বিনম্র শ্রদ্ধায় জাতি স্মরণ করেছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবির মধ্য দিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় গতকাল শুক্রবার জাতি পালন করলো শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। শোকসন্তপ্ত হাজার হাজার মানুষের স্রোত এসে মিলেছিল স্মৃতিসৌধে। আবালবৃদ্ধবনিতা শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা জানিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা আর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রকে প্রতিহত করার আহ্বান জানান। ভোর থেকেই মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ আর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে মানুষের ঢল নেমেছিল। বিজয়ের ৪১ বছর পেরিয়ে এসে শহীদ পরিবারের সদস্যরা আজো পায়নি তাদের স্বজন হারানোর বিচার। যুদ্ধে যারা পাকবাহিনীর দোসর হিসাবে কাজ করেছিল সেই রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যদের বিচার হয়নি আজো। সেই বিচার কার্যক্রমকে নস্যাত্ করতে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তত্পর। যে স্বপ্ন দেখে যুদ্ধক্ষেত্রে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধারা তাদের স্বপ্নের সেই সাম্যের দেশ আজো হয়ে ওঠেনি আমাদের বাংলাদেশ। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আর লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধার সেই স্বপ্নসাধ পূরণের দাবি ওঠে এই শহীদ বেদী থেকে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় লাভের মাত্র দু’দিন আগে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসর আলবদর, আলশামস ও রাজাকাররা দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের ১৪ ডিসেম্বর নৃশংসভাবে হত্যা করে।
গতকাল শুক্রবার ভোরের সূর্য ওঠার আগেই হাজারো মানুষ ভিড় করেন মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের সামনে। সবার হাতে ফুলের তোড়া, কালো ব্যানারে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে লেখা ‘বুদ্ধিজীবীর স্মরণে ভয় করি না মরণে’, ‘বুদ্ধিজীবীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘জামায়াত, শিবির, রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’। আর কণ্ঠে একাত্তরের ঘাতক রাজাকার, আলবদর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে স্লোগান, দীর্ঘ লাইনে দাঁঁড়িয়ে স্মৃতিস্তম্ভের বেদীমূলে যাওয়ার অপেক্ষা। সকাল ৮টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে পৌঁছান এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ এডভোকেট শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, এলজিআরডি ও সমবায় মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, তোফায়েল আহমেদ এমপি ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আবদুস শহীদ।
এছাড়া আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুল-উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এডভোকেট আফজাল হোসেনসহ সংসদ সদস্য এবং দলের ও এর অঙ্গ সংগঠনের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন।
এর পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ত্যাগ করার পর স্মৃতিস্তম্ভ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খুলে দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর পরপরই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শহীদ পরিবারের স্বজনরা। শহীদ পরিবারের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার দলীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতাদের নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, নজরুল ইসলাম খান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রমুখ। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানোর পালা শুরু হয়। একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করে মনজুরুল আহসান খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), রাশেদ খান মেনন এমপির নেতৃত্বে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, ডা. এসএ মালেকের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু পরিষদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বিপ্ল¬বী ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, এলডিপি, এমএ আজিজ ও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, ওমর ফারুক চৌধুরী ও হারুন-অর রশিদের নেতৃত্বে আওয়ামী যুবলীগ, আশরাফুন্নেসা মোশারফের ও পিনু খান এমপির নেতৃত্বে মহিলা আওয়ামী লীগ, নাজমা আক্তার ও অপু উকিলের নেতৃত্বে যুব মহিলা লীগ, মোল্ল¬া মোহাম্মদ আবু কাওছার ও পঙ্কজ দেবনাথের নেতৃত্বে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, এইচএম বদিউজ্জমান সোহাগ ও সিদ্দিকী নাজমুল আলমের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রদল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, উদীচী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অপরাজেয় বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রঐক্য ফোরাম, স্বাধীনতা ফাউন্ডেশন, বাংলা একাডেমী, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, মহিলা পরিষদ, তরিকত ফেডারেশন, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় যুব সংহতি, মিরপুর বাংলা কলেজ, হযরত শাহ আলী মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, শিশু-কিশোর পরিষদ, বঙ্গবন্ধু নতুন কুঁড়ি বিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু বিদ্যা নিকেতনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মী। এছাড়াও অনেকে আসেন ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা জানাতে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে জাতীয় পার্টি-জেপি’র পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৮টায় মিরপুরস্থ শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে, সকাল সাড়ে ৯টায় রায়ের বাজারে বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। জাতীয় পার্টি-জেপি’র মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বে দলের পক্ষ থেকে মিরপুরস্থ শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণকালে নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মফিজুল হক বেবু, এজাজ আহমেদ মুক্তা, অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী, ভাইস চেয়ারম্যান আজিজ বাঙাল, যুগ্ম মহাসচিব খলিলুর রহমান খলিল, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু, দপ্তর সম্পাদক এম, সালাহউদ্দিন আহমেদ, প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম তপন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, সমাজ কল্যাণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান বাবু, শিক্ষা সম্পাদক এডভোকেট এনামুল ইসলাম, রুবেল, যুব সংহতির সভাপতি এম, এ কাইয়ুম, সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম প্রমুখ। এরপর দলের নেতৃবৃন্দ রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।
রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ শেষে মো.পুর যুব সংহতির উদ্যোগে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে এক স্মরণ সভা দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন দলের মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম। প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ শহীদুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে মানুষের ঢল
গতকাল রায়েরবাজার বধ্যভূমির স্মৃতিসৌধে মানুষের ঢল নামে। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই হাজারো মানুষ ভিড় করেন । তাদের হাতে ছিল ফুলের তোড়া, কালো ব্যানার,ব্যাজ। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে ফুলে ফুলে ভরে উঠে স্মৃতিসৌধের বেদী। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ছাড়াও নানা বয়সী মানুষ শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। বিকালে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক।
এছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, গণতন্ত্রী পার্টি, জেএসডি, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু নাট্য ও চলচ্চিত্র পরিষদ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, উদীচী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অপরাজেয় বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রঐক্য ফোরাম, স্বাধীনতা ফাউন্ডেশন, বাংলা একাডেমী, মহিলা পরিষদ, তরিকত ফেডারেশন, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ প্রভৃতি সংগঠনের নেতারা ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিজয়ের আগে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিত্সক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিকসহ বহু প্রগতিশীল বাঙালিকে হত্যা করা হয়। ঢাকায় এই বুদ্ধিজীবীদের লাশ রায়েরবাজার ইটের ভাটার কাছে ফেলে রাখা হয়। সেই থেকে এলাকাটি ‘রায়েরবাজার বধ্যভূমি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
