একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল পুলিশ বাহিনী। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে এ বাহিনীর সদস্যরা থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে তাদের রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। হানাদারদের ভারী অস্ত্রের গোলায় ঝাজরা হয়ে গিয়েছিল পুলিশ ব্যারাক, মারা গিয়েছিলেন অসংখ্য পুলিশ সদস্য, তবুও মাথা নত করেননি কেউই। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর এই গৌরবোজ্জ্বল অবদান ও মহান আত্মত্যাগ নিয়ে গত ৪১ বছরেও দেশে তৈরি হয়নি কোন জাদুঘর। অজান্তেই থেকে গেছে অনেক বীর পুলিশ সদস্যের বীরত্বগাথা। তবে আশার কথা, দীর্ঘদিন পরে হলেও এবার তৈরি হচ্ছে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। সম্প্রতি রাজারবাগ টেলিকম অডিটোরিয়ামের দুইটি কক্ষ নিয়ে এর কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী এ জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে।
পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ কর্মকর্তা একেএম কামরুল আহছান বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে জানান, ২০১১ সালে পুলিশ বাহিনীকে ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রদান করা হয়েছে। এ পদক প্রাপ্তির পরই পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। পরে আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের নির্দেশে দুই সদস্য বিশিষ্ট পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ বাস্তবায়ন কমিটিও গঠন করা হয়। ওই কমিটির সদস্য সচিব ডিএমপি সদর দফতরের এডিসি আবিদা সুলতানা বলেন, প্রাথমিক পর্যায় রাজারবাগ অডিটোরিয়ামের দুইটি কক্ষকে জাদুঘরের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। আর জাদুঘরের জন্য কেন্দ্রীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সহায়তা ও পরামর্শ নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। অনেকেই যোগাযোগ করছেন। পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্থায়ী অবকাঠামো হবে রাজারবাগে।
আবিদা বলেন, পুলিশ বাহিনীর গৌরবের অনেক নির্দশনই রয়েছে। এক সময় পুলিশ মেসে ( বেইলী রোডে) বস্তাবন্দি হয়ে ছিল এসব ডকুমেন্ট। মেস ভেঙ্গে বহুতল ভবন তৈরির পর এসব ডকুমেন্ট রাখা হয়েছিল ডিএমপি সদর দফতরের লাল বিল্ডিংয়ে। কিছুদিন আগে সেসব নির্দশন রাজারবাগে স্থানান্তর করা হয়েছে। তিনি জানান, এই জাদুঘরে প্রদর্শিত হবে সেই ওয়ারলেস সেটটি। যা দিয়ে রাজারবাগে পাক হানাদারদের হামলার ২৫ মিনিট আগে সারা দেশে বার্তা পাঠানো হয়েছিল। এছাড়া রাজারবাগে উত্তোলন করা পতাকাটিও প্রদর্শন করা হবে।
জাদুঘর বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের পুলিশ বাহিনীর আইজিপি ও স্বরাষ্ট্র সচিবের দায়িত্বপালন করেন ডিআইজি আব্দুল খালেক। ওই সময় পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন স্থানে বদলি ও নতুন দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সেসব ডকুমেন্টও জাদুঘরে প্রদর্শিত হবে। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন চিঠিপত্র। এমনকি প্রবাসী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এইচ এম কামারুজ্জামান মুক্ত এলাকা রৌমারী পরির্দশনের সময় যে মন্তব্য লিখেছিলেন সেই ডকুমেন্টও সংগ্রহ করা হয়েছে। জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের নির্দশন ছাড়াও পুলিশের অতীত ইতিহাসের বিভিন্ন নির্দশনও সংরক্ষণ করা হবে।
পুলিশ সুপার আরো জানান, পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সঙ্গে থাকবে তথ্যকেন্দ্র, আর্কাইভ ও গবেষণা কেন্দ্র। যাতে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদান সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারে। প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর ১৩ হাজার সদস্য সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে শহীদ হয়েছেন ৭শ’ ৫১ জন।
