেলে দেয়া হয় পাশের পুকুরে। সাতক্ষীরার আলিপুর, মাহমুদপুর, বাঁকাল, বিনেরপোতা, ঝাউডাঙ্গা, গোপিনাথপুর, তালার পার কুমিরা, পাটকেলঘাটা, কলারোয়ার বোয়ালিয়া চন্দনপুর, বলফিল্ডের পাশে, পালপাড়া, শ্যামনগরের গোপালপুর, দেবহাটার কুলিয়াসহ অনেক এলাকায় এমন বধ্যভূমি ও গণকবর রয়েছে যেগুলো আজও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। অনেক বধ্যভূমি এখন আর চেনার উপায় নেই।
কলারোয়া যুদ্ধ: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকহানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ৮/১০ টি সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছিল কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। এ সময় পাকিস্তানী সেনারা নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে কলারোয়াকে পরিণত করেছিল মৃত্যু উপত্যকায়। গণহত্যার পর মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের লাশ মাটিতে পুঁতে রাখে পাকহানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসররা। ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল কলারোয়ার আবুল কাশেমের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি কলারোয়া থানার ওসির কক্ষে বসে গোপনে বৈঠক করে শান্তি বাহিনী গঠনের পর নাভারন থেকে পাক হানাদারদের ডেকে আনে। ঐ রাতে তারা মাহমুদপুর গোবিন্দকাটী মাঠে আফসার আলী নামে একজনকে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করে। কলারোয়া ফুটবল মাঠের পূর্বপাশে নীলকরদের অফিস যেটা পোষ্ট অফিস হিসাবে ব্যবহূত হতো সেখানে টর্চার সেল তৈরি করেছিল পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা ।
১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল পাকহানাদার ও তাদের দোসররা কলারোয়া পৌর সদরের উত্তর মুরারীকাটি পালাপাড়ায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছিল ৯ বঙ্গসন্তানকে। পরে রক্তাক্ত সেইসব মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। সেদিন নিহত হন, বৈদ্যনাথ পাল, নিতাই পাল, বিমল পাল, সতীশ পাল, রামপাল, গাটু পাল, অনিল পাল, গোপাল পাল ও রঞ্জন পাল। উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা বাজারের গণকবরে শায়িত রয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ, জাকারিয়া ও ইমদাদুলসহ ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা।
শ্যামনগর গণহত্যা: ১৯৭১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩টার দিকে সুন্দরবন উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার হরিনগর সিংহড়তলী গ্রামে রাজাকার আলবদরদের সহযোগিতায় পাকবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় ৩৩জন নিরীহ বাঙালি। পাকবাহিনী ঐ গ্রামের খগেন , নিলম্বর, অজিত, জিতেন, সুরেন্দ্র, রামেশ্বর, কালিপদ, কার্তিক, হরেন্দ্রনাথ খগেন্দ্রনাথ, মহাদেব, ডা. বিহারি লাল, অধির, বিপনি মন্ডল, ধীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, আব্দুল বারী সানা, সৈয়দ গাজী, আদম গাজী, দাউদ গাজীসহ ৩৩ জনকে ধরে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের উত্তর পাশে একটি নদীর চরে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের ওপর ব্রাশফায়ার করে। এতে তাত্ক্ষণিকভাবে মারা যান ২৫ জন। ৮ জন ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও কয়েকদিন পর তারা বিনা চিকিত্সায় মারা যান।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা: স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হন সাতক্ষীরার বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজল, খোকন, নাজমুল, হাফিজউদ্দিন, নুর মোহাম্মদ, আবু বকর, ইমদাদুল হক, জাকারিয়া, শাহাদাত হোসেন, আব্দুর রহমান, আমিনউদ্দিন গাজী, আবুল কালাম আজাদ, সুশীল কুমার, লোকমান হোসেন, আব্দুল ওহাব, দাউদ আলী, সামছুদ্দোহা খান, মুনসুর আলী, রুহুল আমীন, জবেদ আলী, শেখ হারুনার রশিদ প্রমুখ।
মুক্তিযোদ্ধার কথা: সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আগরদাড়ি ইউনিয়নের নেবাখালি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ভ্যানচালক মো. আতিয়ার রহমান (৬২) ১৯৭১-এ কাকডাঙ্গা তলুইগাছা ও লক্ষিদাড়ি সীমান্তে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তিনি জানান, যুদ্ধ করেছি দেশ স্বাধীন করার জন্য কিছু পাওয়ার জন্য নয়। বর্তমানে অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। টাকা-পয়সার অভাবে ছেলেদের লেখাপড়া শেখাতে পারিনি। মায়ের সামান্য ভিটায় স্ত্রী, ৪ ছেলে, ছেলের বৌ ও নাতি-নাতনীদের নিয়ে অতিকষ্টে দিন কাটাচ্ছি। বর্তমান সরকার যদি আমাকে একটু পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে তাহলে শেষ বয়সে ছেলে, বৌদের একটা স্থায়ী ঠিকানা করে দিয়ে যেতে পারতাম। এটাই আমার সরকারের কাছে দাবি।
