ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাওরে নির্মিত ফসল রক্ষা বাঁধকে স্থায়ী সড়কে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন হাওর পাড়ের বাসিন্দারা। এদিকে প্রতিবছর ফসল রক্ষা বাঁধ সংস্কারের জন্য মাটিও পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন, আগামীতে বাঁধ নির্মাণে পর্যাপ্ত মাটি পেতে ফসলি জমি কাটতে হবে। তাই সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় বাঁধকে স্থায়ী সড়কে রূপান্তর করা জরুরি। তারা মনে করেন, বাঁধগুলো সড়ক হিসাবে স্থায়িত্ব পেলে প্রতিবছর সরকারের শত কোটি টাকার সাশ্রয় হবে এবং বহুমুখী সুফল পাওয়া যাবে। তাছাড়া, পরিবেশ সুরক্ষা ও গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলার ১১টি উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় এক হাজার কিলোমিটার ‘ডুবন্ত বাঁধ’ রয়েছে। এগুলো বোরো মৌসুমে হাওর রক্ষা বাঁধ হিসাবে প্রতি বর্ষার আগে নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণ করা হয়। এবছরও সরকারের সাড়ে ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘হাওর রক্ষা’ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। পিআইসির মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ৫৭২টি প্রকল্পের কাজ হয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালে পাহাড়ি ঢলে জেলার সকল হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে গেলে জেলার সব কটি হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণ খাতে সরকার ১৯১ কোটি টাকা ব্যয় করে। এদিকে বছর বছর বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয়ে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটস্থ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী নিজামুল হক ভূইয়া বলেন,‘ফসল ও হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য স্থায়ী ব্যবস্থার উপায় বের করতে হবে।’
অন্যদিকে, বোরো ধান ঘরে উঠে গেলে শত কোটি টাকা ব্যয়ের হাওর রক্ষা বাঁধের আর কোনো খোঁজ রাখা হয় না। তখন দুর্বৃত্ত চক্র বর্ষাকালে যেখানে সেখানে এই মাটির বাঁধ কেটে দেয় মাছ ধরার জন্য অথবা নৌকায় অবাধে চলার জন্য। হাওরপাড়ের বাসিন্দারাও অনেক সময় বন্যার পানির অতিরিক্ত চাপ কমাতে বাঁধ কেটে দেন অপরিকল্পিতভাবে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, বর্ষায় হাওরে বিশাল জলরাশির নিষ্কাশন এবং জীববৈচিত্র্য ও মত্স্য ভাণ্ডারের গুরুত্ব বিবেচনায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয় না। তাই আমরা এর বিকল্প হিসেবে হাওরে স্থায়ী ‘কজওয়ে’ নির্মাণের বিষয়টি প্রস্তাবনা আকারে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছি। আশাকরি সুফল আসবে।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফসল রক্ষা বাঁধের পাশে অবস্থিত রায়পুর গ্রামের বাসিন্দা নিখিল চন্দ্র বর্মণ, বাহদুরপুর গ্রামের স্বপন কুমার দেব, ফতেপুর গ্রামের সেলিম উদ্দিনসহ অনেকেই জানান, বিশ্বম্ভরপুর বাজার থেকে ফতেহপুর ইউনিয়নের খরচার হাওরপাড়ের রাধানগর, রায়পুর, বাহাদুরপুর গ্রাম হয়ে জিরাগ তাহিরপুর পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণ হয়ে সাচনা-নিয়ামতপুর সড়কে মিলিত হয়েছে। অপরদিকে, বিশ্বম্ভরপুর গ্রামের পশ্চিম দিক থেকে আঙ্গারুলি হাওরপাড়ের ফুলভরি, গোপালপুর, চান্দারগাঁও, রঙ্গারচর ও উমেদপুর হয়ে তাহিরপুর উপজেলার হালির হাওর ও শনির হাওরপাড়ের বালিজুরী ইউনিয়নের বালিজুরী ও আনোয়ারপুর গ্রামে গিয়ে ফসল রক্ষা বাঁধ মিলিত হয়েছে। এই দুই বাঁধকে স্থায়ী সড়ক হিসাবে রূপান্তর করা হলে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সাথে সহজ সড়ক যোগাযোগ সৃষ্টি হবে। তারা জানান, এবারো এই ফসল রক্ষা বাঁধের উপর যে পরিমাণে মাটি পড়েছে- বর্ষায় তা সুরক্ষা হলে আগামী বছর পাকা সড়ক নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমীর বিশ্বাস বলেন, ‘ফসল রক্ষা বাঁধের উপরিভাগে ব্লক এবং সাইটে গার্ডওয়াল দিয়ে স্থায়ী সড়ক করা যায়। এ ক্ষেত্রে বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ক্লোজারগুলোকে সচল রাখতে হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ইত্তেফাককে বলেন, যাতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে পারি সেই লক্ষ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আমাদের নির্দেশনা প্রদান করছেন। তাই আমরা নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।
