নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃত্ বেগম রোকেয়া

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২১
আমাদের নারীমুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় এক নাম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করিয়াও শুধু নারী হওয়ার কারণে তিনি নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারেন নাই। এমনকি বাংলা ভাষা শিক্ষার সুযোগটুকুও জোটে নাই তাঁহার ভাগ্যে। অল্প বয়সে বিবাহ হইয়া গিয়াছে। তদুপরি, মাত্র ২৯ বত্সর বয়সে বরণ করিতে হইয়াছে বৈধব্য। কিন্তু কোনো কিছুই তাঁহাকে তাঁহার স্বপ্ন ও সংকল্প হইতে বিচ্যুত করিতে পারে নাই। স্বউদ্যোগে শুধু বাংলা ও ইংরেজি ভাষা রপ্ত করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, একই সাথে মননশীল একজন লেখক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন নিজেকে। প্রায় শতবর্ষ আগে তিনি যাহা রচনা করিয়া গিয়াছেন, সেই রচনাসম্ভার এখনও প্রাসঙ্গিক। এখনও হীরকখণ্ডের মতো দ্যুতিময়। সর্বোপরি, জ্ঞানের আলোয় তিনি নিজেই শুধু আলোকিত হন নাই, সেই আলো ছড়াইয়া দিয়াছিলেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অতুলনীয় অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজে যেমন শিক্ষিত হইয়াছেন, তেমনি তত্কালীন বাঙালি মুসলমান সমাজের অবরোধবাসিনী নারীদের শিক্ষা ও কর্মের পথও নির্মাণ করিয়া গিয়াছেন অভূতপূর্ব সাহস ও নিষ্ঠার সাথে। সর্বতোভাবে পশ্চাত্পদ ও নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন একটি সমাজে ইহা ছিল বাস্তবিকই অসম্ভবসাধ্য একটি কাজ। বস্তুত বেগম রোকেয়া তাঁহার বহুমুখি ভূমিকা ও নিরলস কর্মের মধ্য দিয়া সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করিয়া তুলিয়াছিলেন। প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়াছিলেন সমাজের অচলায়তনে। আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরিয়া আমরা তাহার সুফল ভোগ করিয়া চলিয়াছি। আজ সেই মহীয়সী নারীর জন্ম ও মৃত্যুদিবস। দিনটি রোকেয়া দিবস হিসেবে পালিত হইয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার ছিলেন উচ্চশিক্ষিত জমিদার। মাত্র ১৬ বত্সর বয়সে বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর সাখাওয়াত্ হোসেনের সাথে তাহার বিবাহ হইয়াছিল। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণে তাহাদের দাম্পত্য দীর্ঘস্থায়ী না হইলেও বেগম রোকেয়ার জীবনে এই মানুষটির প্রভাব ছিল অপরিসীম। নিজে উর্দুভাষী হওয়া সত্ত্বেও আমৃত্যু তিনি বেগম রোকেয়াকে ভাষাশিক্ষা, মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা ও সমাজকর্মে অনুপ্রেরণা জোগাইয়াছেন। মূলত তাহারই অনুপ্রেরণায় বেগম রোকেয়া প্রথমে ভাগলপুরে সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। অচিরেই স্বনামখ্যাত এই বিদ্যালয়টি কলকাতায় স্থানান্তরিত হইয়াছিল এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের তত্ত্বাবধানে আজও তাহা সগৌরবে সচল আছে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মেয়েদের বিদ্যালয়ে আনিবার জন্য তিনি কী অপরিসীম পরিশ্রম করিয়াছেন তাহা এখন সুবিদিত। সমাজের পর্বতপ্রমাণ কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে একদিকে মুসলিম নারী সমিতি গঠন করিয়া সভা-সমাবেশের মাধ্যমে জোর প্রচারণা চালাইয়াছেন, অন্যদিকে তরবারির মতো কাজে লাগাইয়াছেন তাহার ক্ষুরধার লেখনিকে। এইখানে মনে রাখা আবশ্যক যে, ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার ও কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে লড়াই করিতে গিয়া তিনি কখনই সীমা লঙ্ঘন করেন নাই। বিরুদ্ধাচরণ করেন নাই কোনো ধর্মের বা ধর্মীয় কোনো বিধিবিধানের। বরং অকাট্য সব যুক্তি দিয়াই তিনি খণ্ডন করিয়াছিলেন বিরুদ্ধবাদীদের যাবতীয় বিকৃত প্রচারণা, অন্ধ বিশ্বাস ও কু-যুক্তিকে। বেগম রোকেয়ার মৃত্যু হয় ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর। ভাবিতে অবাক লাগে যে চরম প্রতিকূল একটি পরিবেশে মাত্র ৫২ বত্সরের জীবনে তিনি যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়া গিয়াছেন— তাহা এখনও স্বমহিমায় ভাস্বর হইয়া আছে। প্রায় শতবর্ষ আগে নারীমুক্তি আন্দোলনের যেই মশাল তিনি প্রজ্জ্বলিত করিয়া গিয়াছেন— তাহা আজও বাতিঘরের মতো আমাদের পথ দেখাইতেছে। অথচ তাঁহার এইসব কর্মের পিছনে ছিল না জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার আর্থিক বা অন্য কোনো প্রকার প্রণোদনা বা প্ররোচনা। বস্তুত তিনি নিজের জীবন হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং সেই শিক্ষাকে সঠিকভাবে কাজেও লাগাইয়াছেন। আত্মোপলব্ধি ও আত্মশক্তির এই উদ্বোধনই যে সর্বপ্রকার উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান পূর্বশর্ত— তাহা মনীষীরা বহু আগেই বলিয়া গিয়াছেন। বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্ম ইহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হইতে পারে।