২ সেপ্টেম্বর ২০০৮। আমি তখন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে কোতোয়ালী জোনের সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মরত। ১ম রমজানের দিন। অন্যান্য অফিসারদের মতো সারাদিনের কাজ শেষে আমিও পরিবারের সাথে ইফতারি করার জন্য বাসায় ফিরেছি মাত্র। রমজান উপলক্ষে বাড়ি থেকে আব্বা ও মা এসেছেন। বাসায় ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে ৫ মাস বয়সী একমাত্র ছেলেকে কোলে নিয়ে ইফতারির প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় ইফতারির মিনিট দশেক পূর্বে পরিচিত একটি মোবাইল নম্বর থেকে ফোন এল। কিছু বলার আগেই ও প্রান্ত থেকে বলল, ‘স্যার আমি যা বলি শুনেন।’ কিছুটা বিরক্তি সত্ত্বেও চুপ করে শুনলাম। ও প্রান্ত থেকে বলল, ‘স্যার, ডবলমুরিং থানাধীন কর্ণফুলি মার্কেটের কাছে তিনজন সন্ত্রাসী অস্ত্র নিয়ে অপেক্ষা করছে। একজনকে গুলি করে খুন করবে ওরা। ওদের মধ্যে একজনের গায়ে লাল জামা, মাথায় কালো টুপি।’ এটুকু বলেই লাইনটা কেটে দিল। কয়েকবার চেষ্টা করে ওই নম্বরটি বন্ধ পেলাম। একবার ভাবলাম তথ্যটি ভুল হতে পারে, আবার ভাবলাম, যদি সত্যি হয় আর কেউ যদি খুন হয় তাহলে নিজের কাছে কী জবাব দেবো। সারাটা জীবন এক যন্ত্রণায় জ্বলতে হবে। প্রথম রমজানের দিন সবাই চায় পরিবারের সাথে ইফতার করতে। আমার বাড়ির ড্রাইভার ও বডিগার্ডও বাসায় চলে গেছে। ওদেরকে কয়েক বার ফোন করে ধরতে পারলাম না। আমার নামে ইস্যু করা অস্ত্রটাও ছিল বডিগার্ডের কাছে। তবে গাড়ির চাবিটা সব সময় কাছে রাখতাম যাতে জরুরি প্রয়োজনে বের হতে পারি। ওদেরকে ফোনে না পেয়ে নিজেই গাড়ি নিয়ে রওয়ানা হলাম। আর ফোনে অফিসারদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। কয়েকজন অফিসারকে ফোন করলাম। দু’জন অফিসারকে বিষয়টি বলার সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল। তাদেরকে বললাম সিভিল ড্রেসে টাইগারপাস মোড়ে চলে আসতে। আব্বা বারবার বলছিলেন ইফতারি করে করে যেতে। আমি বললাম, তোমার বস আমি আসছি। ইফতারির ঠিক আগে ঘর থেকে কেন বের হচ্ছি বারবার জানতে চাইছিল। বলিনি, বললে হয়তো আসতে দিত না। মা আর স্ত্রী রান্না ঘরে থাকায় তারা আমার চলে যাওয়ার বিষয়টি টের পায়নি। ছেলেটাকে আব্বার কোলে দিয়ে আমি দ্রুত বের হয়ে গেলাম। ইফতারির ঠিক পূর্ব মুহূর্ত হওয়ায় রাস্তাঘাট অনেকটা ফাঁকা। পথে যেতে যেতে অফিসারদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করলাম। ঘটনাস্থলের কিছুটা দূরে গাড়ি থামালাম। গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে অফিসারদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলাম। ফোনে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক বর্ণিত স্থানের পাশে এসে আমরা অবস্থান নিলাম। একজন থেকে আরেকজনের দূরত্ব দৃষ্টিসীমার মধ্যে। আমি যেখানে অবস্থান নিয়ে ছিলাম সেখানে একটা ফাস্ট ফুডের দোকান ছিল। একটু পাশেই একটা মসজিদ। দোকানের সামনে দাঁড়ানো দেখে দোকানদার বারবার জিজ্ঞেস করছিল রোজা কি না? হ্যাঁ বলাতে তিনি অনুরোধ করছিলেন তার সাথে ইফতার করার জন্য। আমি এক বোতল পানি কিনে ইফতারি সারলাম। আমার দৃষ্টি শুধু খুঁজে ফিরছিল লাল জামা আর কালো টুপি পরা ওই ছেলেটাকে। ইতোমধ্যে মসজিদে আজান দিল। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বোতলের পানি মুখে দিতেই হঠাত্ চোখ পড়ল লাল জামা গায়ে এক যুবকের দিকে। বেশ দ্রুত গতিতে সে হেঁটে গেল। তাকে অনুসরণ করলাম কিছুটা সময়, মনে হলো এ ছেলেটা সে ছেলে নয়। আবার ঘুরে এসে ওই দোকানের সামনে দাঁড়াতেই দেখি দূর হতে একটা লাল চেক শার্ট মাথায় কালো টুপি পড়ে ধীরে ধীরে এক যুবক হেঁটে আসছে। তখন রাস্তা দিয়ে লোকজন চলাচল শুরু করছে মাত্র। যুবককে দূর হতে দেখে আমার শরীরে বিদ্যুত্ বয়ে গেল। দৃষ্টিসীমার মাঝে থাকা আমার একজন অফিসারের দিকে তাকালাম। ও বিষয়টি বুঝল হয়তো। আমি যুবকটির দিকে তাকিয়ে এগোচ্ছি। কাছাকাছি হতেই আমার চোখে চোখ পড়ল যুবকটার। তখন লক্ষ করলাম ও হঠাত্ দাঁড়িয়ে গেল। হাত দিল ডান পাশের কোমরে। মনে হলো কিছু একটা বের করতে যাচ্ছে কোমর হতে। আমার বুঝতে বাকি রইল না। দ্রুত দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরে ফেলি ওই যুবকটির ডান হাত। ইতোমধ্যে চলে আসে আমার একজন অফিসার। সেও এসে ধরে ফেলে ওই যুবককে। যুবকটির কাছ থেকে পেলাম একটি ওয়েবলি স্কট রিভলবার, ০৬ রাউন্ড গুলি লোড করা অবস্থায়। আরেকটু সময় পেলে হয়তো ফায়ার হতো গুলিটা। এ ছাড়া ওর পকেটে পাওয়া যায় আরও ০৬ রাউন্ড গুলি। দৌড়ে পালানোর সময় তার দুই সহযোগীকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায় একটি চাপাতি, একটি ছোরা ও দুটি ককটেল।
