গত ১৭ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে মো. আবদুল লতিফ মন্ডল-এর ‘রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার ক্ষমতা যেন অপব্যবহার না হয়’ শিরোনামের তথ্যবহুল লেখাটির জন্য ধন্যবাদ। বিষয়টি নিয়ে ভেবেছি অনেক সময়। তথ্য-উপাত্ত ও সময়ের অভাবে ইচ্ছা থাকলেও লেখা হয়নি। গত ১৪ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সংক্রান্ত যে তথ্য দিয়েছেন তাতে জানা গেলো এই পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী ক্ষমা পেয়েছে ২৫ জন। এর মধ্যে ২১ জন কেবল আওয়ামী লীগের বর্তমান আমলে। এছাড়া এরশাদ আমলে ১জন, বিএনপির সময় ২ জন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে একজন প্রেসিডেন্টের ক্ষমা সুন্দর মহানুভবতায় ধন্য হয়েছে। এটা লক্ষণীয়, প্রতিটি ক্ষমার পেছনে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ চেতনার প্রভাব স্পষ্ট। অথচ অনুরাগ-বিরাগ বর্জিত হয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শপথ নিয়েই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। তা হলে ব্যাপারটি কী দাঁড়ালো? আবার সংবিধানে ৪৮ (৩) ধারায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব করে বলা হয়েছে: “প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁর অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।” অর্থাত্ রাষ্ট্রপতি এই পর্যন্ত ২৩ জনকে ক্ষমা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই। আর এই পরামর্শ মানেই যে নির্দেশ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শিকারের মতো ক্ষমার নেপথ্যে থাকছেন প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু দায়িত্বটা রাষ্ট্রপতির।
৪৮ (৩) ধারার ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের কেউই কোনোদিন টুঁঁ শব্দটি করেনি, কারণ এর উপকারভোগী তো তারা নিজেরাই। জনগণের কল্যাণ বা ইনসাফ যেহেতু এর উদ্দেশ্য নয় সেহেতু এই বিধান কোনো মহত্ উদ্দেশ্যে এই পর্যন্ত ব্যবহূত হয়নি এবং প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, কোনোকালে তা হবেও না। অথচ প্রতিটি ক্ষমার পরই বিরোধী দল থেকে প্রতিবাদ উঠেছে রাষ্ট্রপতি তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে। নিজ নিজ পছন্দের খুনি-সন্ত্রাসীদের রক্ষার জন্যই যে এই ক্ষমতা পর পর ব্যবহূত হয়েছে অনৈতিকভাবে, তা ক্ষমাপ্রাপ্তদের পরিচয় যাচাই করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। এমনটি হলে ‘ভীতি-বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া’ দায়িত্ব পালন করার শপথ নেয়ার কী তাত্পর্য থাকতে পারে জনগণের কাছে? যে কোনো সংবিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সমার্থকও বলা যায়। সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষার দোহাইও প্রায় শোনা যায়। কিন্তু কোনো পবিত্র বস্তুকে কেউ অপবিত্র বললেই সেটা অপবিত্র হয়ে যায় কি? দুঃখজনক কথা হলো, সংবিধান প্রণেতাদের দ্বারাই অনেক সময় সংবিধানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়ে থাকে সংকীর্ণ স্বার্থ চিন্তার অনুপ্রবেশের কারণে।
যে কথা বলছিলাম—রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমার এখতিয়ার কার স্বার্থে? এটা কি মজলুমের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে, নাকি জালিমকে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে সহায়তা দিচ্ছে এটা কি আইনের শাসনে শ্রদ্ধাশীল সুনাগরিক হতে উত্সাহ দিচ্ছে না সন্ত্রাসী অসত্ নাগরিক তৈরিতে প্রেরণা যোগাচ্ছে? এই ক্ষমার পরিণামে আমরা কি দেখতে পাচ্ছি যে, আইনের প্রত শ্রদ্ধাবনত হয়ে গেছে সন্ত্রাসী? বরং মুক্তির অলিখিত চুক্তি অনুযায়ী অনুগ্রহের প্রতিদান দিতে পরিত্যক্ত ছোরা আর পিস্তলটাই তো ফের হাতে তুলে নিতে দেখা যাচ্ছে। ধরা যাক ‘ক’ কোনো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্মী তথা সন্ত্রাসী। খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বা প্রতিপক্ষের চোখ উপড়ে ফেলার মতো অপরাধে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো। তার ক্ষমার আবেদন প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ নিয়ে রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হলো আর সে অবধারিত ক্ষমাও পেয়ে গেলো। ‘খ’ একই দলের আর এক ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনে ব্যালট বাক্স লুট বা প্রতিপক্ষের সভা পণ্ড করতে তার জুড়ি নেই। খুনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামীও ‘ক’-এর মতোই রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সুন্দর বিবেচনায় ধন্য হলো। এই ক্ষমা চক্ষু উত্পাটিত ব্যক্তি বা ধর্ষিতা নারীর অথবা নিহত ব্যক্তির বিধবা স্ত্রী বা এতিম সন্তান বা বৃদ্ধা মায়ের শোক ও হতাশা বৃদ্ধি ছাড়া কী সান্ত্বনা বা প্রতিকার বয়ে আনতে পারে? বরং এই মুক্তি মজলুমের জন্য আরো ভয় ও ত্রাসের কারণ হয়েই দেখা দেয়। সমাজ আইন প্রশাসনের প্রতি জন্ম দেয় ক্ষোভ, ধিক্কার ও অনাস্থা, যার থেকে জন্ম নিতে পারে আর একটা সন্ত্রাসী বা আইন শৃঙ্খলা বিরোধী ঘটনা।
মো. আবদুল লতিফ মন্ডল তাঁর নিবন্ধের শিরোনাম দিয়েছেন ‘রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার ক্ষমতা যেন অপব্যবহার না হয়’। কিন্তু তাঁর মন্তব্য ও তথ্য-উপাত্ত তো এটাই প্রমাণ করে যে ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া এর থেকে এই পর্যন্ত ভালো কিছু পাওয়া যায়নি এবং আগামী দিনেও পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ ‘ইন্নামাল আমালু বিন নিয়াত’। পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ প্রসূত এই বিধান আমাদের আত্মসমর্পণেরই এক দলিল, যা ইনসাফ ও মানবতার বিপক্ষে জালিমকে সহায়তা করা ছাড়া কোথাও কোনো সুযোগ দিতে পারেনি কোনোদিন।
সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে—রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা (যদিও আক্ষরিক অর্থে) উচিত কি অনুচিত, কেন এবং কীভাবে? এটা কি একজন মজলুম নাগরিকের বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার খর্ব করে? এটা কি আইনের শাসনের পরিপন্থি বা ‘সবার উপরে আদালত’ এই চিরন্তন সার্বভৌমত্বের ধারণাকে ক্ষুণ্ন করে? প্রশ্নবিদ্ধ করে কি এর ধারণা, চেতনা ও উদ্দেশ্যকে?
তবে রাষ্ট্র ও নাগরিক সকলের অভিভাবক বলে রাষ্ট্রপতি বাদি-বিবাদি উভয়েরই অভিভাবক। সুতরাং দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট আদালতের মাধ্যমে সরাসরি রাষ্ট্রপতির বরাবরে আবেদন জানাতে পারেন। এতে প্রশাসনের কোনো বিভাগ যেমন আইন-স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমনকি প্রধানমন্ত্রীরও কোনো ভূমিকা থাকা শুধু অপ্রয়োজনীয় নয় বরং অবাঞ্ছিত। এখানে রাষ্ট্রপতি যে কাজটা করতে পারেন তা হলো, তিনি প্রয়োজন বোধ করলে বাদিপক্ষ ও তার আইনজীবীকে ডেকে বিষয়টি সুরাহা করার চেষ্টা করতে পারেন তবে কোনোরকম চাপ প্রয়োগে নয়। এতে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে তা সন্তোষজনক ফয়সালা করে দিতে পারেন ক্ষতিগ্রস্ত তথা বাদিপক্ষের সন্তুষ্টি, স্বার্থ ও নিরাপত্তার হানি না ঘটিয়ে।
এখানে আর একটি বিবেচ্য বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তির আইন-শৃঙ্খলা বিরোধী কোনো অপকর্মের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে তেমন নয়, বরং এর মন্দ প্রভাবে প্রভাবিত হয় পরিবার সমাজ এমনকি রাষ্ট্রও। একটি অপরাধ একাধিক অপরাধের কারণ হতে পারে, উত্সাহিত হতে পারে অপরাধ সংঘটনে অন্যরাও। যে লোকটিকে খুন করা হলো, কোনো বিনিময়ই তাকে ফেরত দিতে পারে না, যার অঙ্গহানি ঘটলো বা সম্ভ্রম হারালো যে নারী বাকি জীবন সেই শুধু এই যন্ত্রণা ভোগ করবে তাই কেবল নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সকলকে এমনকি সমাজকে এই জীবন যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় যুগ যুগ ধরে। সুতরাং প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো বিনিময়ে ক্ষমা করলেও রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষতি থেকে তাকে রেহাই দেয়া যায় না, আর এই এখতিয়ার নেই কারোই। সুতরাং ন্যূনতম শাস্তি তাকে পেতেই হবে সেটি একদিনের জন্য হলেও। মোট কথা আমরা যথাযথ ক্ষেত্রে ক্ষমার বিপক্ষে নই তবে তার নৈতিক ভিত্তি থাকবে যেমনি শক্ত তেমনি এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে এতে মজলুমের স্বার্থ ও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়নি আর ক্ষতিকর দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়নি সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও।
গাজীপুর
