জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে গত শুক্রবার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এর প্রভাবে ফুকুশিমার নিকটবর্তী মিয়াগিতে আছড়ে পড়ে সুনামির ঢেউ। ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল এক মিটার। গত বছরের ১১ মার্চ জাপানে যে ভয়াবহ সুনামি হয়েছিল, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই ফুকুশিমা অঞ্চলই। প্রাণ হারিয়েছিল অন্তত ২০ হাজার মানুষ। বিপর্যস্ত হয়েছিল ফুকুশিমা দাইচি কেন্দ্র।
গত বছরের সেই ভয়াবহতার স্মৃতি ও প্রভাব এখনো টাটকা। সে কারণেই গত শুক্রবার কম্পন অনুভূত হতেই জারি হয় সুনামির সতর্কতা। ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৩। কেন্দ্র ছিল রাজধানী টোকিও থেকে ৪৫৯ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। সুনামি সতর্কতা জারির পর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ মিয়াগির ইশিনোমাকি উপকূলে আছড়ে পড়ে সুনামি। সুনামির কথা ছড়িয়ে পড়তেই ফুকুশিমার দুটি পরমাণু কেন্দ্রের কর্মীদের নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। সেন্ডাই বিমানবন্দর কিছুক্ষণ বন্ধ রাখলেও পরে তা আবার চালু করা হয়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিকো নোডার সে দিন ভোটের প্রচারে টোকিও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভূমিকম্পের কারণে এই যাত্রা বাতিল হয়। ভূমিকম্প-নিরোধক বাড়ি তৈরিতে সরকারি উদ্যোগ এবারে জাপানে ভোটের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গেই ফেসবুকের মাধ্যমে সতর্কতা জারি করেন স্থানীয়রাই। আতঙ্কের ফলে কুশল-সংবাদ চালাচালির জেরে অত্যধিক চাপে একসময় টেলিসংযোগ বসে যায়। পরে অবশ্য যুদ্ধকালীন তত্পরতায় ফের সংযোগ গড়ে তোলা হয়। জাপানের এই ভূমিকম্প ও সুনামি প্রভাব ফেলেছে অর্থনীতিতেও। খবর ছড়াতেই আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার ও ইউরোর প্রেক্ষিতে ইয়েনের দাম বাড়তে থাকে। তবে এই দুর্যোগের প্রভাব কতটা, সে উত্তর দিতে পারে একমাত্র সময়ই।
বিজ্ঞানীদের মতে—পর্বতময় এ ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক গঠন এখনো ঠিকমতো বিন্যস্ত হয়নি। পৃথিবীর কোনো প্রান্তের ভূ-গঠনের স্থায়িত্ব পেতে যে সময় লাগে, জাপান এখনো সেই পরিমাণ সময় পায়নি। তাই চারটি প্রধান দ্বীপ হনশু, হোক্কাইদো, কিছুশু, শেনকাকু এবং প্রায় চার হাজার দ্বীপের পৌনে চার লাখ বর্গকিলোমিটারের এই ‘নবীন’ ভূভাগ নতুন করে বিন্যস্ত হতে বারবার কেঁপে ওঠে। ভূতাত্ত্বিক পুনর্বিন্যাসের ফাঁদে পড়ে এখানকার জনগণ বছরে প্রায় দেড় হাজার ভূমিকম্প অনুভব করে। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে এর কোনো কোনোটি হঠাত্ এমনই তীব্র মাত্রায় ঝাঁকুনি দেয়, যা থেকে সৃষ্টি হয় মহাঢেউ সুনামির। এর ওপর রয়েছে আগ্নেয়গিরির জমকালো সমারোহ। দেশটির ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকাই পর্বতময়। মাউন্ট ফুজি অগ্নিপর্বত থেকে সব সময়ই ধোঁয়ার কুণ্ডলি আকাশ ছুঁতে চায়। মাউন্ট সাকুরাজিমা আগ্নেয়গিরি থেকে উদ্গীর্ণ কালো ছাই দক্ষিণের কাগোশিমা শহরকে আচ্ছন্ন করে রাখে। সেখানকার অধিবাসীরা রাস্তায় নেমে ছাইপাত থেকে রক্ষা পেতে ছাতার আশ্রয় নেয়। উত্তরের মূল ভূ-দ্বীপে প্রায়ই ‘মাউন্ট অসর’ থেকে সালফারের থকথকে কাদা বের হয়ে হলুদ রঙে রাঙায় পাথুরে ভূমি।
ফিনিক্স পাখির মতো উঠে আসা
গত শতাব্দীর ২৩ সালে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয় দেশটিতে। সে সময় স্থান ভেদে ৪ থেকে ১০ মিনিট ধরে স্থায়ী ৭ দশমিক ৯ মাত্রার এ ভূমিকম্প ‘গ্রেট কান্তো’ নামে খ্যাত। নিহত হয়েছিল এক থেকে দেড় লাখ মানুষ, নিখোঁজ হয়েছিল প্রায় ৪০ হাজার। এর আগে হয়েছিল ‘মিনোওয়ারি’ বা ‘নবি’ ভূমিকম্প। ১৯৯৫ সালের ‘গ্রেট হানসিন’ বা ‘কোবে’ ভূমিকম্পের তীব্র ক্ষয়ক্ষতির পর থেকে স্থাপত্য-নির্মাণে জাপান বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করে। এত সব প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ও প্রাকৃতিক সম্পদের দৈন্যদশার জাপান অধিক জনঘনত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। ধ্বংসস্তূপ থেকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে ভালো প্রামাণ্য রাষ্ট্র খুব কমই আছে। বারবার ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পরও দেশটি নিজেদের বিকশিত করেছে বিশ্ব অর্থনীতির ঈর্ষণীয় চূড়ায়।
জাপানের অধিবাসীরা প্রতিনিয়ত শিকার হয়েছে প্রাকৃতির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রোষানলের। সাক্ষাত্-প্রলয় নেমে এসেছে কখনো ভূমিকম্প, ভূমিকম্পের দোসর সুনামি, প্রশান্ত মহাসাগরের রুদ্র টাইফুন আর অসংখ্য আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণ রূপে। অথচ প্রকৃতি কিংবা মানুষের নিষ্ঠুর থাবায় যতবার বিপর্যয় নেমে এসেছে এ দেশটিতে, তত বারই ধ্বংসস্তূপ থেকে তারা ফিনিক্স পাখির মতো বেরিয়ে এসে গড়ে তুলেছে আগের চেয়ে আরো উন্নত, আরো নয়নাভিরাম এক স্বপ্নভূমি।
