আমাদের দেশ বহু যুগ ধরে স্বাধীন ছিল না। আমরা যে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌলার কথা বলি, তিনি তো মোগল সম্রাটের একজন ডেপুটি ছিলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী শওকাত জঙ্গ সম্রাটের কাছ থেকে সুবাদারের সনদ জোগাড় করায় সিরাজ পূর্ণিয়ায় গিয়ে মনিহারীর যুদ্ধে তাঁকে পরাজিত ও নিহত করেন। ১৫৩৮ সালে বাংলাদেশের দু-শ বছরের স্বাধীনতা শেষ হয় হোসেন শাহী বংশের অবসানে।
ইংরেজ আমলে পশ্চিমা চিন্তাধারার সংস্পর্শে দেশের বিদগ্ধজন স্বাধীনতার কথা চিন্তা করতে শুরু করেন। তবে সাবধানী কবিরা ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়’ বলতে মোগলের বিরুদ্ধে মেবারের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। আমাদের মনে হয়, বাংলা ভাষায় নির্ভীক কণ্ঠে প্রথমে স্বাধীনতার জয়গান করেন কাজী নজরুল ইসলাম। বেঁচে থাকতে তিনি পাকিস্তানের পক্ষ নেননি। স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁকে নিয়ে এসে দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। তিনি আমাদের জাতীয় কবি।
বাংলা ভাষায় স্বাধীনতার কথা নানাভাবে গাওয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালে যখন রাজনীতিকেরা ছয় দফা ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের কথা নিয়ে আলোচনা করছেন, তখন পদ্মা-মেঘনা-যমুনাপারের তরুণেরা বলল, ছয় দফা নয় এক দফা এবং রণধ্বনি তুলল—বীরবাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।
নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। সেই যুদ্ধে যারা মারা যায়, তারা বড় স্বপ্ন নিয়ে মারা যায়। যারা বেঁচে থাকে, তারা বড় স্বপ্ন লালন করতে থাকে। তাদের সেই স্বপ্ন যেমন অনেকখানি সার্থক হয়েছে, তেমনি অনেকখানি ব্যাহতও হয়েছে।
নতুন রাষ্ট্রের জন্য ছাত্রদের এগারো দফায় যে দিগিনর্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তাকে বিপ্লবাত্মক হয়তো বলা যাবে না, কিন্তু সমাজ সংস্কারের জন্য তা প্রাথমিক দলিল হিসেবে মোটামুটি যথেষ্ট ছিল। আসলে ঘটনাপরিক্রমে আমাদের আশা-প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে তা স্বাধীনতাযুদ্ধে রূপ নেয়। আর স্বাধীনতার অব্যবহিত পর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, নকল মুক্তিযোদ্ধাদের অশুভ কর্মকাণ্ড, ভোগ্যপণ্যের হঠাত্ লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক জগতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও তার অশুভ প্রভাব, সাম্প্রদায়িক শক্তির দ্রুত প্রত্যাবর্তন, পরিত্যক্ত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা ও দুর্নীতি—সব মিলে ছা-পোষা গৃহস্থের জন্য এক বিষময় আবহাওয়ার সৃষ্টি করেছিল।
নানা ধরনের রাজনৈতিক আদর্শ, মুজিববাদ বা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, দেশের প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর শরিকানা নিয়ে যথেষ্ট দিগ্ভ্রান্তি কাজ করছিল। যাঁরা খতমের রাজনীতিতে দীক্ষা নিয়েছিলেন, তাঁরা ফাড়ি-থানা লুট করতে এবং জোতদারদের খতম করতে উদ্যত হলেন। প্রতিক্রিয়ায় রক্ষীবাহিনীর হাতে তাঁরা পর্যুদস্ত হন। বেসামরিক কাজে রেশন কার্ড পরীক্ষা ও পাচার-বাণিজ্য রোধ করতে সামরিক বাহিনী নিয়োগ করে বেসামরিক প্রশাসন একদিকে অপদস্ত হয়; অন্যদিকে সামরিক বাহিনী দুর্নীতিগ্রস্ত হয়। এ দুরবস্থা দূর করার জন্য দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং প্রশাসনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য বাকশাল কর্মসূচি ঘোষিত হয়। সেই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বেই শেখ মুজিব প্রায় সপরিবারে নিহত হন। কারাগারে মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ নেতাকে হত্যা করা হয়।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের তরুণ প্রজন্ম এক বড় বিষময় অবস্থায় পতিত হয়। দেশে সাম্প্রদায়িক দল রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়। উনিশ-বিশটা সামরিক অভ্যুদয়ে দেশের কু-অভ্যাসের কথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সদ্যস্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের কাছ থেকে যে সমর্থন-সাহায্য পেয়েছিল, তার উত্স শুকিয়ে গেল।
পরিবর্তিত বাস্তবতায় তরুণ ছাত্রসমাজের মধ্যে অস্ত্রের ব্যবহার এবং অস্ত্রের হুমকি দিয়ে নানা ধরনের অপকর্ম বৃদ্ধি পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের বড় বিপজ্জনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হলো। তার প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম দ্বিতীয় বৃহত্তম বিপজ্জনক বন্দর হলো। পুরুষের হাতে নারীর নানা ধরনের লাঞ্ছনা প্রসার লাভ করল। ইভ-টিজিং ঠেকাতে মা-বাবা-শিক্ষক নিহত হলো। এমন আবহাওয়ায় ভালো বাতাস লক্ষ করা যাচ্ছে না।
৭ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকে অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর ‘তোমরা যা শিবির করো’ শিরোনামের কলামে ইসলামী ছাত্র শিবির সম্পর্কে বলেছেন, ‘যে বয়সটি হচ্ছে মাতৃভূমিকে ভালোবাসার বয়স, সেই বয়সে তারা ভালোবাসে দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতকদের, যারা এই মাতৃভূমির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। যে বয়সে একজন তরুণের মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা, সেই বয়সে তারা অনুপ্রাণিত হয় সেই মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকারীদের দিয়ে। যে বয়সে তাদের স্বপ্ন দেখার কথা, দেশের বড় লেখক, শিল্পী, ডাক্তার, বিজ্ঞানী, সাংবাদিককে নিয়ে, সেই বয়সে তারা আনুগত্য মেনে নিয়েছে সেই সব মানুষের, যারা আলবদর বাহিনী তৈরি করে একাত্তরে এই দেশের লেখক, শিল্পী, ডাক্তার, বিজ্ঞানী আর সাংবাদিকদের হত্যা করেছে! যে বয়সে তাদের একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাতফেরি করার কথা, ষোলোই ডিসেম্বরে স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়ার কথা, পয়লা বৈশাখে রাজপথে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার কথা, সেই বয়সে তারা যে শুধু এই অবিশ্বাস্য আনন্দ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে রাখে তা নয়, তারা এগুলোকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। যে বয়সে তাদের মুক্তচিন্তা শেখার কথা, গান গাওয়ার কথা, নাটক করার কথা, আদর্শ নিয়ে ভাবালুতায় ডুবে যাওয়ার কথা, সেই সময় তারা ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে নিজেদের আটকে রাখতে শেখে, সাম্প্রদায়িক হতে শেখে, ধর্মান্ধ হতে শেখে। যে বয়সে ছেলে আর মেয়ের ভেতর সহজ ভালো লাগা ভালোবাসা জন্ম নেওয়ার কথা, সেই বয়সে তারা সেই অনুভূতিগুলোকে অশ্রদ্ধা করতে শেখে...।’
ছাত্ররাজনীতির সে গৌরব আর নেই। প্রতিটি সরকারের সময় সরকারসমর্থক ছাত্রদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড এবং তাণ্ডব-বাণিজ্যে দেশের লোক বীতশ্রদ্ধ।
নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাঙ্গন সন্ত্রাসমুক্ত রাখার ঘোষণা ছিল আওয়ামী লীগের। বাস্তবতা হলো, মহাজোট সরকারের গত তিন বছরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন ছাত্র।
গত ৪০ বছরে দেশের চারটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন সব মিলিয়ে ১২৯ জন ছাত্র। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ জন ছাত্র মারা যান। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রথা মেনে তদন্ত কমিটি করেছিল। থানাতেও মামলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতায় হারিয়ে গেছে এসব মামলা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ছাত্র আবু বকর নিহত হন। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ওই ঘটনার বিচার হয়নি। ২০০৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল ছাত্রদলের নেতা মাহাবুবুল ইসলাম খোকন। ওই হত্যাকাণ্ডের পর দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও প্রতিবেদন জমা পড়েনি। শাহবাগ থানায় মামলা হলেও এর বিচারকাজ শেষ হয়নি। খুনিরা ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
১৯৯৬ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জগন্নাথ হলে একজন মারা যান। ১৯৯৭ সালের ১১ জুলাই কার্জন হল এলাকায় খুন হন ছাত্রলীগের কর্মী তনাই। একই বছর শাহীন নামে এক ছাত্রের মৃতদেহ পাওয়া যায় কার্জন হলে। ১৯৯৭ সালে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বঙ্গবন্ধু হলে গুলি করে হত্যা করা হয় আরিফকে। ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল ছাত্রলীগের নেতা পার্থপ্রতিম আচার্যকে হত্যা করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেও নাকি সংরক্ষিত নেই। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে ৬৬টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল মুহসীন হলের ‘সেভেন মার্ডার’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। ওই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানসহ অভিযুক্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তাঁরা মুক্তি পান।
দেশে চলমানতা বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতি, তৈরি পোশাকসহ নতুন নতুন সামগ্রীর রপ্তানি-আয়, খাদ্য, মত্স্য ও দুগ্ধের উত্পাদন বৃদ্ধির পরোক্ষ ফলে তরুণদের কাছে নানান নব-উদ্যেগের দরজা খুলে গেছে। তরুণ নারী ও পুরুষ এভারেস্ট আরোহণ করেছে। দেশে-বিদেশে গায়ে-গতরে খেটে পরিবারের জন্য টাকা পাঠাচ্ছে। ক্রিকেটে আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। সাংস্কৃতিক জগতে সঙ্গীত, নাটক, সিনেমার ক্ষেত্রে বেশ কিছু অগ্রগতি ঘটেছে।
আবহাওয়া অনেক পরিষ্কার হয়ে আসছে। দেশের তরুণেরা নবযাত্রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। বয়স্ক নেতারা যতই ভাবুন, তাঁরা চলে গেলে বা মারা গেলে দেশে প্লাবন আসবে। আসলে কিছুই হবে না। লেনিন, স্ট্যালিন, মাও, হো চি মিন, চার্চিল, থ্যাচার, নাসের, নেহেরু চলে গেছেন, গেছেন তো গেছেন। তরুণেরা বলে, এক নেতা মরে গেলে লক্ষ নেতা ঘরে ঘরে। গোকুলে ঘরে ঘরে যে নেতারা বাড়ছে তাদের খাসলত কেমন হবে—তারা কি লোককে দয়া দেবে, না প্রজানুরঞ্জনে লালন করবে—দেবা ন জানন্তি, কুতঃ মনুষ্যঃ\
লেখক :তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বিচারপতি
