শুনলে চোখ কপালের উঠতে পারে—চাঁদে পরমাণু ঘাঁটি বানানোর পরিকল্পনা ছিল আমেরিকার! চাঁদে গোপন পরমাণু হামলার অভাবনীয় পরিকল্পনা বলে কথা—ছাপার ভুল নয়। গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে এমন এক বিধ্বংসী পরিকল্পনাই নিয়েছিল মার্কিন বায়ুসেনা। ‘টপ সিক্রেট’ এই কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বে ছিলেন যে পদার্থবিদ ৮৫ বছরের সেই লিওনার্দ রাফায়েল সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে এই তথ্য ফাঁস করেছেন।
১৯৫৮ সাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (রাশিয়া) মধ্যে পরমাণু অস্ত্রের লড়াই তুঙ্গে। কে কাকে আগে চমকে দেবে, সর্বক্ষণ চলছে চুলচেরা হিসাব। গোদের উপরে বিষফোঁড়ার মতো মহাকাশ গবেষণার দৌড়ে সে সময় কিছুটা ব্যাকফুটে ছিল আমেরিকা। কারণ, রাশিয়া তত দিনে শূন্যে পাঠিয়েছে দুনিয়ার প্রথম উপগ্রহ স্পুটনিক-১। এ সাফল্যকে ‘মোকাবিলা’ করতে কিছু একটা করা প্রয়োজন আমেরিকার। তারই ফসল ছিল এই পরিকল্পনা।
প্রজেক্ট লিডার লিওনার্দ শিকাগোর বাড়িতে বসে সে কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘সবাই খুব চিন্তায় ছিল গ্যাগারিন (মহাকাশে প্রথম মানুষ সোভিয়েত রাশিয়ার ইউরি গ্যাগারিন) এবং স্পুটনিক নিয়ে। রাশিয়া তখন মহাকাশ বিজ্ঞানে বিস্তর এগিয়ে। তার পাশে ফিকেই দেখাচ্ছিল আমেরিকাকে। দেশের মানুষকে ভরসা জোগাতে তখন আমেরিকার এটা দেখানো প্রয়োজন ছিল যে, তাদের সক্ষমতাও কিছু কম নয়।’
কিন্তু শুধু ক্ষমতা প্রদর্শন করতেই এমন পরিকল্পনা? লিওনার্দর মুখে গোটা উপাখ্যান শুনলে কিন্তু ঠিক তেমন মনে হয় না। তিনি জানাচ্ছেন—চাঁদে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আমেরিকা দেখতে চেয়েছিল মহাকাশযুদ্ধ চালানোর মতো ক্ষমতা আছে কিনা পরমাণু অস্ত্রের! সে ক্ষেত্রে চাঁদে পরমাণু ঘাঁটি গেঁড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নেরর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর কথা ভেবে দেখত তারা।
রাফেলের মতে, ‘আসলে সোভিয়েত-ভীতিই ছিল এই পরিকল্পনার মূলে। আমেরিকা ভাবত, সোভিয়েত যদি তাদের উপর পরমাণু হামলা চালিয়ে পৃথিবীতে তাদের সব ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়, তা হলে চাঁদের ওই ঘাঁটি থেকে তারা কাজ চালাতে পারবে!’ লিওনার্দ বলেন, ‘আসল পরিকল্পনাটা ছিল—পৃথিবীর কোনো গোপন জায়গা থেকে চাঁদ লক্ষ্য করে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল (আইসিবিএম) ছোড়ার। প্রায় আড়াই লাখ মাইল পথ পার হয়ে সেটা আঘাত হানবে চাঁদে। সেই আঘাতের তীব্রতা দেখেই সিদ্ধান্ত হবে পরমাণু ঘাঁটি হিসেবে চাঁদ কতটা উপযুক্ত! এই পরীক্ষার জন্য হিরোশিমায় ফেলা লিটল্্ বয়-এর আকারের পরমাণু বোমা ব্যবহারের কথাও ভাবা হয়েছিল। তবে ওই বিস্ফোরণে চাঁদ ধ্বংস হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কা মোটেই ছিল না।’ লিওনার্দ আরো বলেন, ‘বিস্ফোরণটা পৃথিবী থেকে দেখাও যেত না। খুব ভালো দূরবীন ব্যবহার করেও নয়।’
শেষ পর্যন্ত অবশ্য দিনের আলো দেখেনি এই পরিকল্পনা। কেন? লিওনার্দ বলেন, ‘ব্যাপারটা নিয়ে কিছু দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছিল। চাঁদে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়ানোর ব্যাপারটা কেউই আমরা মানতে পারিনি। এ ছাড়া, এটা সামনে আসার পর আমেরিকা ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা ছিল।’ তাই শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয় এই প্রকল্প। পেন্টাগনে হাজারো ফাইলের ভিড়ে হারিয়ে যায় ‘প্রজেক্ট এ-১১৯’।
তবে প্রায় কল্পবিজ্ঞানকে হার মানানো এই পরিকল্পনা কিন্তু পুরোপুরি গোপন রাখা যায়নি। লিওনার্দর দলের সদস্য ছিলেন এক গ্র্যাজুয়েট ছাত্র কার্ল সাগান। পরে তিনি বিখ্যাত হন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কল্পবিজ্ঞানের কাহিনিকার হিসেবে। তার লেখা ‘কসমস’ সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলে দিয়েছিল। ওই প্রকল্পে কাজ করার পর অন্য একটি চাকরির আবেদনে এ কথা উল্লেখ করেছিলেন সাগান। তখনই বিষয়টা কিছুটা জানাজানি হয় বলে লিওনার্দর দাবি। সাগানের স্ত্রী অবশ্য এই দাবি মানতে চাননি।
এই ‘সর্বনাশা’ কর্মকাণ্ডের কথা আজ আর মনে করতে চান না লিওনার্দ। তিনি বলেন, ‘ওটা খুব সাঙ্ঘাতিক পরিকল্পনা ছিল। এগুলো কল্পবিজ্ঞানের পাতায় বন্দি থাকলেই সবার মঙ্গল।’ কথাটা মোটেই ভুল নয়। কিন্তু একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। কার্ল সাগান নামে অখ্যাত এক গ্র্যাজুয়েট ছাত্রের মনে কল্পবিজ্ঞানের বীজ পুঁতে দেয়ার কাজটা কিন্তু নিখুঁত হাতেই করে গিয়েছিল ছকভাঙা এই চন্দ্রাভিযানের পরিকল্পনা।
