রাসয়নিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা

সিরিয়ায় কবে মুছবে রক্তের দাগ

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩১
ক্ষমতা ধরে রাখতে রাসায়নিক অস্ত্রপ্রয়োগ করার কথা ভাবছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার। অভিযোগটা গুরুতর। সিরিয়ার তরফ থেকে এমন অভিযোগ স্বীকার করা না হলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্র তুরস্ক এবং মার্কিন গোয়েন্দা দন্তরের রিপোর্ট এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে কি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এ বার প্রতিবেশী ইরাকের সাবেক রাষ্ট্রনায়ক সাদ্দাম হুসেনের পথে পা বাড়াচ্ছেন? বাশারের অস্ত্রভাণ্ডারে কি আদৌ জমানো আছে আন্তর্জাতিক স্তরে নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র? কী হতে পারে যদি এই অস্ত্র বিদ্রোহীদের হাতে পড়ে যায়? এমনই হরেক প্রশ্ন এখন পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। আশঙ্কাটা অসঙ্গত নয়। কারণ সিরিয়ায় রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। তাই সিরিয়ার সরকার বিদ্রোহীদের দমন করতে যেকোনো সময়েই এমন ‘চরম ব্যবস্থা’ নিতে পারে। বাশারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মরিয়া বিদ্রোহীরাও। প্রায় দুই বছর ধরে দেশে চলছে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। সমানে সমানে টক্করে রোজই একটু করে জমি হারাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট। বিদ্রোহীদের দখলে চলে গিয়েছে দেশের উত্তর ও পূর্ব ভাগের অনেকটা অঞ্চল। রাজধানী দামেস্কোর উপকণ্ঠে একটি সামরিক বিমানবন্দরও চলে গিয়েছে বিদ্রোহীদের হাতে। মনে করা হচ্ছে, সরকারের পতন এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু সাবেকি অস্ত্রে যদি কাজ না হয়, তা হলে রাসায়নিক অস্ত্রের প্রয়োগ করতে পিছপা হবেন আসাদ, এমন ধারণা অনেকেরই। যদিও রাসায়নিক অস্ত্র থাকার কথা সিরিয়া প্রশাসন আজ অবধি স্বীকার করেনি, কিন্তু বিভিন্ন রিপোর্টের ভিত্তিতে বলা যায়, রাসায়নিক অস্ত্র মজুত রয়েছে সিরিয়ার কাছে। ইরাকি একনায়ক সাদ্দাম হুসেনের কায়দায় যথেষ্ট পরিমাণে মাস্টার্ড গ্যাস এবং সারিনের মতো ‘নার্ভ এজেন্ট’-এর সঞ্চয়ই যথেষ্ট। ৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরানি সেনার ওপর সাদ্দাম হুসেন সারিন এবং টাবুন নামে দুই প্রকারের নার্ভ গ্যাস প্রয়োগ করেন। ইরাকের উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী কুর্দ প্রজাতির মানুষদের ঢালাও হত্যা করার জন্য মাস্টার্ড গ্যাসের প্রয়োগ করা হয়। সিরিয়ার রাজনীতিতে বিশেষজ্ঞ আরম নারগুইজিয়ান জানান, ‘প্রেসিডেন্ট বাশারের হাতে যে ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র রয়েছে, তা অন্তত ৪০ বছরের পুরনো। বাশারের বাবা সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট হাফিজ আসাদ ওই অস্ত্র তৈরি করিয়েছিলেন। সেই মারণাস্ত্রের আধুনিকীকরণ আদৌ হয়েছে বলে মনে হয় না।’ যদিও এ বিষয়ে কোনো শিবিরের কাছেই কোনো তথ্য মজুত নেই। সিরিয়ার হাতে যথেষ্ট পরিমাণ রাসায়নিক অস্ত্র আছে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে গত সপ্তাহে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ‘সিরিয়ার হাতে থাকা রাসায়নিক অস্ত্র যদি তারা বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, তবে ভুল করবে। প্রয়োজনে বিরোধীদের সমর্থনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হবে। সে ক্ষেত্রে রক্তপাত কিংবা প্রাণহানির জন্য দায়ী থাকবেন বাশারই’— এমন কথা বলেছেন ওবামা। সিরিয়ার ৭৫টি অস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করা হলেও সেখানে প্রচুর গোপন অস্ত্রঘাঁটি রয়েছে বলে সন্দেহ রয়েছে আমেরিকার। ওবামা প্রশাসনের ধারণা, সিরিয়ায় বাশারের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ চলছে তা থামাতে যদি এই রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়, তবে তা সিরিয়ার ভবিষ্যতকে আরো গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, সিরিয়াবাসীর ওপর এই অস্ত্র কোনো ভাবেই প্রয়োগ করা হবে না। কিন্তু তাদের এই আশ্বাসে ভরসা রাখতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং ইরান। বিদেশমন্ত্রীদের এক বৈঠকে সিরিয়া ও তুরস্ক সীমান্তে সুরক্ষা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে তুরস্ক। ন্যাটোর পক্ষ থেকে তাকে সব রকমের সাহায্যের আশ্বাসও দেয়া হয়েছে। ন্যাটো ইতিমধ্যেই তুরস্কের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করেছে, যেখান থেকে সিরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হয়। ইসরায়েলও সিরিয়ার গোপন রাসায়নিক অস্ত্রাগারের ব্যাপারে শঙ্কিত। অন্য দিকে, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া হুঁশিয়ারির বিরোধিতা করেছে রাশিয়া। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে শান্তি তো দূর, সীমান্তের অশান্তি আরও বাড়তে থাকবে। এই মুহূর্তে সিরিয়ায় চলতে থাকা বাশার-বিরোধী আন্দোলন রুখতে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার যদি সত্যি সত্যিই হয়, অথবা এই অস্ত্র যদি কোনো জঙ্গি সংগঠনের হাতে যায়, তবে তা সমগ্র বিশ্বের কাছেই হয়ে উঠবে বিপজ্জনক। ঝরবে বহু নিরপরাধেরই রক্ত। সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্রের ভাণ্ডার কতটা সমৃদ্ধ তা জানা যায়নি। চুক্তিতে সই না করার জন্য সিরিয়ায় কোনো পরিদর্শক দল যেতে পারেন না। তাছাড়া সিরিয়ায় ঢুকে সব কয়টা রাসায়নিক কেন্দ্রে তল্লাশি চালাতে অন্তত ৭৫ হাজার সেনা দরকার। তবে এর জন্যও নাকি প্রস্তুত আমেরিকাসহ ন্যাটো দেশগুলো। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিরোধীদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করলে চরম ভুল করবেন বাশার আল-আসাদ। সে ক্ষেত্রে সিরিয়ার ভবিষ্যত্ নিয়েই অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। এর পর যে অস্থিরতা দেখা দেবে তার জন্য প্রেসিডেন্ট নিজেই দায়ী থাকবেন। সিরিয়া জানে না—কবে মুছবে রক্তের দাগ। সিরিয়া সীমান্তে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে গত মঙ্গলবার ন্যাটো জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সিরিয়া সীমান্তে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের অনুমোদন দেন। গত বৃহস্পতিবার খবর বের হয়েছে যে, ন্যাটো বাহিনী এরই মধ্যে এ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের কাজ শুরু করেছে। একই সময় খবর বের হয়েছে—মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আইজেন আওয়ার আট স্কোয়াড্রন জঙ্গিবিমান ও আট হাজার মেরিন সেনা নিয়ে সিরিয়া উপকূলের কাছে পৌঁছেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে রাশিয়া। রাশিয়া মনে করছে, সিরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন চালানোর জন্যই ন্যাটো জোট এ পদক্ষেপ নিয়েছে। প্যাট্রিয়ট মোতায়েন সম্পর্কে গ্রুশকো বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য কোনো হুমকি নয় তবে এটা থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, ন্যাটো সিরিয়া সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আবারো ন্যাটোর জড়িয়ে পড়ার বিপজ্জনক ঘটনা আমরা দেখতে যাচ্ছি।’ সিরিয়া সরকার সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে যাচ্ছে বলে আমেরিকা ও পশ্চিমা কয়েকটি দেশসহ ইসরায়েল সম্প্রতি যে অভিযোগ তুলেছে তাও নাকচ করে দেন রুশ রাষ্ট্রদূত। রাসায়নিক অস্ত্রের সাতকাহন রাসায়নিক অস্ত্র কেন ব্যবহার করা হয়? এক কথায় বলা যায়, বন্দুক বা তলোয়ারের মতো ‘সাবেকি’ হাতিয়ার নয়, একসঙ্গে বহু মানুষকে নিমেষে শেষ করতে অত্যন্ত কার্যকর এই রাসায়নিক অস্ত্র । কার্যকারিতা অনুসারে এই অস্ত্রকে বেশ কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। ১. ব্লাড এজেন্ট : শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে মানুষের রক্তে মিশে যায়। এর লক্ষণ—মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং পক্ষাঘাত। রাসায়নিক উপাদান— সায়ানোজেন ক্লোরাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড। ২. ব্লিস্টার এজেন্ট : চামড়া বা চোখের সংস্পর্শে এলে ‘কাজ’ করে। লক্ষণ—চামড়ায় বড় বড় বিষাক্ত ফোস্কা, অন্ধত্ব। রাসায়নিক উপাদান—মাস্টার্ড গ্যাস, মিথাইল ডাইক্লোরো আরসিন, লিউইসাইট। ৩. নার্ভ এজেন্ট : শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। লক্ষণ—কাঁপুনি, লালাক্ষরণ, শরীরে খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট। রাসায়নিক উপাদান—সারিন, টাবুন, সোমান, সাইক্লোসারিন। ৪. পালমোনারি এজেন্ট : আক্রমণের স্থান ফুসফুস, ক্রমশ পানি জমতে থাকে ফুসফুসে। লক্ষণ—গলাজ্বালা, কাশি, বমি, শ্বাসকষ্ট। রাসায়নিক উপাদান—ফসজিন, ক্লোরিন, ডাইফসজিন, অ্যাক্রোলিন। ইতিহাসে রাসায়নিক গ্যাস * রাসায়নিক যুদ্ধের প্রথম নজির গড়ে জার্মান বাহিনী, জাইলিল ব্রোমাইড প্রয়োগ করা হয় রুশদের বিরুদ্ধে। * দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাইক্লোন-বি গ্যাস প্রয়োগে ইহুদি নিধনের নির্দেশ দেন হিটলার। * ভিয়েতনাম যুদ্ধে ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’-এর সাহায্যে ভিয়েতনামের প্রায় ৬০ লাখ একর জায়গার গাছের পাতা ঝরিয়ে দিয়েছিল আমেরিকা। * ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দাম হুসেনের নির্দেশে ‘সারিন’ ও ‘টাবুন’ গ্যাস দিয়ে ইরানিদের আক্রমণ করে ইরাকি বাহিনী। ইরাকের রাসায়নিক যুদ্ধের দায়িত্বে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলি হাসান আল-মাজিদ ওরফে ‘কেমিক্যাল আলি’। * শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে রাসায়নিক গ্যাস ব্যবহারের। অভিযোগ, এলটিটিই-র সঙ্গে লড়াইয়ের সময় তামিল অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে এমন গ্যাস ছড়িয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।