এখানে ঘুম ভাঙে পানির শব্দে। সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলার নাটায়াপাড়ায় বসবাস করে ৩০ হাজার মানুষ। গ্রামের নাম রেহাইশুড়িবেড়। এই গ্রামেরই তিন মাসের শিশু সুজন, ভীষণ ঠাণ্ডা লেগেছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আশপাশের কবিরাজ দেখিয়ে কোনো লাভ হলো না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নেওয়ার চেষ্টা হলো। এরই মধ্যে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। রাতে ঘাটে নৌকা পাওয়া যায় না। অগত্যা বাড়িতে ফিরে যাওয়া। বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হূত্স্পন্দন থেমে যায় সুজনের। ফুলে আরা তখন খুবই ছোট। তারপরও তার ভাই সুজনের মৃত্যু তিনি মেনে নিতে পারেননি। বিয়ের পর প্রতিদিন সংসারের টাকা অল্প অল্প করে জমিয়ে ২০০৫ সালে স্বামীর হাতে তুলে দেন এক লক্ষ টাকা। ইচ্ছা শিশুদের জন্য হাসপাতাল হবে।
ছোট্ট একটা স্বপ্ন অনেক বড় হয়ে দাঁড়াল যখন বাস্তবায়নের প্রশ্ন এল। কিন্তু থেমে থাকেননি ফুলে আরা। ছোট করেই শুরু করেন তার হাসপাতাল। স্বামীর সহায়তা আর এলাকাবাসীর সাহায্যে গড়ে তুলেন আমিনা দৌলতজামান মানবসেবা নামের দুই শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল। যেখানে সরকারিভাবে চিকিত্সার জন্য বিন্দুমাত্র ব্যবস্থা নেই, সেখানে হাসপাতালটিতে আধুনিক চিকিত্সার অনেক ব্যবস্থা আছে। দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই এলাকার সব মানুষ এখানে চিকিত্সা সেবা নিচ্ছে। সচ্ছল বা ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র বাবদ নামেমাত্র ফি নেওয়া হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে ব্যবস্থাপত্রসহ ওষুধ দেওয়া হয়।
কাজিপুর থেকে নাটুয়াপাড়া চরে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ইঞ্জিনচালিত নৌকা। নৌকা থেকে নামলেই চোখে পড়বে বিস্তীর্ণ চর। বাজারে এসে দাঁড়ালেই হাসপাতালে যাওয়ার বাহন হিসেবে পাওয়া যায় দুই চাকার ঘোড়ার গাড়ি অথবা মোটর সাইকেল।
২০০৭ সালে একবার যমুনা গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল তার স্বপ্নের হাসপাতাল। কিন্তু নিজের আর স্বামীর ক্লান্তিহীন চেষ্টায় আবারও দাঁড় করিয়েছেন তার হাসপাতাল। প্রতিদিন ২০ থেকে ৪০ জন রোগী সেবা নেন তার এই হাসাপাতাল থেকে।
নিজস্ব সোলার প্যানেল থেকে সেখানে নেবুলাইজার আর অক্সিজেনের মেশিন চালাতে হয়। মাঝেমধ্যে সোলার প্যানেলের ব্যাটারি পুড়ে যায়। অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় নতুন ব্যাটারি আসার, তার সঙ্গে বসে থাকেন রোগীরা।
ফুল আরা বলেন, ‘যখন চারদিকে অন্ধকার নেমে আসে, নদী পাড়ি দেওয়ার কোনো উপায় থাকে না, তখন কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার সেবা করার জন্য আমরা জেগে থাকি। মানবসেবাকেন্দ্রের সাথেই আমার বাড়ি। তাই যেকোনো সময় এসে ডাকলেই চিকিত্সা সেবা পায় যে কেউ।’
ফুলে আরা স্বপ্ন দেখেন—একদিন তার হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্স হবে, নিজস্ব জেনারেটর থাকবে, নিজস্ব ভবন হবে। আর কোনো ভাইকে, কোনো শিশুকে বিনা চিকিত্সায় মরতে হবে না।
ফুলে আরার স্বপ্ন সত্যি হবে কি না আমরা জানি না, কিন্তু আমরা জানি তিনি যেটুকু করেছেন তা আমাদের কাছে কিংবদন্তীতুল্য।
