বিভ্রান্ত হবেন না, যুদ্ধাপরাধের বিচার হবেই :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৪
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, স্বাধীনতা বিরোধী ও তাদের দোসররা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে এবং এতে বিলম্ব ঘটাতে অনেক বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করবে। সরকারকে যে কোনোভাবে কালিমালিপ্ত করে ও ব্যতিব্যস্ত রেখে এ বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে চায় তারা। তবে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। যত বাধাই আসুক আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবোই। ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধভাবে সজাগ ও সতর্ক থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। গতকাল শুক্রবার বিকালে ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শুরু হয়েছে। যে শক্তি যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের ক্ষমতার অংশীদার করেছিল, লাখো শহীদের রক্তভেজা জাতীয় পতাকা যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে-বাড়িতে তুলে দিয়েছিল, যারা বঙ্গবন্ধু ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী খুনিদের সমর্থন ও পুনর্বাসিত করেছিল—সেই শক্তির ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় অবশ্যই তাদের ষড়যন্ত্র থাকবে। তারা এ বিচার প্রক্রিয়াকে বানচাল করতে নানা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, যারা চান বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত মোকাবিলা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে কলুষমুক্ত করতে হবে। যারা চায় না বাঙালি জাতি বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হোক, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ স্বাবলম্বী হোক, সুখি-সমৃদ্ধ দেশ গড়ে উঠুক, তাদের ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবেই মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময়ই উজান ঠেলে তীরে নাও ভিড়ায়। তাই সকল ঝড়-ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে শক্তহাতে হাল ধরে আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতেই হবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী সবার সহযোগিতাও কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, আমাদের এতটুকু অপরাধ হলে হেডলাইনসহ প্রথম পাতায় বিশাল বিশাল নিউজ ছাপানো হয়। আর যুবদল-ছাত্রদল বড় অপরাধ করলেও তা পেছনের বা ভেতরের পাতায় ছোট করে ছাপানো হয়। এটা কেমন খেলা? অবরোধ বা হরতালের নামে অ্যাম্বুলেন্সে হামলা চালিয়ে রোগীকে মেরে ফেলা হলেও তাদের কাছে তার কোনো গুরুত্ব নেই। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কাদের মদদ দেয়ার জন্য এসব করা হচ্ছে? যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতেই কী এসব খেলা? এ সময় বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ না করে এর প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দল ও সকল সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা এখন ক্ষমতায়। এ সময় অনেকেই ভোল পাল্টিয়ে আমাদের দলে ঢুকে নানা অপকর্ম চালিয়ে সরকারের ওপর অপবাদ দেয়ার চেষ্টা করবে। দলে নেয়ার সময় এ ব্যাপারে সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণায় বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে উনি (খালেদা জিয়া) বিজয়ের মাসে হরতাল-অবরোধ দিয়ে মানুষ খুন করছেন, তাণ্ডব চালাচ্ছেন, পেট্রোল ঢেলে মানুষ পুড়িয়ে মারছেন। তাদের আক্রমণ থেকে অ্যাম্বুলেন্সের রোগীও রেহাই পাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মার্শাল ল দিয়ে ক্ষমতা দখল করে জেনারেল জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেন, কারাগার থেকে ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি দিয়ে তাদের অপরাধ ধুয়ে মুছে কলুষমুক্ত করার চেষ্টা করেন। একাত্তরের চেতনা ধ্বংস, বঙ্গবন্ধু ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের মদদ দেয়া ও রাজনীতিতে পুনর্বাসন করাই ছিল তার একমাত্র কাজ। আইয়ুব-ইয়াহিয়ার দোসর হিসাবে জেনারেল জিয়া বিজয়ের ইতিহাস একে একে মুছে দিয়েছিলেন। তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে তুলে দিয়েছিলেন লাখো শহীদের রক্তভেজা পতাকা। এই খালেদা জিয়ার বদৌলতেই শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা মাথায় নিয়েই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। এখন তিনি যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় বিজয়ের মাসে আন্দোলন করছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ বিশেষ করে যুব ও নতুন প্রজন্মের সন্তানরা এখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের শিকড়ের সন্ধানে নেমেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন করে জেগে উঠেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমরা হঠাত্ করেই শুরু করিনি। আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবো। এই প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা রেখে দেশের মানুষ এতো বিশাল সংখ্যক আসন দিয়ে আমাদের বিজয়ী করেছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে আগে কেউ এতো আসন পায়নি। আমরা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। যতই ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত হোক না কেন, সবকিছু মোকাবিলা করে আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে করবোই করবো। জাতীয় সংসদের উপনেতা ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনায় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ড. প্রণব কুমার বড়ুয়া, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, বিএমএ’র সভাপতি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান, নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ আজিজ ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম। সভা পরিচালনা করেন নূহ উল আলম লেনিন ও অসীম কুমার উকিল। সভার শুরুতেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করা হয়। কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে ‘বৃহত্তর জামায়াতের মহিলা আমির’ হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেন, আগে বলা হতো বিএনপি-জামায়াত, এখন সবাই বলে জামায়াত-বিএনপি। এখন খালেদা জিয়া বিএনপির নেত্রী নন, বৃহত্তর জামায়াতের মহিলা আমির। আর জামায়াত হচ্ছে যুগ যুগের দালাল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মওদুদি ব্রিটিশের দালালি করেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, আর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দালালি করেছে জামায়াত। তিনি বলেন, জামায়াত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নামে প্রতিপক্ষের হাত-পায়ের রগ কাটা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা এবং অগ্নিসংযোগ করছে। এরা ক্যাডার সৃষ্টি করে। মার্কিন কূটনীতিকদের নাম উল্লেখ না করে কৃষি মন্ত্রী বলেন, ব্রিটিশদের পরাজিত করার পর জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন, তিনি পরাজিত সৈন্যদের কিছু বলবেন না। কিন্তু যারা ব্রিটিশ সৈন্যদের বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছেন- তাদের জন্য একটি গুলিও খরচ করবেন না, তাদের গরম আলকাতরায় চুবিয়ে মারা হবে। কিন্তু আমাদের দেশে এমনটি নয়, আমরা শুধু তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি বলে উল্লেখ করেন মতিয়া চৌধুরী। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, জেনারেল জিয়া গোলাম আযমকে পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে এনে নাগরিকত্ব দিয়েছেন, তার স্ত্রী খালেদা জিয়া নিজামী-মুজাহিদদের মন্ত্রী বানিয়ে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছেন, আর তার ছেলে তারেক রহমান যুদ্ধাপরাধীদের অর্থনৈতিক সুযোগ দিয়েছেন। শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী স্বাধীনতার ৪১ বছরেও বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিচারহীনতার যে কী কষ্ট ও বেদনা তা গত ৪১ বছর ধরেই সহ্য করছি। অনুষ্ঠানে বক্তারা জামায়াত-শিবিরকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে আখ্যায়িত দিয়ে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান।