ভোলা

গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:১৯
মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি: ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার আগে থেকেই ভোলায় শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি। ভোলায় পাকবাহিনী আসে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে । তার আগে থেকেই সেখানে পাক-হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য শান্তি কমিটি ও আলবদর রাজাকার বাহিনী গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়। ছাত্রজনতা প্রতিদিন রাস্তায় মিছিল-মিটিং করে । ২রা মার্চ তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক (ডিসি অফিস) কার্যালয়ে ছাত্র-জনতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে। সে সময়ে সেখানে ছিলেন ছাত্রনেতা সালেহ আহম্মদ, ছাইফুল্লা, জুলু, শাহজাহান লালু, শাহজাহান গোলদার, মুজিবর রহমান মুজিব, আফসার উদ্দিন বাবুল, ফজলুল কাদের মজনু, আব্দুল মমিন টুলু, লুত্ফুর রহমান হাওলাদার, আতিকুল্লা, রফিকুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম, শেখ ফরিদ, শাহজাহান মিলনসহ আরও অনেকে। ভোলার গোলাম মাওলা নামে এক দর্জি স্বাধীন বাংলার এই পতাকা তৈরি করেন। ফজলুল কাদের মজনুসহ ছাত্র নেতারা তত্কালীন মহকুমা প্রশাসকের অফিসের ছাদে উঠে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে। শাহজাহান মিলন পাকিস্তানি পতাকায় অগ্নিসংযোগ করে। নিচে তখন মাইকে বাজছিল-‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তত্কালীন পৌরসভা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সামসুদ্দিন আহমেদ, মোস্তাফিজ মাস্টার, মাকসুদুর রহমান, রিয়াজ উদ্দিন মোক্তার ডাক্তার আব্দুল হাই, সাবেক এমপি মোতাহার মাস্টার, মরহুম রেজা-এ করিম চুন্নু মিয়া, মোকলেসুর রহমান দরবেশ, সাবেক এমপি মরহুম নজরুল মিয়া (দৌলতখান) ডাক্তার আব্দুল লতিফসহ আরও অনেকে। এছাড়া মাঠে দোস্ত মাহমুদ, শফিকুর রহমান, রফিকুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান মুজিব, লুত্ফর রহমান, ছাত্রনেতা শাহজাহান গোলদার, আবু হোসেনসহ অনেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন । মে মাসে পাকবাহিনী ভোলায় এসে ওয়াপদা কলোনীতে ক্যাম্প করে। জামায়াতে ইসলামির তত্কালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র সংঘের (বর্তমানে ছাত্র শিবির) রিক্রুট করা তরুণদের নিয়ে গঠন করা হয় আলবদর-আলশামস বাহিনী। ভোলায় ইলিয়াস মাস্টারের নেতৃত্বে গঠিত হয় শান্তি কমিটি। সে সময়পাক বাহিনীর দোসর রাজাকার আবদুল্লাহ মৌলভি ছিল এলাকার ত্রাস। সে সময় ভোলায় আওয়ামী লীগের এমএনএ ছিলেন মুজিব বাহিনীর চার প্রধানের একজন তোফায়েল আহমেদ এমপি। আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি ছিলেন মোশারেফ হোসেন শাহজাহান। ওবায়দুল হক বাবুল মোল্লা ভোলায় মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকা পালন করে ভারত চলে যান। পরে তিনি মুজিব বাহিনীর প্রধান হিসেবে রতন চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক শশীসহ একটি ট্রুপ নিয়ে ভোলা আসেন। ভোলার রণাঙ্গনে কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সুবেদার গাজী জয়নাল আবেদিন, হাই কমান্ড সিদ্দিকুর রহমান, মাহবুব আলম শিশু ভাই, আলী আকবর বড় ভাই, সুবেদার হযরত আলী, সুবেদার আরিফ হোসেন। এছাড়া ছিলেন কাঞ্চন মিয়া (দৌলতখান), ফরিদ হোসেন বাবুল, আবু তাহের, আলী হোসেন, সালেহ আহমেদ, সাইফুল্লাহ জুলু, একেএম নাসিরুদ্দিন এ্যাডঃ, সিদ্দিকুর রহমান, আব্দুর রহমান, আব্দুল মমিন টুলু, এছহাক জমাদ্দার, মাকসুদুর রহমান, আমীর হোসেন মিয়া, তসির আহমেদ, শেখ ফরিদ, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, কাঞ্চন বরকন্দাস, রিয়াজুর রহমান খোকন, জিয়াউল কুদ্দুস লিয়াকত, খালেক মিয়া, ইব্রাহিম খলিল, মিজানুর রহমান, অহিদুর রহমান, মুজিবুর রহমান মুজিব, মাহফুজুর রহমান, দোস্ত মাহমুদ, শফিকুল ইসলাম, ফজলে হাসান ফারুক, নুরুল ইসলাম খন্দকার, আব্দুর রব, রুহুল আমীন প্রমুখ । কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধ:ভোলার কয়েকটি রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকবাহিনীর মধ্যে সম্মুখযুদ্ধে প্রায় অর্ধশত মুক্তিযোদ্ধা, ২০-২৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য ও ৭-৮জন রাজাকার নিহত হয়। দেউলায় হাই কমান্ড সিদ্দিক ও হযরত আলীর নেতৃত্বে ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধ হয়। ঘুইংগারহাটে সম্মুখ যুদ্ধে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাবাজারে আরেকটি সম্মুখ যুদ্ধে অন্তত ৩০জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়। সেখানে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সিদ্দিকুর রহমান, হযরত আলী, ফারুক বাচ্চু ও কাজী নান্নু। দৌলতখান উপজেলার হাজীপুর সংলগ্ন মেঘনার গরু চোখা খালে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকবাহিনীর মধ্যে আট ঘণ্টা ভয়াবহ বন্দুক যুদ্ধ হয় । যুদ্ধের পর ১১জন পাক সৈন্য ও ১৩ জন রাজাকারকে আটক করে বাংলা স্কুল মাঠে আনা হয়। এছাড়া মুক্তিবাহিনী বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালায়। শেষদিকে পাকবাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ভোলায় পাকবাহিনী রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় বহু হিন্দু বাড়িতে হামলা চালিয়ে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগসহ নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। ভোলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার দোস্ত মাহমুদ ও ডেপুটি কমান্ডার শফিকুল ইসলাম জানান, ভোলায় ৮ মাসে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা যেভাবে গণহত্যা চালিয়েছে তা মনে করলে গা শিউরে ওঠে । বধ্যভূমি: ভোলার বড় বধ্যভূমিটির অবস্থান ওয়াপদা কলোনীর পাশে। এখানে সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হতো। ওয়াপদা ক্যাম্পে এনে বহু মানুষের ওপর চালানো হয় পৈশাচিক নির্যাতন। স্বাধীনতার পর ঐ বধ্যভূমি এলাকাটি বেদখল হয়ে যায়। অবশেষে ২০০৭ সালে এলাকাটি দখলমুক্ত করে জেলা প্রশাসন বধ্যভূমি সংরক্ষণ করে।