নামে সাগর হলেও নীলসাগর আসলে এক বিশাল দীঘির নাম। চারিদিক নানা প্রজাতির গাছগাছালি ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমণ্ডিত বিশাল এই দীঘিটি নীলফামারী জেলার প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।
একনজরে নীলসাগর: নীলফামারী জেলা সদরের গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ধোবাডাঙ্গা মৌজায় ৫৩.৯০ একর জমির ওপর নীলসাগরের অবস্থান। এর জলভাগ ৩২.৭০ একর, এবং চারদিকের পাড়ের জমির পরিমাণ ২১ একরের মতো। নীলফামারী জেলা শহরের জিরো পয়েন্ট চৌরঙ্গী মোড় থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান।
নামকরণ: কথিত আছে, অষ্টদশ শতাব্দীতে রাজার অগণিত গরু- মহিষের পানির চাহিদা মেটাতে প্রায় ৫৪ একর জমিতে খনন করা হয় দীঘিটি। মেয়ে বিন্নাবতীর নামানুসারে এর নাম দেওয়া হয় বিন্নাদীঘি। ১৯৭৮ সালে তত্কালীন মহকুমা প্রশাসকের উদ্যোগে এবং স্থানীয় ব্যক্তিদের মতামত অনুযায়ী বিন্নাদীঘির নাম পরিবর্তন করে ‘নীলসাগর’নামকরণ করা হয়।
নীলসাগরের আকর্ষণ: নীলসাগরের বিশাল দীঘির চারদিকে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছ-গাছালির সমাহার। পানি আর সবুজ মিলে সৃষ্টি হয় এক অপরূপ নৈশর্গিক দৃশ্যের। ছায়াঘেরা দীঘির চারপাশ বাঁধানো। শান বাঁধানো দীঘির চারপ্রান্তে রয়েছে সিঁড়ি। দীঘির পাড়ে পাকা রাস্তার কিছুদূর পর পর দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে সুদৃশ্য বিশ্রামাগার, ছাতাসহ বসার স্থান। এখানে শিশুদের জন্য দোলনা, নাগরদোলারও ব্যবস্থা রয়েছে। শীতকালে সাইবেরিয়াসহ শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে আসা অতিথি পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এটিই মূলত নীলসাগরের প্রধান আকর্ষণ। মাঝপুকুরে বসে ভিনদেশি হাজার পাখির মেলা। দীঘিতে ফোটা শাপলার ফাঁকে ফাঁকে পাখির জলকেলি প্রকৃতিতে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। প্রকৃতির সেই অপূর্ব সৌন্দর্য্য দেখতে শীতকালে এখানে ছুটে আসেন নানা বয়সী মানুষ। কল্পকাহিনী ঘেরা নীলসাগরে প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তিতে বসে মেলা। প্রকৃতির নিবিড় ছোঁয়া পেতে নীলফামারীর মানুষ ছাড়াও ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রংপুর ও দিনাজপুরসহ আশেপাশের জেলাগুলো থেকেও বিপুল সংখ্যক মানুষ অবসরে এখানে ছুটে আসে।
জনশ্রুতি: জনশ্রুতি রয়েছে, ১৯৯৩ সালে সংস্কারের সময় দীঘির তলদেশে পাওয়া গিয়েছিল স্বর্ণ, রৌপ্য এবং কষ্টি পাথরের মূল্যবান মূর্তি। তবে মজার ব্যাপার হলো, মাটির তলদেশে মন্দিরের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও সেখানে বাস করতো বিশাল আকৃতির দুটি মাছ। কথিত আছে, এক সময় নাকি নীলসাগরের পানি শুকানোর জন্য অনেকগুলো মেশিন বসানো হয়েছিল। কিন্তু পানির উচ্চতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। লোকমুখে শোনা যায়, অতীতে গ্রামের লোকজন বিন্নাদীঘির পানিতে গাভীর প্রথম দুধ উত্সর্গ করতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, এতে গাভীর দুধ বেশি হবে এবং অনিষ্টকারীর দৃষ্টি থেকে গাভীটি রক্ষা পাবে।
ফি: নীলসাগরে প্রবেশ ফি জনপ্রতি ৫ টাকা। এখানে বাইসাইকেল পার্কিংয়ের ফি ৫ টাকা, মোটর সাইকেল ২০ টাকা, মাইক্রোবাস ৩০ টাকা এবং বাস পার্কিংয়ের ফি ১শ’ টাকা।
যাতায়াত ও থাকা-খাওয়া: ঢাকা ছাড়াও দূরবর্তী স্থান থেকে নাবিল, হানিফ, শ্যামলী, আগমনী, এসআর পরিবহনের বাসে বা রেলওয়ের নীলসাগর আন্ত:নগর ট্রেনে করে নীলফামারী শহরে আসার পর স্থানীয় পরিবহনে নীলসাগর যাওয়া যায়। নীলফামারী শহর থেকে দেবীগঞ্জগামী বাস ছাড়াও রিকশাভ্যান, মাইক্রোবাস এবং মোটর সাইকেলে করে অনায়াসে যাওয়া যায় নীলসাগরে।
ঢাকা থেকে নীলফামারী যাওয়ার ভাড়া: ট্রেন এসি ৪৪০ টাকা, নন-এসি ২২০ টাকা এবং বাস এসি ৭৫০ টাকা, নন-এসি ৬০০ টাকা। এখানে রাত যাপনের জন্য রেস্টহাউস রয়েছে। জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে ভাড়া নেওয়া যায় নীলসাগরের রেস্টহাউস। ২ কক্ষ বিশিষ্ট রেস্টহাউসে ২৪ ঘন্টার জন্য সিঙ্গেল বেডরুমের ভাড়া ২০০ টাকা এবং ডাবল বেডরুমের ভাড়া ৪০০ টাকা। আর থাকা- খাওয়ার জন্য এখানে আলাদা কোন রেস্টুরেন্ট নেই। তবে রেস্টহাউস কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা খাবারের ব্যবস্থা করে দেন। এছাড়া জেলা সদরে হোটেল অবকাশ-০১৭৩৩৫১৮৭৫২, হোটেল আর, রহমান-০১৫৫৬৫০১৬৬৭, হোটেল শিশির-০১৭১২৫৬৫১৬৬, নাভানা রেস্ট হাউস-০১৭১১১৭৮৮২৩ বুকিং দিয়ে এসি বা নন এসি ৩০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকায় ভাড়া পাওয়া যায়। এছাড়া আকাশপথে ঢাকা থেকে সৈয়দপুরে ৫ হাজার ৫শ’ টাকায় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজে আসতে পারেন। এখানে হোটেল আরাফাত (০৫৫২৬-৭২৬২২), হোটেল সৌদিয়া (০৫৫২৬-৭৩১৪৯), হোটেল প্রিন্স (০৫৫২৬-৭২২৬২), হোটেল আল রাজ (০৫৫২৬-৭৩১৩৭), হোটেল সম্রাট (০৫৫২৬-৭২১৩০) ও হোটেল টাইম স্টার (০৫৫২৬-৭২৫৯৩) বেশ কয়েকটি ভালো মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। এর বাইরেও থাকা-খাওয়ার জন্য নীলফামারী সার্কিট হাউস, সৈয়দপুর রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব, ডাকবাংলো, পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউস রয়েছে। যেগুলোতে থাকতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নিতে হবে।
আর দেরি নয়: নানা সমস্যার পরও নীলসাগর জেলার একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র। দর্শনার্থী বাড়লে এবং সরকার একটুখানি আন্তরিক হলে এখানকার সমস্যাগুলোর সমাধান হবে অনেকাংশে। তাই আর দেরি না করে ঘুরে আসুন নীলসাগর, সবুজ গাছগাছালির ছায়াঘেরা দীঘিতে অতিথি পাখিদের জলকেলি দেখার এখনই উপযুক্ত সময়।
