প্রাচীন আটিয়া মহকুমা থেকে আজকের টাঙ্গাইল

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৪
যমুনা, ধলেশ্বরী, লৌহজং ও বংশাই নদীবিধৌত টাঙ্গাইল জেলা এক সময় বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত মহকুমা ছিল। সাহিত্য-সংস্কৃতি আর ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ টাঙ্গাইল ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ১৯তম জেলা হিসেবে উন্নীত হয়। টাঙ্গাইল বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদ হলেও প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে ময়মনসিংহের বেশকিছু অংশসহ সমূদ্রগর্ভে ছিল বলে ভূতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকদের ধারণা। সে সময় শুধুমাত্র মধুপুর-ভাওয়াল বনাঞ্চল শৈলশিলার উচ্চতা নিয়ে বিরাজমান ছিল। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, প্রাচীন যুগে টাঙ্গাইল ছিল আসাম-কামরূপ রাজ্যের অংশ। সেন বংশের রাজা নৃপতি সেনের আমলে টাঙ্গাইল সেনদের অধীনে আসে। এখানে মুসলমান রাজ্যের সূচনা হয় চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম দিকে। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুফাখখারুল ইসলাম তার ‘টাঙ্গাইল জেলার সাধারণ ইতিহাস প্রসঙ্গে’ শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মীর কাশিম নওয়াব হওয়ার পর খাজনা আদায়ের যে নতুন বন্দোবস্ত করেন তার আওতায় টাঙ্গাইল অঞ্চলের আটিয়া, কাগমারী, বড়বাজু, হোসেনশাহী ইত্যাদি পরগনার দায়িত্ব চারজন মুসলমান তালুকদার প্রাপ্ত হন। পূর্ব থেকেই কাগমারীর জমিদার ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলমান ইনায়াতুল্লাহ খাঁ চৌধুরী। তার বাড়ি ছিল বর্তমান টাঙ্গাইল শহরের উত্তর-পশ্চিম কোণে। তার নামানুসারেই এলাকাটির নাম এখন পর্যন্ত ইনায়াতপুর। ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে আটিয়া, পিংনা ও মধুপুর থানা সমন্বয়ে আটিয়াকে মহকুমায় উন্নীত করা হয়। এরপর আটিয়া মহকুমা সদর টাঙ্গাইলে স্থানান্তরিত হলে আটিয়া মহকুমা নামটির বিলুপ্তি ঘটে। নামকরণ : টাঙ্গাইলের নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। নবাব মুর্শিদ কুলী জাফর খাঁর আমলে টাঙ্গাইল ছিল কাগমারী পরগনার অন্তর্গত। জমিদার ইনায়াতুল্লাহ খাঁ লৌহজং নদীর টানের (উঁচু) আইল দিয়ে যে পথে ক্রোশখানেক পশ্চিম-দক্ষিণে খুশনুদপুর কাছারিতে যাতায়াত করতেন সেই ‘টানের আইল’ শব্দটি উচ্চারিত হতে হতে ‘টান-আইল’ এবং পরে ‘টাঙ্গাইল’-এ রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী সময় ইনায়াতুল্লাহ খাঁর কাগমারী জমিদারী বেদখল হয় এবং জবরদখলকারীদের কারসাজিতে খুশনুদপুর নামটি ‘সন্তোষ’ হয় বলে জানা যায়। মেজর রেন কর্তৃক ১৭৬৪ থেকে ১৭৭৯ সাল পর্যন্ত পরিচালিত জরিপের সময় প্রস্তুত এই এলাকার জরিপ-নকশায় কাগমারীর পাশে ক্ষুদ্র হরফে ‘সন্তোষ’ শব্দটি লেখা আছে। জেলার নামকরণ বিষয়ে আরেকটি মত রয়েছে। এই এলাকায় জমির আইলের উপর টংঘর তুলে কৃষকরা ফসল পাহারা দিত এবং আইলের উপর এরকম অসংখ্য টংঘর থাকার বিষয় থেকে ‘টং-আইল’ এবং পরে টাঙ্গাইল হয়। এছাড়া আইলের উপর দিয়ে টাঙ্গা গাড়ি (ঘোড়ায় টানা গাড়ি) চলত এবং এ থেকে ‘টাঙ্গা-আইল’ কালক্রমে ‘টাঙ্গাইল’ নাম ধারণ করে এরকম একটি মতও প্রচলিত আছে। নানা ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ টাঙ্গাইলকে দুইটি লাইনে তুলে ধরা হয়। আর তা হলো : ‘নদী-চর, খাল-বিল, গজারির বন টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন।’ শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে টাঙ্গাইলের যেমন ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনি মধুপুরের গারো অঞ্চলের গজারি বনও টাঙ্গাইলের জন্য অহঙ্কার। বাঙালি ললনাদের অতিপ্রিয় পরিধেয় টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি বিখ্যাত। বিখ্যাত মিষ্টি পোড়াবাড়ীর ‘চমচম’-এর নাম শুনলে যে কারো পক্ষে রসনা নিবৃত্ত করা কঠিন। বহু গুণীজনের জন্ম এই টাঙ্গাইলে। মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের অবদান অবিস্মরণীয়। জেলা পরিচিতি : জেলার মোট আয়তন ৩,৪২৪.৩৮ বর্গকিলোমিটার। এই জেলার উত্তরে জামালপুর, দক্ষিণে মানিকগঞ্জ ও ঢাকা, পূর্বে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এবং পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ জেলার অবস্থান। ২০১১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী জেলার বর্তমান লোকসংখ্যা ৩৭ লাখ ৪৯ হাজার ৮৬। এদের মধ্যে পুরুষ ১৮ লাখ ২৭ হাজার ৬৮৪ জন ও মহিলা ১৯ লাখ ২১ হাজার ৪০২ জন। জেলার মোট উপজেলা ১২টি। এগুলো হচ্ছে- ধনবাড়ী, মধুপুর, গোপালপুর, ভুঞাপুর, ঘাটাইল, কালিহাতী, বাসাইল, সখীপুর, মির্জাপুর, নাগরপুর, দেলদুয়ার ও টাঙ্গাইল সদর। এছাড়া বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানা নামে অতিরিক্ত একটি থানা রয়েছে। জেলায় সংসদীয় আসন আটটি। এর মধ্যে মধুপুর ও ধনবাড়ী, গোপালপুর ও ভুঞাপুর, নাগরপুর ও দেলদুয়ার এবং বাসাইল ও সখীপুর দুইটি করে উপজেলা নিয়ে একটি করে সংসদীয় আসন। অপর চারটি উপজেলার প্রতিটি একটি করে আসন। জেলায় গ্রামের সংখ্যা ২,৫১৬টি এবং ইউনিয়ন ১১০টি। পৌরসভা ১০টি। পৌরসভাগুলো হচ্ছে— টাঙ্গাইল, মধুপুর, গোপালপুর, ভুঞাপুর, ঘাটাইল, কালিহাতী, মির্জাপুর, সখীপুর, বাসাইল, ধনবাড়ী ও এলেঙ্গা। টাঙ্গাইলকে পৌরসভা করা হয় ১৮৮৭ সালে। নদী-চর, খাল-বিলে ভরা টাঙ্গাইলের উপর দিয়ে প্রবাহিত উল্লেখযোগ্য নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে— যমুনা, ধলেশ্বরী, বংশাই, লৌহজং, ফটিকজানী, এ্যালংজানী, লাঙ্গুলিয়া ও ঝিনাই। মধুপুর গড় অঞ্চলে গারো, কোচ ও বর্মণ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন : বিদালন-সংগ্রামে টাঙ্গাইলের তদানীন্তন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সচেতন মানুষ অংশ নেন। জেলার মধুপুর গহীন বনাঞ্চলে ছিল ফকির ও সন্ন্যাসী আন্দোলনের ঘাঁটি। মধুপুর রাণী ভবানী পাইলট হাইস্কুল সংলগ্ন স্থানে ছিল সন্ন্যাসীদের আনন্দমঠ। এই আনন্দমঠকে কেন্দ্র করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’ রচনা করেন। মুক্তিযুদ্ধ : মহান মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের অবদান অনন্যসাধারণ। সূচনালগ্ন থেকেই টাঙ্গাইলের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা অসম সাহসীকতা ও বীরত্বের পরিচয় দেন। আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিরাট ‘কাদেরিয়া বাহিনী’ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে সাফল্য অর্জন করে। মুক্তিবাহিনীর বড় সাফল্য ‘জাহাজমারা যুদ্ধ’ নামে পরিচিত মাটিকাটার যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ১২ আগস্ট জেলার ভুঞাপুর থানার মাটিকাটা নামক স্থানে যমুনা নদীতে পাকিস্তানি হানাদারদের অস্ত্র বোঝাই দুইটি জাহাজে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালান। উভয়পক্ষে যুদ্ধের পর বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা জাহাজ দুইটি থেকে বিপুল অস্ত্র তাদের দখলে নিয়ে উভয় জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেন। এই যুদ্ধে কয়েকজন হানাদার সেনার মৃত্যু ঘটে। বাকিরা পালিয়ে বাঁচে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাবিবুর রহমান এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন এবং এই সাফল্যজনক ঘটনার পর থেকে তিনি ‘জাহাজমারা হাবিব’ নামে পরিচিতি পান। শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনীতি : বহু শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও রাজনীতিকসহ গুণীজনের জন্ম টাঙ্গাইলে। এদের মধ্যে বিশিষ্ট রাজনীতিক ও শিক্ষাবিদ ধনবাড়ীর জমিদার নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, আটিয়ার চাঁদ নামে খ্যাত করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, দেলদুয়ার জমিদার পরিবারের স্যার আব্দুল হালিম গজনভী ও স্যার আব্দুল করিম গজনভী, বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম বাংলায় পবিত্র কোরআন শরীফের অনুবাদকারী মৌলভী মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন, ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা-আসাম-বার্মার মধ্যে সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকারী টাঙ্গাইলের প্রথম আই সি এস কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক মহিম চন্দ্র ঘোষ, রাজনীতিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, বিশ্বজয়ী জাদু সম্রাট পিসি সরকার, শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক প্রিন্সিপাল ইব াহীম খাঁ, দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা, বাঙালি মুসলমান মহিলাদের মধ্যে প্রথম স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা, রাজনীতিক, ক্রীড়াবিদ ও সাহিত্যিক মন্মথনাথ রায় চৌধুরী, পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার আব্দুল হামিদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, কৃষক নেতা হাতেম আলী খান, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর অর্থনীতিবিদ এম এন হুদা, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও ভাষা সৈনিক ড. মফিজ উদ্দিন আহমদ, ড. আলীম আল-রাজী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশবরেণ্য জীবিত কবি-সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের সংখ্যাও কম নয়। নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় তার জমিদারীর একাংশ বন্ধক রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে ৩৫ হাজার টাকা অনুদান দেন। এছাড়া ছাত্রবৃত্তির জন্যও দান করেন আরো ১৬ হাজার টাকা। তার জমিদারী এলাকা ধনবাড়ীতে স্থাপন করেন কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ওয়াজেদ আলী খান পন্নী কর্তৃক করটিয়ায় প্রতিষ্ঠিত সা’দত কলেজ দেশের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। গজনভী ভাতৃদ্বয় স্যার আব্দুল হালিম গজনভী ও স্যার আব্দুল করিম গজনভী ছাড়া দুই সহোদর অথবা একই পরিবারের দুই সদস্যের ‘স্যার’ উপাধি পাওয়ার উদাহরণ বৃটিশ ভারতে আর নাই। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জন্মস্থান টাঙ্গাইলের পার্শ্ববর্তী সিরাজগঞ্জে হলেও আমৃত্যু তিনি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন টাঙ্গাইল শহরের পার্শ্ববর্তী সন্তোষে অবস্থান করে। এখানেই তার মাজার অবস্থিত। তার নামেই এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এখানে। টাঙ্গাইলের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সন্তোষ জাহ্নবী হাইস্কুল এবং শহরে অবস্থিত বিন্দুবাসিনী বালক উচ্চ বিদ্যালয় ও বিন্দুবাসিনী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। প্রাচীনকাল থেকেই লোকসংস্কৃতির পীঠস্থান এই টাঙ্গাইল। এক সময় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠা নাট্যসংঘের উদ্যোগে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত করোনেশন ড্রামাটিক ক্লাব টাঙ্গাইল শহরে এখনো টিকে আছে অতীত গৌরবকে ধারণ করে। বাংলাদেশের অন্যতম নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ ও বিশিষ্ট নাট্যকার গোলাম আম্বিয়া নূরী টাঙ্গাইলের মানুষ। টাঙ্গাইলের সাহিত্য টাঙ্গাইলের সাহিত্যের ইতিহাস অতি প্রাচীন। আধুনিক সাহিত্যেও টাঙ্গাইল দেশের মধ্যে প্রতিনিধিস্থানীয়। মুকুন্দ ভারতী এ জেলার প্রাচীন কবি। প্রায় চারশত বছর আগে তিনি ‘জগন্নাথ বিজয়’ গ্রন্থটি রচনা করে কবি হিসেবে খ্যাত হন। তিনি ছাড়াও সতের শতকের দুই বিখ্যাত কবি ভবানী প্রসাদ রায় ও রূপনারায়ণ ঘোষ। টাঙ্গাইলের লোকসাহিত্যের অনেক আলেখ্য ময়মনসিংহ গীতিকায় স্থান পেয়েছে। টাঙ্গাইলে অবস্থান করে সাহিত্যকর্ম চালিয়েছেন ‘বিষাদসিন্ধু’র রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন, ‘মহাশ্মশান’-এর কবি কায়কোবাদ ও ‘পদ্মানদীর মাঝি’র রচয়িতা মানিক বন্দোপাধ্যায়। মীর মশাররফ হোসেন ধনবাড়ীর জমিদার কাচারীতে চাকরিকালে ‘বিষাদসিন্ধ’ুসহ বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। মহাকবি কায়কোবাদ কিছুকাল টাঙ্গাইলের তদানীন্তন ‘কিল্লা-এ- হাতী’ থানায় পোস্টমাস্টার ছিলেন। এই কিল্লায়ে হাতী বর্তমানে কালিহাতী থানা। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে টাঙ্গাইল জেলার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৮৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে ‘আখবার এ ইসলামিয়া’ নামে করটিয়া থেকে প্রকাশিত হয় জেলার প্রথম পত্রিকা। এর সম্পাদক ছিলেন বাংলা ভাষায় কোরআন শরীফের প্রথম মুসলিম অনুবাদক মওলানা নইমুদ্দিন। ১৮৯০ সালে শশী ভূষণ তালুকদারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘মাসিক নববিধান’, আবদুল হামিদ খান ইউসুফজাই’র সম্পাদনায় ‘পাক্ষিক আহমদী’, উমেষ চন্দ্র দে’র সম্পাদনায় ‘মাসিক নবযুগ’, আব্দুল হাই’র সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক টাঙ্গাইল হিতৈষী’। এগুলোর প্রকাশনা স্বল্পকাল স্থায়ী ছিল। এছাড়াও এর পরবর্তী সময়ে আরো কয়েকটি পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয় যার কোনটিরই প্রকাশনা এখন অব্যাহত নাই। বর্তমানে টাঙ্গাইল শহর থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয় জাফর আহমেদের সম্পাদনায় ‘দৈনিক মজলুমের কণ্ঠ’, নাজমুস সাদাত্ নোমানের সম্পাদনায় ‘দৈনিক প্রগতির আলো’, খান মোহাম্মদ খালেদের সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক পূর্বাকাশ’, এম এ সাত্তার উকিলের সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক মৌবাজার’, ফারুক আহমেদের সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক মূলসে াত’, হেমায়েত হোসেন হিমুর সম্পাদনায় ‘সাপ্তহিক সময় তরঙ্গ’। এছাড়া আরো কয়েকটি দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়। কৃষি ও শিল্প কৃষি নির্ভর টাঙ্গাইলে সবচেয়ে উন্নত মানের পাট চাষ হয়। ধান, কলা, আনারস ও বিভিন্ন সব্জি আবাদে টাঙ্গাইল এগিয়ে। এ জেলায় উত্পাদিত কলা, আনারস ও সব্জি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকে। এককালে কাগমারীর কাঁসা শিল্প ছিল দেশবিখ্যাত। মৃত্ শিল্পেও টাঙ্গাইলের সুনাম রয়েছে। বৃহত্ শিল্প টাঙ্গাইলে গড়ে না উঠলেও মির্জাপুরে টেক্সটাইল মিলসহ কয়েকটি মিল-কারখানা আছে। কুটির শিল্পে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য উল্লেখযোগ্য। টাঙ্গাইলের শাড়ি উন্নতমানের তাঁতের শাড়ির জন্য টাঙ্গাইল বিখ্যাত। টাঙ্গাইল শাড়ি নামে এই শাড়ি দুনিয়াজোড়া খ্যাতি পেয়েছে। শহরতলীর বাজিতপুরে প্রতি শুক্রবার ভোর থেকে বসে এই শাড়ির হাট। এই হাটে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারী ও খুচরা শাড়ি ব্যবসায়ীসহ বহু নারী-পুরুষ শাড়ি কেনার জন্যে ভিড় জমান। হস্তচালিত তাঁতে এই শাড়ি বুনানো হয়। এখন পাওয়ারলুমও এসে গেছে। টাঙ্গাইলের তাঁত প্রধান পাথরাইল, বাজিতপুর, বিষ্ণুপুর, বেলতা, কাবিলাপাড়া, তারুটিয়া প্রভৃতি। যন্ত্রচালিত তাঁতে মোটা কাপড় বুনানো হয় কালিহাতী উপজেলার বল্লা এলাকায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক সময় টাঙ্গাইলে মসলিম শাড়ি প্রস্তুত হতো। টাঙ্গাইলের চমচম মিষ্টির রাজা বলে খ্যাত ‘পোড়াবাড়ীর চমচম’ টাঙ্গাইল শহরের প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে পোড়াবাড়ীতে প্রস্তুত হয়। যমুনা তীরবর্তী এই জনপদে চমচম তৈরির প্রচলন প্রায় দেড়শত বছর আগে থেকে। এই অঞ্চলের পানি এবং কারিগরদের দক্ষতাই এই মিষ্টির বৈশিষ্ট্যের কারণ। নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে পোড়াবাড়ীর চমচম তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। দুধ ও চিনির মূল্য বৃদ্ধিসহ অনেক কারিগরের এ পেশা ছেড়ে দেয়ার কারণে এমনটি হচ্ছে বলে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়। আতিয়া মসজিদ বাংলাদেশের দশ টাকার নোটে যে আতিয়া মসজিদের ছবিটি মুদ্রিত আছে তা টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আটিয়া নামক স্থানে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর অন্যতম। মসজিদটির গায়ে লাগানো শিলালিপি থেকে জানা যায়, এটি ১০১৮ হিজরী (১৬০৮-১৬০৯ খ্রিস্টাব্দ) সালে নির্মিত হয়। এটির দৈর্ঘ্য ৬৯ ফুট ও প্রস্থ ৪০ ফুট। এর চার কোণে আছে চারটি বড় আকারের অষ্টকোণাকৃতির স্তম্ভ। শাহানশাহ বাবা আদম কাশ্মিরী (রহঃ)-এর পোষ্যপুত্র সাঈদ খান পন্নী মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সাঈদ খান পন্নী করটিয়ার পন্নী জমিদার বংশের পূর্বপুরুষ। সাধকপুরুষ শাহানশাহ বাবা আদম কাশ্মিরী ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এখানে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন এবং মসজিদটির পাশেই তাঁর মাজার রয়েছে। এই মসজিদের পাশে উত্তর-দক্ষিণে প্রলম্বিত একটি পুকুর আছে, যা মসজিদটির চেয়েও প্রাচীন বলে ধারণা করা হয়। মাজার থেকে ১৫০ মিটার উত্তর-পশ্চিমে এক গম্বুজ বিশিষ্ট আরেকটি অসমাপ্ত প্রাচীন মসজিদেরও অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। আতিয়া মসজিদ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে একটি বিরাট দুর্গের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এটি হিঙ্গু পালের গড় নামে পরিচিত। মধুপুর বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে সাগরদিঘী নামে একটি বিরাট প্রাচীন জলাশয় দেখা যায়। উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ জলাশয়ের আয়তন প্রায় বিশ একর। এটি একসময় ৪১ একর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে জানা যায়। এর পশ্চিম পাড়ে প্রচুর প্রাচীন ইট ও মৃত্ পাত্রের ভগ্নাংশ পাওয়া গিয়েছে। সাগরদিঘী থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে গুপ্তবৃন্দাবন নামে হিন্দু বৈষ্ণবদের একটি আখড়া আছে। এটি হিন্দুদের বিশেষ করে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একটি তীর্থস্থান ছিল এবং একসময় বহু লোকের সমাগম হতো। এখনো তাদের কাছে সে তীর্থস্থানের মহিমা থাকলেও লোক সমাগম কমে গেছে। দেলদুয়ারের বাবা আদম কাশ্মিরী (রহঃ)-এর মাজার, ধনবাড়ী জমিদার বাড়ী, গোপালপুরের হেমনগর জমিদারবাড়ী, মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমস, মহেড়া জমিদার বাড়ী, মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, নাগরপুরের চৌধুরী বাড়ী ও উপেন্দ্র সরোবর, পাকুটিয়া জমিদার বাড়ী, মধুপুরের জাতীয় উদ্যান, মধুপুরের দো-খোলা রেস্টহাউজ, বঙ্গবন্ধু সেতু ও যমুনা রিসোর্ট, ঘাটাইলের পাকুটিয়ায় ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের আশ্রম এবং সন্তোষের মওলানা ভাসানীর মাজার জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান। মহেড়া জমিদার বাড়ীতে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল স্থাপন করা হয়েছে। মধুপুরের দো-খোলা রেস্টহাউজে বসে বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা যোগাযোগ ব্যবস্থা একসময় ছিল নৌ-পথনির্ভর। এখান থেকে লঞ্চ-স্টীমারও বড় বড় নৌকায় যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করা হতো। নৌ-পথে যোগাযোগ ছিল কলকাতা পর্যন্ত। এখন নদীর নাব্যতা হারানোর কারণে নৌ-যোগাযোগ বর্ষা মৌসুমে সীমিত আকারে চালু আছে। সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের তুলনায় ভালো। জেলায় এখন পাকা রাস্তার পরিমাণ ৬৪৬ কিলোমিটার; কাঁচা রাস্তা ৫,১৩০ কিলোমিটার। যমুনা নদীর উপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মিত হবার পর এককালের রেলবিহীন টাঙ্গাইল জেলায় রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে ১৭টি জেলার যানবাহন চলাচল করে টাঙ্গাইলের উপর দিয়ে। যমুনা নদীর উপর নির্মিত চার দশমিক আট কিলোমিটার দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু সেতুটি যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তর সৃষ্টিকারী।