এমন কোনো সময় ছাদে গিয়েছেন কি যখন আকাশ মেঘে ঢাকা থাকে তবুও বৃষ্টি হয় না... যখন চারদিকে অনেক বাতাস বয় কিন্তু ঝড় হয় না... কখনো গিয়েছেন কি? যদি না গিয়ে থাকেন তাহলে বলি এমন কোনো মুহূর্ত এলে মিস করবেন না প্লিজ। কেননা এই অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশেই অনুভূত হয় নিজের অস্তিত্ব—বেঁচে আছি নিজের সত্তা নিয়ে বেঁচে আছি নিজের অস্তিত্ব নিয়ে এমন গর্বে বুক ফুলে উঠে। নিজের সত্তা নিজের অস্তিত্ত্বকে জানতে হলে জানতে হবে নিজের গল্প, খুঁজতে হবে নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতির নির্মাণের ইতিহাস। কেননা ইতিহাসই বলে দেয় পথিকের পথের বৃত্তান্ত। এ নিয়েই আমাদের এবারের আলোচনায় রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেনআশীষ সেনগুপ্ত
সকাল দশটায় পরীক্ষা শুরু হবে শশীর। কোনো টার্ম পরীক্ষা নয়, কেবল ক্লাস টেস্ট। কিন্তু এই ক্লাস টেস্ট বা সিটি’র মার্ক যোগ হবে ফাইনালের সাথে, তাই শশীর চিন্তার অন্ত নেই। শুধু কি তাই, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার শেষ তারিখও আজকে। গত রাতে তিনটা পর্যন্ত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করেছে সে। এরপর বাকি রাত ঘুম হয়নি বললেই চলে। কোনো রকম বিছানায় গড়াগড়ি আর কি। সকালবেলা বিছানা ছেড়ে উঠেই রেডি হলো কলেজে যাওয়ার জন্য। সবকিছু গোছগাছ করে যখন দেখল রাত জেগে করা অ্যাসাইনমেন্ট ফাইলটি টেবিলে নেই, তখনই মেজাজটা গেল বিগড়ে। আহা রে...!!
এই পরিস্থিতিটি কি চেনা চেনা লাগছে না? ভালো করে দেখুন এমন ঘটনা আপনার দৈনন্দিন জীবন যাপনে কতবার ঘটেছে। একবিংশ শতাব্দীর এই বিশ্বায়নের যুগে, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা প্রায়শই তাল হারিয়ে বেতাল হয়ে পড়ি। কখনও মনে হয় সবকিছুর ডেডলাইন মেইনটেন করাই যেন আমাদের একমাত্র ব্রত। কোনোভাবে যদি এই ইঁদুর দৌড়ে কেউ পিছিয়ে পড়ে, তখনই তাকে গ্রাস করে নেয় একরাশ হতাশা আর বিষণ্নতা। আর এই হতাশা তৈরি হয় মূলত নিজের প্রতি উদাসীনতা থেকেই, নিজেকে না জানার কারণেই। কখনও কী নিজেকে প্রশ্ন করেছেন আপনি কে? আপনার বেড়ে ওঠার বৃত্তান্ত কী? আপনার জীবনের লক্ষ্য কী? হয়তো ভাবেননি। শুধুমাত্র যাপন করার জন্যই যদি আপনার জীবন কেটে যায় তবে একবার ভাবুন তো এর ফলাফল কী? আসলে এর কোনো ফলাফল নেই। কেননা প্রতিটি জীবনেরই কিছু লক্ষ্য থাকে, কিছু সাফল্য থাকে, এগিয়ে চলার মন্ত্রণা থাকে। সবকিছু মিলিয়েই কিন্তু একটি স্বাভাবিক সফল জীবন হয়। এ জন্য প্রথমেই আবিষ্কার করতে হবে নিজেকে, জানতে হবে নিজের ইতিহাস। কার্ল মার্কস লিখছেন, ‘মানুষ তার নিজের ইতিহাস নিজে তৈরি করে, কিন্তু তারা নিজের ইচ্ছামতো তা করে না, তারা তাদের পছন্দের পরিস্থিতিতেও তা তৈরি করতে পারে না, কিন্তু অতীতের পরিস্থিতির প্রবাহেই তারা ইতিহাস গড়ে তোলে।’ সক্রেটিসও বলে গেছেন, ‘নিজেকে জানো।’ মূলত নিজেকে না জানলে নিজের মাঝে দেখা মেলে না মূল্যবোধের চিত্র তাই প্রথমেই জানতে হবে ইতিহাসটা। পরক্ষণে মনে হয়তো প্রশ্ন আসে, ‘আমার আবার কিসের ইতিহাস?’ আছে আপনারও ইতিহাস আছে। আমি আপনি আমরা সবাই ইতিহাস রচয়িতা। মূলত আমাদের বেড়ে উঠাই একটি ইতিহাস। আপনার গতি-প্রকৃতি, চারিত্রিক গুণাবলি সব মিলিয়েই প্রথমে আপনি মানুষ দ্বিতীয়ত সামাজিক প্রাণী। সে ক্ষেত্রে আপনার পরিবারই হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এটি সমাজের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অথচ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সে ক্ষেত্রে জানতে হবে আপনার পরিবারের সকল ব্যবস্থা, পরিবারের ক্রমবিকাশ ঐতিহ্য প্রথা। সব মিলিয়ে আপনার পরিবারের মূল্যবোধ। মূলত একটি অসামাজিক অবোধ শিশুকে পরিবারই সামাজিক করে তোলে। তাকে জানিয়ে দেয় সমাজের যাবতীয় নিয়মকানুন, সমাজের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্যসমূহ। পরিবারেই রয়েছে আপনার মূল তথ্য-উপাত্ত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের উত্তরণ এভাবেই প্রবাহিত হয়।
সঠিক আচরণ বলতে আমরা কী বুঝি? যা আপনার জন্যও ভালো এবং সবার জন্যও ভালো, মানে সার্বজনীন। একে বলা যায় ‘আম’ বা ‘সাধারণ’। যেমন কোনো একটা বিষয়কে আপনি খুব ভালো মনে করেন এবং আপনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। আবার কোনো বিষয়কে আপনি খারাপ মনে করেন এবং মনে-প্রাণে ঘৃণা করেন। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে সাধারণ অনেকের সাথে আপনার মতের মিল হতে পারে আবার না-ও হতে পারে। কিন্তু সার্বিক বিচার না করে নিজের মতামত পোষণ করে যাওয়া এবং নিজের মতামতের উপর যুক্তি দাঁড় করানো, এটা ভালো হতে পারে কিন্তু সঠিক নয়। সঠিক তখনই হবে যখন আপনি উক্ত বিষয় সম্পর্কে ভালোভাবে জানবেন এবং কেউ জানতে চাইলে আলোচনা করবেন, সবাই মিলে একটি যুক্তিনির্ভর সমাধান খুঁজে বের করবেন এবং এর মাধ্যমেই গড়ে উঠে সমাজব্যবস্থা। সমাজ মূলত এমন এক ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে একাধিক চরিত্র একত্রে কিছু নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করে একত্রে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলে। আপনি যেহেতু সমাজবদ্ধ মানুষ সেহেতু আপনার সমাজিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার জানার পরিধিটা বাড়ানো মূলত আপনার সামাজিক দায়িত্বের মধ্যেই পরে। তাই জানতে হবে আপনার সামাজিক অবকাঠামো গড়ে উঠার মূল ইতিহাস।
একটি সমাজের ভিত গড়ে উঠে মূলত একটি সভ্য সংস্কৃতিক বলয়ে। একটি জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক জীবনযাত্রা বা জীবনযাত্রার উপাদানই সংস্কৃতি। একসময় দেশে সতীদাহ প্রথা ছিল। এটা ছিল সংস্কৃতির নেতিবাচক চর্চা। আবার সে সময় বাঙালি মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রহণ করতে রাজি ছিল না। পরে দেখল, এ শিক্ষা গ্রহণ না করার ফলে তারা পিছিয়ে যাচ্ছে, সামাজিকভাবে এগোতে পারছে না। তখন তারা এ শিক্ষা গ্রহণ করা শুরু করল। এটা হলো সংস্কৃতির গ্রহণ, আর সতীদাহ প্রথা বন্ধকরণ হলো সংস্কৃতির বর্জন। সংস্কৃতিই একজন মানুষকে সভ্য করে তোলে। যেমন ’৭১-এ ছোট একটি স্লোগান মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু পাল্টে দিয়েছিল, পালটে দিয়েছিল তখনকার মানুষগুলোর চিন্তা-চেতনা। নয় মাস পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস অত্যাচার, বিশ্বাসঘাতক রাজাকার আলবদরদের পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা, দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা সবকিছু যেন এক ফুত্কারে উড়ে গেল। এটাই হচ্ছে সংস্কৃতির পালাবদল। এভাবেই গড়ে উঠে আমাদের দেশ, আমাদের মানচিত্র, একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নিশ্চয়তা। বর্তমান তারুণ্য এ বিজয়ের ফলাফল ততক্ষণ না পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারবে যতক্ষণ না পর্যন্ত এই বিজয়ের সম্পূর্ণ ইতিহাস তার নখদর্পনে থাকে। ইতিহাসই মানুষের মাঝে উপলব্ধি গড়ে তোলে ইতিহাসই মানুষকে বলে দেয় পথিক পথ এই দিকে।
আমাদের সামনে আজ স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট। এখন যদি বলা হয়, সব কিছু বাদ দিয়ে করতোয়া বা বুড়িগঙ্গা নদী, মানুষ, গাছ, পাখি দেখুন। সবাই কি এসব দেখবে? এখন হয়তো আগের সেই বুড়িগঙ্গা নেই হয়তো বুড়িগঙ্গার জলে হাত দিলেই অনুভূতিটা অন্য রকম কোনো পর্যায়ে পৌঁছাবে না। কিন্তু তাই বলে কী বুড়িগঙ্গায়ই আর যাবেন না, আপনাকে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে যেতে হবে, খুঁজতে হবে তার উত্পত্তি স্থল, জানতে হবে তার অতীত ইতিহাস সর্বোপরি বুঝতে হবে তার বর্তমান এই পরিবর্তনটাকে। একসময় করতোয়া নদী ছিল প্রমত্তা, দুই কূল প্লাবিত করে বন্যা হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই করতোয়া নদীতে এখন দুটি নৌকা পাশাপাশি চলতে পারে না। করতোয়ার ইতিহাস না জানা অবস্থায় আপনার স্বপ্নে হয়তো সেই করতোয়া নদীর চিত্র ধরা দেবে না। কিন্তু তাই বলে যদি বলা হয় এটা মূল্যবোধের অভাব তাহলে সেটা ঠিক হবে না। আপনার ভেতরে চিন্তার জায়গা তৈরি করতে হবে যে, এই নদীটা আমার। এই নদীকে বাঁচাতে হবে আমাকেই আর আমাকেই ভালোবাসতে হবে।
