ফানুসিয়ানা আকাশে ফানুসের রাজত্ব

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:০৫

আহসান জোবায়ের

সন্ধ্যা নামতেই আকাশ ঝলমলে ফানুসের দখলে। লাল, নীল, হলুদসহ নানা রঙের ফানুসের রাজত্বে আঁধারী আকাশে কোনো অন্ধকারের ঠাঁই নেই। প্রতিবছর বিশেষ একটি দিনে ফেনী জেলার হাজারো মানুষের প্রাণের মেলবন্ধন হয় এই উত্সবে। সার্বজনীন এই উত্সবে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু সব বয়সের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি যেন মিলনমেলায় পরিণত হয়। ফানুস ওড়ানোকে ঘিরে উত্সবের আমেজ বিরাজ করে পুরো শহরে। এবারের বৈশাখের প্রথম সন্ধ্যায় এ শহরের আকাশে ওড়ে প্রায় ৬ শতাধিক ফানুস। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ ছেড়ে দূরে উড়ে যায় ফানুসগুলো। জানিয়ে দেয়, সকল অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর বার্তা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের অবস্থান।

বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে প্রতিবছর এই উত্সবের আয়োজন করে আসছে ফেনী শহরের  বেশকিছু সংস্কৃতিমনা মানুষ। এই উত্সবের মাধ্যমে ফেনীর একটি নিজস্ব উত্সব প্রতিষ্ঠা করতে এবং এটিকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে চান আয়োজকরা। তাঁরা মনে করেন, ফেনীতে যত বেশি উত্সব-অনুষ্ঠান হবে তত বেশি সাংস্কৃতিককর্মী ও সংগঠক তৈরি হবে। পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদের প্রবণতাও কমে যাবে।

এবারের বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে পহেলা বৈশাখে তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হলো ‘ফানুসিয়ানা’ উত্সব। এ আয়োজনে বিগত ২ বছরের মতো এবারো সম্পৃক্ত হয় শহরের হাজারো মানুষ। বিগত ২ বছরের চেয়ে এবার বড় পরিসরে আয়োজিত হয় উত্সবটি। ওড়ানো হয় ছোট-বড় ৬০০ ফানুস। এরমধ্যে ছিল ঢাউস সাইজের ‘দাদা ফানুস’। ছিল ১৫ মিনিটের মনোমুগ্ধকর আতশবাজি প্রদর্শনী। ফেনী সরকারি কলেজের মূল ভবন, ফেনী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মূল ভবন ও সাবেক অ্যাসেম্বলি হলে করা হয় আকর্ষণীয় আলোকসজ্জা। ভিন্নধর্মী এই উত্সবকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠে ফেনীর সাংস্কৃতিক ও নাট্য সংগঠনগুলো। বছরের অন্য সময়গুলোতে জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো স্থবির থাকলেও বিশেষ এই উত্সবকে সফল করতে সবার মধ্যেই আলাদা এক অনুভূতি কাজ করে। বেগবান হয় সংগঠনের কার্যক্রম।

২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা বর্ষবরণে রাজাঝির দিঘীর পাড়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘প্রথম ফানুসিয়ানা-২০১৭’। ওইদিন ফানুসিয়ানা উদযাপন পরিষদের ব্যানারে ওড়ানো হয় ৪০০ ফানুস। হাজার হাজার ফেনীবাসী ব্যতিক্রমী উত্সবটি উপভোগ করতে ভিড় জমান। তাঁরা দিঘীর চারপাশে অবস্থান নিয়ে উপভোগ করেন ১ ঘণ্টার ফানুস উত্সব। মুহুর্মুহু করতালি আর হর্ষধ্বনিতে স্বাগত জানান এই নতুন আয়োজনকে। একইসঙ্গে আতশবাজির ঝলকানিতে উত্সবটি আরো বর্ণিল হয়ে ওঠে।

ধারাবাহিক এই উত্সব আয়োজনের দ্বিতীয়বারে ফেনী পাইলট হাই স্কুল মাঠে এ উত্সবে ওড়ানো হয় ছোট-বড় ৬০০ ফানুস। তবে সেবার ফানুস ওড়ানোর পাশাপাশি আতশবাজির আয়োজন থাকলেও পবিত্র শবে মেরাজের কারণে এটি বাদ দেওয়া হয়। বিশাল এই আয়োজনের আর্থিক ব্যয় নিজেদের থেকেই করতে পছন্দ করেন আয়োজকরা। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে স্পন্সর হতে চাইলে আর্থিক অনুদান না নিয়ে আনুসাঙ্গিক কিছু যেমন—টি-শার্ট, ক্যাপ ইত্যাদি নিয়ে থাকেন।

আয়োজক কমিটির সদস্য আসাদুজ্জামান দারা বলেন, ‘আমরা চাইছি ফেনীর একটি নিজস্ব উত্সব প্রতিষ্ঠা করতে এবং এটিকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে। দেশের অনেক জেলায় ভিন্ন ভিন্ন উত্সব রয়েছে। পাহাড়ে আছে বিজু-বৈসাবি, কঠিন চিবর দান, সাংগ্রাই, চট্টগ্রামে জব্বারের বলি খেলা, নড়াইলে সুলতান উত্সব, কুষ্টিয়ায় লালন উত্সব, যশোরে মাইকেল মধুসূদন উত্সব ইত্যাদি। এসব উত্সবে দেশের বাইরে থেকেও অনেকে এসে অংশ নিয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের সেরকম কোনো উত্সব-অনুষ্ঠান নেই। তাই এমন ভাবনা থেকেই ফানুসিয়ানার আয়োজন। সবার অংশগ্রহণে ফানুসিয়ানা ধীরে ধীরে ফেনীবাসীর উত্সবে পরিণত হচ্ছে।’

আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক উত্পল সুজন বলেন, ‘বৈশাখের সন্ধ্যায় ফেনীবাসী বছর বরণ করবে ফানুস উড়িয়ে—এটুকু উত্সব কী একটা জনপদে খুব বেশি চাওয়া? ফেনীর মানুষ নিজেদের কিছুটা অগ্রসর ভাবতে ভালোবাসেন, অথচ নিজেদের একান্ত কোনো সার্বজনীন উত্সব নেই। এই শূন্যতা থেকেই আমরা রাজাঝির দিঘীর পাড়ে বন্ধুদের আড্ডার ছলে এই উত্সব আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিই। সেই থেকেই আমরা প্রতিবছর উত্সবটির আয়োজন করছি।’

আয়োজকরা মনে করেন, এ সকল উত্সব-অনুষ্ঠানের আয়োজন হলে সাংস্কৃতিককর্মী ও সংগঠক তৈরি হবে। অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদের প্রবণতা কমবে। সাংস্কৃতিক অঙ্গন সমৃদ্ধ হলে তরুণ সমাজ বিপথে পা বাড়াবে না।

 

নুসরাতের জন্য প্রতিবাদ

বিগত দু-বারের আয়োজনের চাইতে এবারের ফানুসিয়ানা উত্সবটি ছিল আলাদা। উত্সবের ৩ দিন আগে জেলার মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে গায়ে আগুন দিয়ে হত্যা করা হয়। নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে ফেনীর সবচেয়ে বড় উত্সব ‘ফানুসিয়ানা’ শুরুর আগে ১ হাজার মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হয়। এর আগে এ হত্যাকাণ্ডের শোক প্রকাশে কালো ব্যাচ ধারণ করেন উত্সবে আগত কয়েক হাজার মানুষ। উত্সবের প্রবেশমুখে স্থাপন করা হয় প্রতিবাদী মশাল।

উত্সবের অন্যতম আয়োজক সাংবাদিক বখতেয়ার মুন্না বলেন, ‘নুসরাত জাহান রাফির খুনের প্রতিবাদে এবারের উত্সবটি আমরা মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে শুরু করি। কালো ব্যাচ ধারণ করে হাজারো মানুষ একসঙ্গে এ হত্যাকাণ্ডের আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। আমরা চাই এখান থেকেই গড়ে উঠুক বড় প্রতিবাদ।’

 

ছবি :সালমান এইচ চৌধুরী ও ফানুসিয়ানা