এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৩০
এ দেশের সড়ক-মহাসড়কে নিয়মিতভাবে ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলো কি কপালের লিখন? যদি তা-ই হয়, তাহলে তা খণ্ডনীয় নয়। কারণ বলা হয়ে থাকে ‘কপালের লিখন না যায় খণ্ডন’। উন্নত দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার এ দেশের তুলনায় অনেক কম। তাহলে কি কপালের লিখন দেশভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে? নিশ্চয় না এবং তা হবারও কথা নয়। এ ক্ষেত্রে মূলত যে বিষয়গুলো এ পার্থক্যের সৃষ্টি করছে সেগুলো হচ্ছে সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ধরন, চালকদের দক্ষতা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা প্রভৃতি। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ১১ মে একই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় সাংবাদিক বিভাস চন্দ্র সাহা, শহীদুজ্জামান, বর্ষীয়ান রাজনীতিক ইফতেখার হোসেনসহ ঝরে যায় ১৫টি অমূল্য প্রাণ। গত ৩১ অক্টোবর নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান দেশের কৃতী শ্যুটার ফিরোজ হোসেন পাখিসহ তাঁর তিন বছরের মেয়ে পুষ্পিতা হোসেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গড় দেড় বছরে শুধু ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন অন্তত ১৮০ জন। আহত হয়েছেন সহস্রাধিক। সরকারি হিসেবে গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অবশ্য বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা অনেক বেশি। বেসরকারি সূত্রগুলো বলছে, এক বছরেই দেশে মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারি আর বেসরকারি হিসেবের সংখ্যাগত পার্থক্য থাকলেও দেশে যে প্রতিনিয়তই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে এবং এর ফলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনা কি এভাবেই ঘটতে থাকবে? প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তিই এ প্রশ্নের উত্তরে বলবেন, ‘ না, এ অবস্থা চলতে পারে না। এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না।’ সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনারোধে সরকারসহ সকলের পক্ষ থেকে দ্রুত সমাধানের উপায় খোঁজাসহ এর বাস্তবায়ন জরুরি। আর সড়ক দুর্ঘটনা রোধের উপায় খুঁজতে হলে সর্বাগ্রে সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। অধিকাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী নির্দিষ্ট লেন ধরে গাড়ি না চালিয়ে সড়কের মাঝ দিয়ে চালকদের গাড়ি চালানো, রাস্তার বিপজ্জনক বাঁক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, চালকদের বেপরোয়া গতিসহ ভুলপথে বেপরোয়া যান চালানো। তাছাড়া মহাসড়কগুলোতে বেশি গতির বড় গাড়িগুলোর প্রবণতা থাকে কমগতির ছোট গাড়িগুলোকে ওভারটেকিং করার, যা সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ। পাশাপাশি নদী সংলগ্ন এলাকায় রাস্তায় বাঁক অনেক বেশি থাকে। যেসব মোড়ে বাঁক বেশ বাঁকা (৪০০-৫০০-এর কাছাকাছি) সেসব সড়কে যানবাহনের চালকেরা একপাশ থেকে অন্যপাশ দেখতে পান না এবং বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের প্রকৃতি, আকার-আকৃতি ও ধরন সম্পর্কে তেমন কিছুই বুঝতে পারেন না। মাঝে মাঝে হেলপার চালকদের উদ্দেশে বলে থাকেন, ‘ডাবল আসছে, সিঙ্গেল আসছে’। কিন্তু এ থেকে চালকরা পুরোপুরি বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির ধরন সম্পর্কে বুঝতে পারেন না। ফলে এসব বাঁকের কারণে ওইসব এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ ধরনের বাঁকে আয়না বা আয়না জাতীয় বোর্ড রাস্তার ওপর এমনভাবে স্থাপন করা প্রয়োজন যার মাধ্যমে অন্যপাশের আগত গাড়িগুলোর ধরন সম্পর্কে জানা সম্ভব হবে। তাছাড়া বাঁক সংলগ্ন গাছের ডালপালা তিন-চারমাস পর পর কাটা প্রয়োজন। তাহলে চালকগণ উলটোদিক থেকে আসা গাড়িগুলোর ধরন দেখতে পাবেন এবং যানবাহনগুলোকে আগেই চিহ্নিত করে দুর্ঘটনা এড়াতে সক্ষম হবেন। সর্বোপরি, সড়ক দুর্ঘটনারোধে সর্বাগ্রে চালকদের হতে হবে দক্ষ, হতে হবে সতর্ক। পাশাপাশি জনগণকেও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোরতার সঙ্গে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ যে অপরিহার্য তা বলা বাহুল্য। গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইলফোনে কথা বলাসহ চালকদের ‘ওভারটেকিং’ করার মানসিকতাও পরিহার করা প্রয়োজন। তাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশের সার্বিক সড়কব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোসহ চালকদের দক্ষতা বিচার করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি না ঘটে সে বিষয়টিও সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা দরকার। আর সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা বা শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা থাকাও আবশ্যক। আর এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সকলের আন্তরিক প্রয়াস। এ বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব হলেই দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদের পরিবর্তে হয়ে উঠবে নিরাপদে চলার পথ। ঢাকা