চীনে রাজনৈতিক সংস্কার আসন্ন?

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩২
রাজনৈতিক সংস্কারের পথে হাঁটতে আগ্রহী চীন—এমনটি কদিন আগেও কল্পনা করা কষ্টসাধ্য ছিল। তবে এবার সময় পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি ‘রাজনৈতিক সংস্কার’-এরও পক্ষে চীন—এমন বার্তাই দিচ্ছেন চীনের নতুন প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং। চীনে রয়েছে একদলীয় কমিউনিস্ট শাসনতন্ত্র। এর রাজনৈতিক সংস্কারকে সোনার পাথরবাটি বলেই মনে করা হতো। কিন্তু এখন বেইজিং বলছে—এই সংস্কারকে ‘অসম্ভব’ তকমা দেয়ার দিন ফুরাতে চলেছে। সদ্য-সমাপ্ত ১৮তম পার্টি কংগ্রেসের বার্তা পৌঁছাতে গিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির স্ট্যান্ডিং কমিটি জানাচ্ছে—‘কিছু ভুল রয়ে গেছে’ পার্টিতন্ত্রে। নতুন প্রেসিডেন্টের আমলে তা শুধরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য—দীর্ঘ দিন একদলীয় কমিউনিস্ট শাসন চলতে থাকায় পার্টির মধ্যে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, উন্নয়নের ধুয়ো তুলে দমননীতির অভিযোগে ক্লান্ত নেতৃত্ব। শীর্ষ-নেতাদের আত্মীয়দের আর্থিক সমৃদ্ধির অভিযোগেও উত্তাল চীনের সাধারণ মানুষ। তারা ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন ফেসবুকে। ফলে, দেশের ভেতরে জনতার ক্ষোভ প্রশমিত করতে এবং বিদেশের কাছে নিজেদের সংস্কারপন্থী ভাবমূর্তি তুলে ধরতে দীনে রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হচ্ছে। গণতান্ত্রিক পথে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নতুন এই আশার কথা শুনিয়েছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য লি জুন রু। উন্নয়নের নামে যাতে কোনো অনিচ্ছুক মানুষের জমি না নেয়া হয়, সে জন্য ‘মেকানিজম’ তৈরি হচ্ছে। তার কথায়, ‘অর্থনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে যদি রাজনৈতিক সংস্কার না করা হয়, তা হলে তা স্থায়ী হয় না। আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এরই মধ্যে অনেক কিছু বদলিয়েছি আমরা। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের অবসরের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাত বদল হওয়ার পদ্ধতিটা মসৃণ হয়েছে।’ চীনের এই কমিউনিস্ট নেতা লি জুন রু মনে করেন—দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোর যেমন অনেক অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে, তেমন কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর বড় বেশি নির্ভরশীলতা রয়েছে চীনে। তাই বিকেন্দ্রিকরণের জন্য তাদের প্রায় ষাট বছরের পুরনো ‘পলিটিকাল কনসাল্টেশন কনফারেন্স’ বা পিসিসির ধারণাকে নতুন করে সামনে আনতে চলেছে নতুন নেতৃত্ব। জানানো হচ্ছে—দেশের সব রাজনৈতিক আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পিসিসি-কে সামিল করা হবে। মোট ৩৪টি বিভাগ থাকবে পিসিসির। তাত্পর্যপূর্ণভাবে এই পিসিসির মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব থাকবে কমিউনিস্ট পার্টির। বাকি ৬০ শতাংশ বিভিন্ন সমাজসেবী সংস্থা, বেসরকারি গোষ্ঠী এবং সমাজের নানা অংশের মানুষের মধ্যে থেকে উঠে আসবে। হু জিন তাওয়ের সময় থেকেই পার্টির ভেতরে রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। যত দিন যাবে, তা আরও বাড়বে। চীনের মধ্যে বহু সামাজিক শ্রেণী-বিন্যাস হয়ে গেছে। আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রশ্নেও কিছু কিছু অঞ্চল অনেক এগিয়ে গেছে, পেছনে পড়ে আছে অনেক এলাকা—তৈরি রয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ক্ষোভ। অবশ্য জওহরলাল নেহ্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন বিভাগের অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্দাপল্লী অবশ্য মনে করছেন, “পুরোটাই কথার কথা। রাজনৈতিক সংস্কারের নামে কিছু ‘কসমেটিক’ সংস্কার হচ্ছে মাত্র—এর বেশি কিছু নয়। পরিবর্তনশীল এবং বিরাট বাজার রয়েছে—এমন বিভিন্ন দেশে কম দামে পণ্য রফতানি করে বাজার করায়ত্ত করার এ এক চৈনিক কৌশলমাত্র।’ অধ্যাপক শ্রীকান্ত মনে করেন—চীনের কমিউনিস্ট শাসকেরা কখনো সাধারণ মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অথবা অন্য দলের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বা ক্ষমতা ভাগ করে নেবেন না।