ভুলেই গিয়েছিলাম তাহেরের পায়ে গুলি লাগার কথা

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৬
২৫ জুলাই ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে শিয়ালকোট সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কর্নেল আবু তাহের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়কত্ব তিনি গ্রহণ করেছেন। এ খবর পেয়ে আগস্ট মাসে আমি ভারতে চলে আসি। ইতিমধ্যে তাহের ভাইয়ের স্ত্রী লুত্ফা ভাবি, ভাবির ছোট ভাই, আমাদের দুই বোন এবং আরো চার ভাই এই সেক্টরে যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। আমাকে সেক্টর হেডকোয়ার্টারে দায়িত্ব দেয়া হলো। বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং রংপুরের কিছু অংশ জুড়ে ১১নং সেক্টর। বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে এই সেক্টরেই রয়েছে কামালপুর শত্রুঘাঁটি। হেডকোয়ার্টারে যোগদানের পরদিনই অপারেশন কক্ষে তাহের আমাকে রণক্ষেত্রের ম্যাপ দেখালেন। বুঝিয়ে বললেন, সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী চেয়েছিলেন কোনো নির্দিষ্ট সেক্টরের দায়িত্ব না নিয়ে তাহের যেন সবগুলো সেক্টর ঘুরে দেখেন। পাকিস্তানের দুর্ধর্ষ কমান্ডো বাহিনীর এলিট অফিসার হিসেবে গেরিলা যুদ্ধের নিজ অভিজ্ঞতা তাহের যেন কাজে লাগান— যুদ্ধে বিরাজমান ত্রুটিসমূহ যেন চিহ্নিত করেন। ম্যাপে তাহের দেখালেন— কামালপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল হয়ে দ্রুততম সময়ে ঢাকা প্রবেশের পথ। তাই তিনি বললেন, বিভিন্ন সেক্টর ঘুরে সময় নষ্ট না করে ১১নং সেক্টরের অধিনায়কত্বই তিনি বেছে নিয়েছেন। কামালপুর শত্রুঘাঁটির মুখোমুখি স্থাপন করেছেন নিজ সেক্টর হেডকোর্য়াটার। স্টাফ অফিসার হিসেবে রণক্ষেত্রের ম্যাপ নিয়ে অধিনায়কের সঙ্গে আমাকে ঘুরতে হয়। যুদ্ধনেতা তাহেরকে খুব কাছে থেকে দেখার দুর্লভ সুযোগ পাই। আগস্ট থেকে নভেম্বর এই চার মাস তাহেরের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরাও উপলব্ধি করি কামালপুর শত্রুঘাঁটির গুরুত্বের কথা। তাহেরের নেতৃত্বে বহু অবিস্মরণীয় যুদ্ধ কাহিনীর অন্যতম কামালপুর শত্রুঘাঁটি দখলের যুদ্ধের কথা এখানে আমি বলবো। ১৪ নভেম্বর ১৯৭১। তাহের ভাইয়ের ৩৩তম জন্মদিন। এ দিনটিকেই ঢাকার প্রবেশদ্বার কামালপুর শত্রুঘাঁটি দখলের জন্য স্থির করা হয়েছে। ভোররাত ৩টায় চতুর্দিক থেকে আক্রমণ শুরু হয়। মুক্তিবাহনীর লেফটেনেন্ট মান্নান, সেকেন্ড লেফটেন্ট মিজান এবং আমাদের অপর ভাই আবু সাঈদ—এই তিনজনের নেতৃত্বে তিনটি কম্পানি এবং ভারতীয় বাহিনীর দুটি কোম্পানি মিলে আক্রমণ পরিচালিত হয়। চোখ বেশি রকমের খারাপ হয়ে যাওয়ায় আমাকে এই অভিযান থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। মেজ ভাই আবু ইউসুফ, সাঈদ ভাই, বাহার, বেলাল ও কর্নেল তাহের—ব্রাদার্স প্লাটুনের পাঁচজন অংশ নিয়েছেন এই অভিযানে। ছোট্ট ওয়াকিটকি নিয়ে আমি ও আমার ছোট বোন ডালিয়া যুদ্ধক্ষেত্রের কাছেই অপেক্ষা করছি। তাহের ভাইয়ের জন্য ফ্লাস্কে চা ও পানি নিয়ে এসেছি। ওয়াকিটকিতে যুদ্ধের খবর ভেসে আসছে। আমাদের তীব্র আক্রমণে পাকসেনাদের একজন মেজরসহ দুটি কোম্পানি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভোরের দিকে স্পষ্ট হয়ে এলো শত্রুঘাঁটির পতন আসন্ন। একটি অগ্রবর্তী কোম্পানির অধিনায়ক সদ্য কমিশন্ড সেকেন্ড লেফটেনেন্ট মিজানের খবর পাচ্ছিলেন না তাহের। তাই বাহার-বেলালসহ আরো কয়েকজন স্কাউটকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজেই এগিয়ে যান মিজানের খোঁজে। ওয়াকিটকিতে শুনলাম, এইমাত্র তারা একটি বাঙ্কার দখল করেছেন। অগ্রবর্তী দলটিরও সন্ধান মিলেছে। তারা সবাই শত্রুঘাঁটির দোরগোড়ায়। পাকিস্তানিরা ঘাঁটি ছেড়ে দিয়ে পার্শ্বপর্তী জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। বিভিন্ন অবস্থানের মুক্তিযোদ্ধারা তাহের ভাইকে অভিনন্দন পাঠাচ্ছেন । জন্মদিনে শুভেচ্ছাবার্তা জানাচ্ছেন ওয়্যারলেস সেটে। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যেও একটা খুশির আমেজ আমিও টের পাচ্ছি। হঠাত্ করেই সেটে বাহার ও বেলালের চিত্কার শুনলাম—অধিনায়ক মারা গেছেন। আমি দৌড়ে চললাম। একটি ভাঙা স্কুল ঘরের মেঝেতে তাকে এনে রাখা হয়েছে। হাঁটুর উপর থেকে বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। একটি ভাঙা বেড়ার উপর তিনি শুয়েছিলেন। গোলার আঘাতে আহত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা ঐ বেড়ার উপর তাকে শুয়ে দিয়ে গুলিবৃষ্টির মধ্যেও নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। আমি তার কাছে যাই। আমার দিকে তিনি তাকালেন। প্রচুর রক্তক্ষরণে চেহারা সাদা হয়ে গেছে। পানি চাইলেন। আমি নিজে হাতে তার মুখে পানি দিতে চাইলাম। মাথা একটু উঁচু করে তিনি নিজের হাতে গ্লাসটি নিলেন। বললেন, আমার হাত তো ঠিক আছে। বাহার-বেলালসহ যারা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছেন তাদের সারা শরীর রক্তাক্ত। চিত্কার করে কাঁদছে সবাই। চারপাশে জড়ো হওয়া সবাইকে উদ্দেশ করে তিনি বললেন, তোমাদের আমি বলতাম, পাকিস্তানিরা আমাকে মারতে পারবে না। আমি মরবো না। তোমরা ফ্রন্টে ফিরে যাও। চারদিকে খবর পাঠাও আমার কিছুই হয়নি। আমি তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি; কিন্তু ফিরে এসে যেন দেখি কামালপুর দখল হয়েছে, আর ঢাকার রাস্তা পরিষ্কার। কান্না-শোক ভুলে গিয়ে আমরা তখনই এগিয়ে চললাম শত্রুঘাঁটি অভিমুখে। লেখক: উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।