ষড়যন্ত্রমূলক যোগাযোগ ও সন্দেহজনক আচরণের দায়ে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও এসএনসি লাভালিনের লবিস্ট সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল। বিশ্বব্যাংকের এ সুপারিশ গ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক থেকে বলা হয়েছে, এই দুইজনের বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের জন্য যথেষ্ট উপাদান অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
দুদক পদ্মা সেতু প্রকল্পের সরকারি কর্মকর্তা এবং তিন বিদেশির বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের প্রস্তাব করে। এজাহার দায়েরের পর তদন্তে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জড়িত থাকার যথেষ্ট উপাদান পাওয়া গেলে অভিযোগপত্রে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দেয় দুদক। কিন্তু বিশ্বব্যাংক প্যানেল এজাহারেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে অনড় থাকে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা তর্ক-বিতর্ক হয়। একপর্যায়ে বৈঠকশেষে চলে যায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল। এদিকে আগামী রবিবার দুদকের বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে এজাহার দায়ের করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছাড়াই এজাহার দাখিল করা হচ্ছে। এছাড়া পদ্মা সেতু দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুদকের প্রাপ্ত সকল তথ্য এবং ৩১ জনের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। গত ২ ও ৪ ডিসেম্বর দুদকের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক প্যানেল তিন দফা বৈঠক করে। বৈঠকে অনুসন্ধান দলের প্রতিবেদন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬ ও পরামর্শক নিয়োগ সংক্রান্ত দরপত্রের কার্যক্রম, দণ্ডবিধি আইন দীর্ঘ আলোচনা হয়। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে যে ৩১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, তাদের বক্তব্য এবং বিশ্বব্যাংকের দেয়া কয়েকটি নথিপত্রের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়। এদের মধ্যে কাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির কোন আইনে মামলা করা যায় তারও বর্ণনা ছিল। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাবেক পরিচালক কাজী ফেরদৌস, ইপিসির ডিএমডি গোলাম মোস্তফা, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, নিক্সন চৌধুরী, কানাডিয়ান নাগরিক রমেশ শাহা, মোহাম্মদ ইসমাইল এবং কেভেন ওয়ালিশের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়। বৈঠকে দুদক থেকে তিন বিদেশিসহ পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা যায় বলে প্যানেলকে জানানো হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক প্যানেল থেকে বলা হয়, তিন বিদেশির বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করা হলে আইনগত জটিলতা তৈরি হবে। তারা বাংলাদেশের নাগরিক নয়, তাছাড়া তাদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগে কানাডার আদালতে মামলা রয়েছে। প্যানেলের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী আবুল হোসেন এবং আবুল হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক যোগাযোগ এবং সন্দেহজনক আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে কারণে তাদের বিরুদ্ধে দুদক এজাহার দায়ের করতে পারে। কিন্তু দুদকের কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এবং আইন উপদেষ্টা এডভোকেট আনিসুল হক বলেন, তাদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করার মত যথেষ্ট উপাদান এখনো আমরা পাইনি। জবাবে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দলের প্রধান ওকাম্পো বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের লবিস্টের সঙ্গে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেন বৈঠক করেছেন। এসএনসি লাভালিনের দুই কর্মকর্তা রমেশ ও ইসমাইলের সঙ্গেও কয়েক দফা বৈঠক করেছেন আবুল হোসেন। রমেশের ডায়েরিতেও কাকে কাকে ঘুষের টাকা দিতে হবে তারও বর্ণনা রয়েছে। পরামর্শক নিয়োগের জন্য চারবার মূল্যায়ন কমিটি পরিবর্তন করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফা কমিটি গঠনের ১৯ দিনের মাথায় তৃতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এজাহার দায়ের করার জন্য এগুলো যথেষ্ট উপাদান।
জবাবে দুদকের কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, একজনের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে কি লেখা রয়েছে শুধুমাত্র তা দিয়ে যে কারো বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যায় না। আমাদের দেশের আইন এটা অনুমোদন করে না এবং আদালতে টিকবে না। ওকাম্পো বলেন, আপনারা এজাহার দায়ের করে তদন্ত শুরু করেন, যথেষ্ট উপাদান না পেলে অভিযোগপত্র থেকে নাম বাদ দেয়ার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি যদি বিবেচনা করেন, পদ্মা সেতুর ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সেটি সহায়ক হবে। জবাবে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, পদ্মা সেতুর অর্থায়ন আমাদের উদ্বেগের বিষয় নয়। এটি সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ব্যাপার। আমরা তদন্ত করছি দেশের আইন কানুন ও বিধি বিধান অনুযায়ী। কোন এজাহার দায়েরের আগে আদালতের কাছে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে কিনা তা বিবেচনায় নিতে হয়। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা তর্ক-বিতর্ক হয়। শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক ছেড়ে চলে যায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল। তবে যাওয়ার আগে প্যানেল দুদককে আরো অনুসন্ধানের পরামর্শ দেয়। দুদক থেকে জানানো হয়, এজাহার দায়েরের পর আইনগতভাবে তদন্ত শুরু হবে। বিশ্বব্যাংকের যেসব পরামর্শ রয়েছে সেগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
এ ব্যাপারে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, আমাদের কিছু কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। এটা শেষ করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কি কাজ অসমাপ্ত রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল আমাদের কিছু মতামত দিয়েছে। ওই মতামতের ভিত্তিতে আমরা নতুন করে পুরো বিষয়কে পর্যালোচনা করবো। তিনি জানান, বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাদের ভিউ তুলে ধরেছে, আমরা আমাদের ভিউ তুলে ধরেছি। আমাদের দেশের আইন-কানুন অনুযায়ী অনুসন্ধান রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দুই-এক দিনের মধ্যেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবুল হোসেন ও আবুল হাসান চৌধুরী এবং নিক্সন চৌধুরীকে বাদ দিয়েই এজাহার দাখিল করা হচ্ছে। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে দুদক অনানুষ্ঠানিক ভাবে সরকারের নীতি নির্ধারকদের পরামর্শ নেবে। এ প্রসঙ্গে গতকাল ইত্তেফাককে দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের আইন কানুন ও বিধি বিধান অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি। পদ্মা সেতু দুর্নীতি তদন্তের তথ্য উপাত্ত প্রকাশ করার ব্যাপারে দুদকের আইনজীবী আনিসুল হক বলেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়ে জনমনে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সেটা দূর করতে সকল তথ্য প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে তা প্রকাশ করা হবে।
