ট্যানারি দূষণে বিপর্যস্ত হাজারিবাগ

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:২৮
সাইফুল ইসলাম ফরহাদ ট্যানারি বর্জ্যে ঘটে সর্বগ্রাসী দূষণ। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে যে সব রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয় তা মাটি,পানি ও বাতাস— এই তিন মাধ্যমকেই বিষাক্ত করে দেয়। তাই ট্যানারি-বর্জ্যকে বলা হয় দূষণের রাজা। পরিবেশ অধিদপ্তর ট্যানারিশিল্পকে সর্বাধিক দূষিত শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ট্যানারির কারণে হাজারীবাগের মাটি ও বায়ু ভয়াবহ দূষণের শিকার। বুড়িগঙ্গা দূষণে হাজারিবাগের ট্যানারি বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। কারণ ট্যানারির নর্দমার দূষিত পানি কোনো রকম শোধন ছাড়াই সরাসরি নদীতে যায়। বাংলাদেশে ১৯৪০ সালে নারায়ণগঞ্জে প্রথম ট্যানারি স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ট্যানারিটি স্থানান্তর করা হয় ঢাকার হাজারিবাগে। এই ট্যানারিকে কেন্দ্র করেই হাজারিবাগ এলাকায় অনেকগুলো ট্যানারি গড়ে উঠেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় আড়াই শ ট্যানারি ইউনিট রয়েছে যার শতকরা ৯০ ভাগই ঢাকার হাজারিবাগে অবস্থিত। হাজারিবাগ ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। হাজারিবাগে ২৫ হেক্টর জমির ওপর ২৪০টি ট্যানারি ইউনিট রয়েছে। বেশিরভাগ ট্যানারির বয়স ৩০-৩৫ বছর। এলাকাটি এখন ট্যানারি এলাকা হিসেবে সুপরিচিত। প্রতি বছর ২৪০ মিলিয়ন ডলারের চামড়া বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ৭০টি দেশে রপ্তানি হয়। তবে বেশিরভাগ চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইটালি, জার্মানি, স্পেন এবং আমেরিকায় হয়। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন সালফাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, ক্লোরিন, ক্রোমিয়াম,ফরমিক অ্যাসিড, সালফিউরিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড ও ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড ব্যবহার করা হয়। এসব বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা নেই একটি কারখানাতেও। তাই তা ছড়ায় বাতাসে, বুড়িগঙ্গার পানিতে এমনকি ভূগর্ভের পানিতেও। পরিবেশবিদদের মতে, পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হচ্ছে এই ট্যানারি কেমিক্যাল। ট্যানারিগুলো চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ধরনের ৫০ টন কেমিক্যাল ব্যবহার করছে যার বেশিরভাগই বিষাক্ত। কোনোরকম পরিশোধন ছাড়াই এই কেমিক্যালগুলো নালার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে ট্যানারি মালিকরা বলছেন অন্য কথা। তাঁদের দাবি কেমিক্যালগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদ। কারণ এগুলো সব ইউরোপ থেকে আমদানি করা হয় এবং এটা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও ক্ষতিকর নয়। ঢাকা শহরের হাজারিবাগের ট্যানারিগুলো থেকে দৈনিক নির্গত ৭৫ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য (লবণ, হাড়, চামড়ার বর্জ্য) ও ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্যের কারণে ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। শুধু কঠিন ও তরল বর্জ্যই নয়, হাজারিবাগ ট্যানারি থেকে সালফার ডাই অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাসীয় বর্জ্যও বের হয়। ট্যানারির দুর্গন্ধ আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। ট্যানারি বর্জ্যের উপাদানের মধ্যে পচনযোগ্য দ্রবীভূত পদার্থ(প্রোটিন) থাকে যা দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে। এই বর্জ্য গ্রহণকারী জলাধারের পানির বর্ণ বাদামি হয়ে যায় যা দীর্ঘকাল বিদ্যমান থাকে। বর্জ্য প্রবাহে সোডিয়াম ক্লোরাইডের পরিমাণ এত বেশি থাকে যা গ্রহণকারী জলাধারের পানিকে ব্যবহারের অনুপযোগী করে তোলে। অ্যাসিডীয় ও অম্লীয় প্রবাহসমূহ কংক্রিট এবং ধাতু পাইপকে ক্ষয় করে। ট্যানারি বর্জ্যের উপাদানের মধ্যে আরো রয়েছে বিভিন্ন ভাসমান অপদ্রব্য যেমন কঠিন পদার্থের চুল,মাংস খণ্ড, ক্যালসিয়াম কার্বনেট, প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়া, ক্রোমিয়াম, সালফাইড ইত্যাদি। ভাসমান অপদ্রব্যসমূহ উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। সালফাইড পয়ঃনিষ্কাশন পাইপে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ট্যানারি থেকে নির্গত বর্জ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর হচ্ছে ক্রোমিয়াম। ক্রোমিয়াম জলজ অণুজীবের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত উপাদান। ফলে বর্জ্য পানির জীব-বিশোধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। এটা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতেও সংক্রমণ করতে পারে। হাজারিবাগ এলাকায় ওয়াসা কর্তৃক সরবরাহকৃত পানির মধ্যে উচ্চ মাত্রায় ক্রোমিয়াম ধাতু পাওয়া গেছে যা ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। ট্যানারিশিল্পে কাজের পরিবেশ মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর। এ শিল্পে প্রায় ১৫০০০ শ্রমিক কর্মরত আছে। এদের মধ্যে এক চতুর্থাংশের বয়স ১১ বছর বা তারও নিচে এবং তাদের মাসিক বেতন মাত্র ১০০০ টাকা। তাদের দিয়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছে। এই শিল্পের ব্যবহূত নানা বিষাক্ত পদার্থ হাতে নাড়াচাড়া করতে হয়। কর্মীরা Gloves এবং shoes ছাড়াই কাজ করে। ট্যানারির বিপজ্জনক মেশিনারিতে দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি হতে পারে। এই পরিস্থিতি তাদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ট্যানারিতে ব্যবহূত হাইড্রোজেন সালফাইডের কারণে ট্যানারির শ্রমিকরা শ্বাসপ্রশ্বাসের জটিলতা,মাথা ধরা, ব্রংকাইটিস ইত্যাদি রোগে ভোগে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ক্লোরিন গ্যাসের সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে নাক, কান, গলা এমনকি হূিপণ্ডের ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে। ফরমিক অ্যাসিড দৃষ্টিশক্তি হ্রাস করতে পারে। ট্যানারিশিল্পের শ্রমিকরা গ্যাস্ট্রিক-আলসার, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সংক্রান্ত সমস্যা, যক্ষ্মা, বাতজ্বর ও অ্যাজমাসহ ১৪টি মারাত্মক রোগে ভুগছে। একটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, এই শিল্পে নিয়োজিত ৫১ শতাংশ শ্রমিকই ভুগছে গ্যাস্ট্রিক আলসারে। তাদের মধ্যে রয়েছে ৩১ শতাংশ চর্মরোগ, ১২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপ, ১১ শতাংশ বাতজ্বর, ৬ শতাংশ সর্দি-কাশি, ১৯ শতাংশ জণ্ডিস, ৩৫ শতাংশ অ্যাজমা, ৩ শতাংশ আমাশয়, ২ শতাংশ কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা। শরীরে কুলাতে না পেরে অনেকেই চামড়াশিল্পের শ্রমিকের চাকরি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। তবে চাকরি ছাড়লেও তাদেরকে ছাড়েনি রোগ-ব্যাধি। ওষুধ এখন তাদের নিত্যসঙ্গী। আর যারা টিকে রয়েছে তাদের সঙ্গী হয়েছে চুলকানি, চোখ থেকে ক্রমাগত পানি পড়া আর গ্যাস্ট্রিক। বিশেষজ্ঞদের ধারণা ট্যানারি শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই মারা যাবে ৫০ বছরের মধ্যে। ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্যানারি বর্জ্যের দূষণ রোধ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু ট্যানারি মালিকরা তা করেননি। ২০০১ সালে হাইকোর্ট চামড়াশিল্পসহ দূষণ সৃষ্টিকারী কারখানাগুলোকে এক বছরের মধ্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেন। ২০০২ সালে সরকার ২০০৫ সালের মধ্যে চামড়াশিল্প ঢাকার বাইরে(সাভারে)স্থানান্তরের একটি প্রকল্প নেন।পরে প্রকল্পের মেয়াদ ২০০৬ সাল, তারপর ২০১০ সাল এবং সর্বশেষ ২০১২ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সরকার এখন পর্যন্ত(সাভারে)কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করতে পারেননি। এটির কাজ ৭০ শতাংশ শেষ হলেই হাজারিবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের কাজ শুরু করা যাবে। তবে ব্যবসায়ীরা সাভারে যেতে তেমন একটা আগ্রহী নন। তাঁদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও মীমাংসা হয়নি। ছয় বছর আগে শিল্প মন্ত্রণালয় বলেছিল সাভারে যাওয়ার জন্য ২৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। সেটা এখনও তাঁরা পাননি। ছয় বছর পর এখন তাদের ক্ষতিপূরণের দাবি তিন হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া ট্যানারি স্থানান্তরের সময় অনেক যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে যাবে। এগুলো নতুন করে স্থাপন করতে হবে। ক্ষতিপূরণ ছাড়া এগুলো সম্ভব নয়। সাভারের ৬০ শতাংশ প্লটই ৩০ হাজার বর্গফুটের কম আয়তনের। অথচ পরিবেশসম্মত ট্যানারি করতে অন্তত ৪০ হাজার বর্গফুট জায়গা লাগে। আবার হাজারিবাগে ২৪০টি ট্যানারি থাকলেও শিল্পনগরে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৫৫টি ট্যানারিকে। তাহলে বাকি ৮৫টি ট্যানারি যাবে কোথায়? তারা কি হাজারিবাগেই থাকবে? ঢাকা