নীলনদের দেশে শান্তি লুকোচুরি খেলছে। ২০ মাস আগে যদি মিসরীয়রা প্রতিবাদের ভাষা পেয়ে থাকেন, তবে গত ২২ নভেম্বর হলো তাদের স্বপ্নভঙ্গের দিন। প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসির বিরুদ্ধে এই দিনই প্রথম বার পথে নামে মিসরের মানুষ। কারণ, দেশের ‘ভালোর জন্য’ নিজেকে বিচার ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে ঘোষণা করেছিলেন তিনি—সমস্যা শুরু তখন থেকেই এবং তা এখন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।
প্রেসিডেন্টের মুরসির জারি করা ডিক্রিকে বিরোধীরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ব্যবস্থা বলে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে বেশ আগেই। কিন্তু মুরসি এবং তার দল ইখওয়ানুল মুসলিমিন বলছে—বিপ্লব রক্ষার জন্যই এ ডিক্রি জারি করা হয়েছে।
মিসরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন যে অবস্থায় রয়েছে, খুব তাড়াতাড়ি তা মিটবে বলে মনে হয় না। প্রেসিডেন্টের হঠাত্ ক্ষমতা দখল, নতুন আইন প্রণয়নে কট্টরপন্থীদের প্রাধান্য—কোনোটাই ভালোভাবে নেয়নি মিসরের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে, যখন ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর উদ্যোগে সংবিধানের খসড়া রচনা চলছিল, তখন সেই কমিটিতে যোগ দেননি বহু মানুষ। অভিযোগ উঠেছিল—কট্টরপন্থীদের হাতে সংবিধান তৈরি হলে মিসর ক্রমশ পেছনের দিকে যেতে শুরু করবে। কিন্তু তখন এই তত্ত্ব খারিজ করে দিয়েছিলেন মুরসি। বলেছিলেন, ‘যা হবে, তাতে দেশের ভালোই হবে।’ হুসনি মুবারকের স্বৈরাচারী শাসনের পতনের এখনো দুই বছর হয়নি। কিন্তু নতুন প্রেসিডেন্টের এমন আচরণ প্রাথমিকভাবে স্তম্ভিত করেছিল মিসরীয়দের। হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে মুবারক থেকে ‘মুক্তি’ পেলেন তারা, সে কি আরেক স্বৈরাচারীর হাতে পড়ার জন্য? তবে এবার শুরু থেকেই আন্দোলনের পথ ধরেছেন তারা—যেকোনো মূল্যে দেশে গণতন্ত্র চাই মিসরীয়দের। কিন্তু অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কট্টরপন্থীদের সঙ্গে লড়াই। অনেক দিন ধরেই মিসরের রাজনীতি পরিচালনা করতে চাইছে মুসলিম ব্রাদারহুড।
এ দিকে মিসরের প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেছেন—কালো টাকার বিনিময়ে সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে এবং তৃতীয় পক্ষ এর সুযোগ নিয়েছে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ও অন্তর্ঘাতমূলক তত্পরতা তিনি কোনোভাবেই বরদাশত করবেন না। মিসরে চলমান সংঘর্ষের জন্য মুরসি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সংলাপই হচ্ছে এর সবচেয়ে ভালো সমাধান। নতুন সংবিধান প্রশ্নে যে গণভোটের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তা অনুষ্ঠিত হবে—কোনো মতেই স্থগিত করা হবে না। জনগণ যদি এ সংবিধান প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে নতুন করে সাংবিধানিক পরিষদ গঠন করা হবে।’
জারি করা সাংবিধানিক ডিক্রি সম্পর্কে মুরসি বলেন, ‘বিচারকদের কাজ করতে বাধা দেবে না এ ডিক্রি, কিংবা জনগণকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না।’ তিনি এ ডিক্রির কিছু ধারা পুনর্বিবেচনার আশ্বাসও দেন।
টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট মুরসি গত মঙ্গলবার রাতের সংঘর্ষে নিহতদের পরিবার-পরিজনের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের চিকিত্সার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন। তবে, আন্দোলনের নামে বিভিন্ন কোম্পানি, দূতাবাস ও মন্ত্রীদের ওপর হামলার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মিসর বিপ্লবের পর ২০১১ সালে তত্কালীন সর্বোচ্চ সামরিক পরিষদ আইন পাস করেছিল—সাংবিধানিক পরিষদের কাছ থেকে খসড়া সংবিধান হাতে পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ১৫ দিনের মধ্যে তার ওপর গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবেন। গত ৩০ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট মুরসি নতুন সংবিধানের খসড়া হাতে পাওয়ার পর ওই আইন অনুযায়ী আগামী ১৫ ডিসেম্বর গণভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন।
চলছে সংঘর্ষ
মুরসির-বিরোধীদের বেশির ভাগই সাফ জানিয়েছেন—রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে কোনো আলোচনাতেই যেতে চান না তারা। কট্টরপন্থী ইসলামি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি বিতৃষ্ণাও বহাল রয়েছে একই রকম। প্রেসিডেন্টের আবেদন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানী কায়রোতে মুসলিম ব্রাদারহুডের সদর দপ্তরে বিক্ষুব্ধরা আগুন লাগিয়ে দেয়। দেশের অন্যত্রও অশান্তি জারি থাকে। প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের সামনে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী গত বৃহস্পতিবার সারা সন্ধ্যা সুর করে শোনালেন ‘মুরসি মুর্দাবাদ’। এক দিন আগেই মিসরের বিক্ষোভ চরম আকার নিয়েছিল।
ডিক্রির মাধ্যমে মুরসি নিজের ও দলের ক্ষমতা বাড়াতে চাইছেন—এ অভিযোগে বিক্ষোভ শুরু করে সরকার বিরোধীরা। এরপর মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার নতুন সংবিধানের খসড়া সংসদে অনুমোদন করিয়ে নেয়ায় বিক্ষোভ আরো জোরদার হয়। সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের কমিটিতে বিরোধীদল এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের যে প্রতিনিধিরা ছিলেন তাদের সবাই প্রস্তাবিত সংবিধানকে ‘অগণতান্ত্রিক’ আখ্যা দিয়ে কমিটি থেকে নাম প্রত্যাহার করার পরও সংসদে ভোটাভুটি সেরে ফেলে মুসলিম ব্রাদারহুড।
সম্প্রতি নতুন সংবিধান কার্যকর করার জন্য গণভোটের আয়োজনেরও পরিকল্পনা করেছে মুরসি সরকার। ১৫ ডিসেম্বর গণভোট হওয়ার কথা। কিন্তু এখন নতুন সংবিধান এবং গণভোট নিয়ে সরকারের মধ্যেই দেখা দিয়েছে মতবিরোধ। গণভোট আয়োজনের জন্য গড়া বিশেষ কমিটির সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বিচারপতি জঘলৌল আল-বালসি। তিনি জানিয়েছেন—যে সংবিধানের জন্য মিসরের জনগণের প্রাণ গেছে, সেই সংবিধানের জন্য কোনো গণভোটে তিনি অংশ নেবেন না।
মুরসি আন্দোলনকারীদের সাবধান করে দিয়ে বলেছেন—অর্থনীতির ক্ষতি না ঘটলে, সম্পত্তির হানি না হলে এবং যানবাহন চলাচল অব্যাহত থাকলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে তার আপত্তি নেই, নয়তো পুলিশ কড়া পদক্ষেপ নেবে। আন্দোলনকারীরা মুরসির বক্তব্য বুঝেছে এবং তাদের অবস্থান ঠিক করে নিয়েছে। করিম আল-বেহাইরি বলেন, ‘আমাদের মুরসির এমন শাসন চাই না। যদি মুরসির শাসনের শেষ ঘটাতে না পারি, তাহলে আমরা মরব। ও মিসরকে বদলে একটা নতুন ইরান করতে চায়।’
এ দিকে জনতাকে শান্ত করতে তড়িঘড়ি মুরসি প্রশাসন দেশে গণতান্ত্রিক পালাবদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি সংবিধানের খসড়া প্রস্তুত করে সংসদীয় অধিবেশনে পাস করিয়ে নিয়েছে। সেই খসড়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জনগণের রায় নেয়ার উদ্দেশ্যেই ভোটাভুটির এই আয়োজন। ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এই খসড়া অনুমোদিত হলে অবিলম্বেই সংবিধানের প্রতিটি ধারা কার্যকর হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন মিসরীয় রাষ্ট্রনায়ক।
তড়িঘড়ি সংবিধানের খসড়া তৈরি করাকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখছে না বিরোধীদের একটা বড় অংশ। বিরোধী নেতা মুহাম্মদ এলবারাদেই খসড়াকে ‘ইতিহাসের আঁস্তাকুঁড়’ বলে উল্লেখ করেছেন। সংবিধান-বিরোধী মিছিলে রবিবারও অন্তত কয়েক শ মানুষ যোগ দেয়।
সেনাবাহিনীর হুঁশিয়ারি
এ দিকে মিসরের সেনাবাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে—দেশটিকে ‘অন্ধকার সুড়ঙ্গ’-এ ঠেলে দেয়ার কোনো অপচেষ্টা বরদাশত করা হবে না। বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসি ও সরকারবিরোধীদের সংলাপে বসে যত দ্রুত সম্ভব উদ্ভূত সংকট মোচনের আহ্বান জানানো হয়েছে। এক বিবৃতির মাধ্যমে গত শনিবার সেনাবাহিনী এ আহ্বান জানায়। মিসরে মুরসি-বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনী এ বিষয়ে বক্তব্য দিল। বিবৃতিতে বলা হয়—সেনাবাহিনীর অন্যতম দায়িত্ব হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা করা। এই দায়িত্ব পালনে তারা সচেষ্ট থাকবে।
এ দিকে প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসির সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর গত শুক্রবার রাতভর বিরোধীরা রাজধানী কায়রোয় প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বাইরে বিক্ষোভ করেছে। গতকালও তারা প্রাসাদের কাছে অবস্থান নেয়। তবে বিক্ষোভ দমনে যেকোনো সময় সেনা মোতায়েন করা হতে পারে—বিষয়টি মুরসির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায়ও পুলিশকে সহায়তা দিতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে—প্রেসিডেন্ট মুরসি শিগগিরই এ বিষয়ে অনুমোদন দেবেন।
রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত আল-আহরাম পত্রিকায় বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষায় পার্লামেন্টে একটি আইনি পদক্ষেপের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের আওতায় প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের নির্দেশ দেবেন। একই সঙ্গে তাদের গ্রেফতারের ক্ষমতাও দেয়া হতে পারে। তবে কবে থেকে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হবে, সে বিষয়ে খবরে কিছু বলা হয়নি।
